ঢাকা ০৫:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মাসিক আয় ২০ হাজার, সম্পদ কয়েক কোটির

নরসিংদীর পাসপোর্ট কর্মকর্তা আবুলের তেলেসমাতি!

এস এম আর শহিদ, নরসিংদী থেকে ফিরে
  • সর্বশেষ আপডেট ০২:১৮:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
  • / 142

নরসিংদীর পাসপোর্ট কর্মকর্তা আবুলের তেলেসমাতি

সরকারি চাকরি। মাসিক আয় সীমিত। অথচ সম্পদের খাতায় যেন আলাদিনের প্রদীপ! একের পর এক জমি, ফ্ল্যাট, দোকান- কোটি কোটি টাকার সম্পদের তথ্য মিলেছে নরসিংদী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সুপারিনটেনডেন্ট মো. আবুল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী নাদিরা খাতুনের।

আয়কর রিটার্নে উল্লেখিত তথ্য এবং বাংলা অ্যাফেয়ার্সের অনুসন্ধানে এই কর্মকর্তার প্রায় ৪শ’ কাঠা জমির তথ্য মিলেছে। এছাড়া ঢাকা ও সাভারে দুটি ফ্ল্যাট, নিজস্ব জমিতে তিনটা দোকান। এর মধ্যে কিছু জমি স্ত্রী নাদিরা খাতুনের নামে। অথচ তাঁর স্ত্রীর আয়ের কোনো উৎস নেই। নিজের অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থকে বৈধতা দিতে নিজের জমি স্ত্রীর নামে হস্তান্তর করেছেন।

এখনেই থেমে থাকেননি এই কর্মকর্তা। নিজের শ্যালক শফিকুল ইসলামের নামেও সম্পদ গড়ার তথ্য মিলেছে অনুসন্ধানে। এসব সম্পদের বড় একটি অংশ এই কর্মকর্তা তার আয়কর রিটার্নে তথ্য গোপন করেছেন।

অথচ আয়কর রিটার্নে এই কর্মকর্তা মাসিক বেতন দেখিয়েছেন মাত্র ২০ হাজার ৩৯৯ টাকা। অন্যদিকে মাসিক পারিবারিক ব্যয় দেখিয়েছেন প্রায় ৫৪ হাজার টাকা। প্রতিমাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা ঘাটতি থাকার পরেও কিভাবে তিনি এতো সম্পদের মালিক হলেন- তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

শুধু সম্পদ গড়া নয়; সে সম্পদ গোপন করতে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়ারও তথ্য মিলেছে আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে এই কর্মকর্তার অন্তত দুটি এনআইডি ও টিআইএন থাকার তথ্য মিলেছে।

বাংলা অ্যাফেয়ার্সের অনুসন্ধানে পাওয়া নথি বলছে, আয়কর রিটার্নে আবুল হোসেনের জাতীয় পরিচয়পত্র ও টিআইএন এ যে নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে তার সাথে মিল নেই জমির রেজিস্ট্রি, নামজারি ও অন্যান্য সরকারি নথিতে ব্যবহার করা এনআইডি ও টিআইএন এর। দুটি এনআইডি’র বিষয়ে তার নথিপত্রে স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি।

আবুল হোসেন তার আয়কর রিটার্নের সম্পত্তি বিবরণীতে অকৃষি জমির অর্জন মূল্য দেখিয়েছেন ৩ কোটি ২ লাখ ২৭ হাজার ৫৮১ টাকা। কিন্তু অনুসন্ধানে ঢাকা ও খুলনার বিভিন্ন এলাকায় আরও সম্পত্তির তথ্য সামনে এসেছে।

ঢাকার বাউনিয়া মৌজায় ১৩ দশমিক ৫৪ শতক জমির তথ্য পাওয়া গেছে। রাজধানীর দক্ষিণখান মৌজার দুটি দাগে রয়েছে ৮ দশমিক ২৪ শতক জমি। এছাড়া খুলনার দিঘলিয়ার চচর মৌজায় দুটি রেকর্ডে পাওয়া গেছে আরও ১০ দশমিক ৪৫ শতক জমি। সব মিলিয়ে তার আয়কর ফাইলে ৩২ দশমিক ২৩ শতক, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ১৯ কাঠা জমির তথ্য তিনি দিয়েছেন। এর বাহিরে তার নামে থাকা আরো প্রায় ৩৮০ কাঠা জমির তথ্য গোপন করার অভিযোগ উঠেছে।

শুধু জমিই নয়- সাভারে একটি এবং বাউনিয়ায় আরেকটি ফ্ল্যাটের তথ্যও রয়েছে। খুলনায় রয়েছে তিনটি টিনশেড বাণিজ্যিক দোকান।

