দাবি এনসিপি নেতাদের
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতার বলি ইশরাক হোসেন
- সর্বশেষ আপডেট ০৫:৫৪:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
- / 30
মাদকবিরোধী অভিযানে অস্ত্র হাতে মাঠে নামা এবং পরবর্তী সময়ে পদত্যাগের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, মাদক নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা না থাকায় ইশরাককে নিজেই মাঠে নামতে হয়েছে। এখন তাঁকে পদত্যাগ করিয়ে মূল সমস্যার সমাধান হবে না।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে শারদীয় দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এনসিপির সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন এবং মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এ বিষয়ে বক্তব্য দেন। একই দিন নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানান দলটির নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
আখতার হোসেন বলেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে মাদক, চাঁদাবাজি, গুম, খুন ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। ইশরাকের ঘটনাও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতাকে সামনে এনেছে। মাদক নির্মূলে নিয়োজিত সংস্থাগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। সীমান্ত দিয়ে মাদক দেশে প্রবেশ করলেও তা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
তিনি বলেন, শুধু ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে, এমন কোনো উদ্যোগ সরকারের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। ইশরাকের পদত্যাগের বিষয়টি শুধু অস্ত্র হাতে মাঠে নামার ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত, নাকি এর পেছনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলও রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।
আখতার হোসেনের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সীমান্ত সুরক্ষিত করার পাশাপাশি মাদক নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। লোকদেখানো পদক্ষেপ বা একজন প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগে সমস্যার সমাধান হবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতার বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এদিকে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের প্রসঙ্গে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, মাদক বন্ধের উদ্যোগ নিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতার কারণে ফাঁদে পড়েছেন ইশরাক। তাঁর ভাষ্য, মাদকবিরোধী উদ্যোগের উদ্দেশ্য ভালো হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার দায় ইশরাকের ওপর এসে পড়েছে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “সমস্যাটা তো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। গুলি কেন খেলেন ইশরাক ভাই? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দোষ করেন, আরেকজন সেই পাপে ভোগেন। এটা আসলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতা। মাঝখান দিয়ে ইশরাক ভাই ফাঁদে পড়ে গেলেন।”
একই অনুষ্ঠানে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এনসিপির এই নেতা। তিনি বলেন, বিএনপি সরকার সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বললেও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। গত তিন-চার মাসে বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি দূর করতে আলোচনার ওপর গুরুত্ব দেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বসে কথা বলার আহ্বান জানান তিনি।
অন্যদিকে, এনসিপির নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ প্রশ্ন তুলেছেন, একজন প্রতিমন্ত্রী হয়েও কেন ইশরাক হোসেনকে মাদকের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে রাস্তায় নামতে হলো। সোমবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্য, মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে কাজ করলে একজন প্রতিমন্ত্রীকে সরাসরি মাঠে নামতে হতো না। এ পরিস্থিতির দায় শুধু ইশরাকের কি না, নাকি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতারও দায় রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মাদক নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপরও দায় বর্তায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
একজন প্রতিমন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়াকে সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখছেন না হাসনাত। তাঁর মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর থাকলে একজন প্রতিমন্ত্রীকে নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না।
এ প্রসঙ্গে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও সেবার মান নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি পরিদর্শনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর থাকলে শীর্ষ নেতৃত্বকে এভাবে মাঠে নামতে হতো না। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে মন্ত্রী ও শীর্ষ নেতাদের সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
হাসনাত আবদুল্লাহ সতর্ক করে বলেন, ব্যক্তিকে সরিয়ে সাময়িকভাবে সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সমাধান হয় না। রাষ্ট্রকে কার্যকর করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে জনঅসন্তোষের মুখে সরকার কাকে পদত্যাগ করিয়ে দায় এড়াবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
স্ট্যাটাসের শেষাংশে হাসনাত আবদুল্লাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সমালোচনা করে দাবি করেন, তাঁর ব্যর্থতার দায় ইশরাক হোসেনের মতো ব্যক্তিদের বহন করতে হচ্ছে। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ঘের দখল, দুর্নীতি ও ঘুষের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার অভিযোগও তোলেন।
এনসিপি নেতাদের বক্তব্যে মূলত মাদক নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এসেছে। তাঁদের মতে, ইশরাকের পদত্যাগের বিষয়টি এককভাবে বিবেচনা না করে এর পেছনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা খতিয়ে দেখা জরুরি।