অভিযোগ, এসব ফ্ল্যাট ও দোকান থেকে নিয়মিত ভাড়া আসে। কিন্তু আয়কর নথিতে এসব স্থাপনার অবস্থান, আয়তন, নির্মাণ ব্যয়, বর্তমান বাজারমূল্য কিংবা ভাড়া আয়ের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নেই।

অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, আয়কর রিটার্নে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, ব্যাংক স্টেটমেন্ট কিংবা ব্যাংক স্থিতির বিস্তারিত তথ্যও স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়নি। অথচ জমি কেনাবেচা, ভাড়া ও অন্যান্য লেনদেনের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে লেনদেন হয়েছে- তা যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আবুল হোসেনের আয়কর বিবরণীর হিসাব আরও বিস্ময় তৈরি করে। নথি অনুযায়ী তাঁর বার্ষিক করযোগ্য আয় ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৯৯ টাকা। অর্থাৎ মাসে প্রায় ২০ হাজার ৩৯৯ টাকা। কিন্তু বার্ষিক পারিবারিক ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা- মাসে প্রায় ৫৪ হাজার টাকা।

এর বিপরীতে প্রদর্শিত নিট সম্পদের পরিমাণ ৩ কোটি ৭৫ লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৭ টাকা। অর্থাৎ আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাবেই যেখানে বড় ব্যবধান, সেখানে কয়েক কোটি টাকার সম্পদের উৎস নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে।

নরসিংদী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সেবা নিতে আসা কয়েকজনের অভিযোগ, টাকা ছাড়া ফাইল ছাড়েন না এই কর্মকর্তা। তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দালালদের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।

অফিসের একাধিক সহকর্মীর দাবি, সরকারি চাকরির পাশাপাশি আবুল হোসেনের কথিত হোমিও ব্যবসা ও সম্পত্তি নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে আবুল হোসেনের দপ্তর এবং তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেও তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
অন্যদিকে অভিযোগের বিষয়ে নরসিংদী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারি পরিচালক মো. রাসেল আহমেদ শাহিন বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে জানান, তার বিরুদ্ধে লিখিত কোন অভিযোগ নেই। অভিযোগ পেলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আবুল হোসেনের জ্ঞাত আয় বর্হিভূত সম্পদ নিয়ে আমাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে চোখ রাখুন প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

মাসিক আয় ২০ হাজার, সম্পদ কয়েক কোটির

নরসিংদীর পাসপোর্ট কর্মকর্তা আবুলের তেলেসমাতি!

সর্বশেষ আপডেট ০২:১৮:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

সরকারি চাকরি। মাসিক আয় সীমিত। অথচ সম্পদের খাতায় যেন আলাদিনের প্রদীপ! একের পর এক জমি, ফ্ল্যাট, দোকান- কোটি কোটি টাকার সম্পদের তথ্য মিলেছে নরসিংদী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সুপারিনটেনডেন্ট মো. আবুল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী নাদিরা খাতুনের।

আয়কর রিটার্নে উল্লেখিত তথ্য এবং বাংলা অ্যাফেয়ার্সের অনুসন্ধানে এই কর্মকর্তার প্রায় ৪শ’ কাঠা জমির তথ্য মিলেছে। এছাড়া ঢাকা ও সাভারে দুটি ফ্ল্যাট, নিজস্ব জমিতে তিনটা দোকান। এর মধ্যে কিছু জমি স্ত্রী নাদিরা খাতুনের নামে। অথচ তাঁর স্ত্রীর আয়ের কোনো উৎস নেই। নিজের অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থকে বৈধতা দিতে নিজের জমি স্ত্রীর নামে হস্তান্তর করেছেন।

এখনেই থেমে থাকেননি এই কর্মকর্তা। নিজের শ্যালক শফিকুল ইসলামের নামেও সম্পদ গড়ার তথ্য মিলেছে অনুসন্ধানে। এসব সম্পদের বড় একটি অংশ এই কর্মকর্তা তার আয়কর রিটার্নে তথ্য গোপন করেছেন।

অথচ আয়কর রিটার্নে এই কর্মকর্তা মাসিক বেতন দেখিয়েছেন মাত্র ২০ হাজার ৩৯৯ টাকা। অন্যদিকে মাসিক পারিবারিক ব্যয় দেখিয়েছেন প্রায় ৫৪ হাজার টাকা। প্রতিমাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা ঘাটতি থাকার পরেও কিভাবে তিনি এতো সম্পদের মালিক হলেন- তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

শুধু সম্পদ গড়া নয়; সে সম্পদ গোপন করতে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়ারও তথ্য মিলেছে আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে এই কর্মকর্তার অন্তত দুটি এনআইডি ও টিআইএন থাকার তথ্য মিলেছে।

বাংলা অ্যাফেয়ার্সের অনুসন্ধানে পাওয়া নথি বলছে, আয়কর রিটার্নে আবুল হোসেনের জাতীয় পরিচয়পত্র ও টিআইএন এ যে নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে তার সাথে মিল নেই জমির রেজিস্ট্রি, নামজারি ও অন্যান্য সরকারি নথিতে ব্যবহার করা এনআইডি ও টিআইএন এর। দুটি এনআইডি’র বিষয়ে তার নথিপত্রে স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি।

আবুল হোসেন তার আয়কর রিটার্নের সম্পত্তি বিবরণীতে অকৃষি জমির অর্জন মূল্য দেখিয়েছেন ৩ কোটি ২ লাখ ২৭ হাজার ৫৮১ টাকা। কিন্তু অনুসন্ধানে ঢাকা ও খুলনার বিভিন্ন এলাকায় আরও সম্পত্তির তথ্য সামনে এসেছে।

ঢাকার বাউনিয়া মৌজায় ১৩ দশমিক ৫৪ শতক জমির তথ্য পাওয়া গেছে। রাজধানীর দক্ষিণখান মৌজার দুটি দাগে রয়েছে ৮ দশমিক ২৪ শতক জমি। এছাড়া খুলনার দিঘলিয়ার চচর মৌজায় দুটি রেকর্ডে পাওয়া গেছে আরও ১০ দশমিক ৪৫ শতক জমি। সব মিলিয়ে তার আয়কর ফাইলে ৩২ দশমিক ২৩ শতক, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ১৯ কাঠা জমির তথ্য তিনি দিয়েছেন। এর বাহিরে তার নামে থাকা আরো প্রায় ৩৮০ কাঠা জমির তথ্য গোপন করার অভিযোগ উঠেছে।

শুধু জমিই নয়- সাভারে একটি এবং বাউনিয়ায় আরেকটি ফ্ল্যাটের তথ্যও রয়েছে। খুলনায় রয়েছে তিনটি টিনশেড বাণিজ্যিক দোকান।

অভিযোগ, এসব ফ্ল্যাট ও দোকান থেকে নিয়মিত ভাড়া আসে। কিন্তু আয়কর নথিতে এসব স্থাপনার অবস্থান, আয়তন, নির্মাণ ব্যয়, বর্তমান বাজারমূল্য কিংবা ভাড়া আয়ের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নেই।

অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, আয়কর রিটার্নে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, ব্যাংক স্টেটমেন্ট কিংবা ব্যাংক স্থিতির বিস্তারিত তথ্যও স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়নি। অথচ জমি কেনাবেচা, ভাড়া ও অন্যান্য লেনদেনের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে লেনদেন হয়েছে- তা যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আবুল হোসেনের আয়কর বিবরণীর হিসাব আরও বিস্ময় তৈরি করে। নথি অনুযায়ী তাঁর বার্ষিক করযোগ্য আয় ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৯৯ টাকা। অর্থাৎ মাসে প্রায় ২০ হাজার ৩৯৯ টাকা। কিন্তু বার্ষিক পারিবারিক ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা- মাসে প্রায় ৫৪ হাজার টাকা।

এর বিপরীতে প্রদর্শিত নিট সম্পদের পরিমাণ ৩ কোটি ৭৫ লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৭ টাকা। অর্থাৎ আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাবেই যেখানে বড় ব্যবধান, সেখানে কয়েক কোটি টাকার সম্পদের উৎস নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে।

নরসিংদী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সেবা নিতে আসা কয়েকজনের অভিযোগ, টাকা ছাড়া ফাইল ছাড়েন না এই কর্মকর্তা। তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দালালদের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।

অফিসের একাধিক সহকর্মীর দাবি, সরকারি চাকরির পাশাপাশি আবুল হোসেনের কথিত হোমিও ব্যবসা ও সম্পত্তি নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে আবুল হোসেনের দপ্তর এবং তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেও তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
অন্যদিকে অভিযোগের বিষয়ে নরসিংদী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারি পরিচালক মো. রাসেল আহমেদ শাহিন বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে জানান, তার বিরুদ্ধে লিখিত কোন অভিযোগ নেই। অভিযোগ পেলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আবুল হোসেনের জ্ঞাত আয় বর্হিভূত সম্পদ নিয়ে আমাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে চোখ রাখুন প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে।