ঢাকা ০৬:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খুলনায় ধানের প্রতিমায় দেবী দুর্গা, ইতিহাস ও ধর্মীয় আখ্যান

তারিক লিটু, খুলনা
  • সর্বশেষ আপডেট ০২:০৩:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
  • / 72

খুলনায় ধানের প্রতিমায় দেবী দুর্গা

ধান দিয়ে তৈরি দেবী দুর্গার প্রতিমা, ১৫২টি প্রতিমায় ধর্মীয় উপাখ্যান ও ইতিহাসের নানা চিত্র; ব্যতিক্রমী সব আয়োজনের মধ্য দিয়ে খুলনায় উদযাপিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসব। নান্দনিক প্রতিমা, বর্ণিল আলোকসজ্জা ও ঐতিহ্যনির্ভর মণ্ডপসজ্জায় দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছে মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ।

খুলনা নগরীর বাগমারা তেঁতুলতলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরে প্রায় ৩০ কেজি চিনিগুঁড়া ধান দিয়ে সাজানো হয়েছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। অন্যদিকে, ডুমুরিয়া উপজেলার মিকশিমিল সাহাপাড়া সার্বজনীন পূজা মন্দিরে ১৫২টি প্রতিমার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে ধর্মীয় কাহিনি, ঐতিহাসিক ঘটনা ও সমাজজীবনের নানা দিক।

রোববার (১৮ অক্টোবর) মহাসপ্তমীতে খুলনা মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্ত-দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। আয়োজকদের ভাষ্য, সন্ধ্যার পর বিভিন্ন মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে।

ধানের প্রতিমায় ব্যতিক্রমী আয়োজন

বাগমারা তেঁতুলতলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরের প্রায় অর্ধশত বছরের ঐতিহ্যের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে ধান দিয়ে প্রতিমা সাজানোর ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। চার ভাস্করের দেড় মাসের পরিশ্রমে তৈরি প্রতিমাটি সাজাতে ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ৩০ কেজি চিনিগুঁড়া ধান।

মাটির কাঠামোর ওপর ধান বসিয়ে পরে সোনালি রং প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিমাটিকে দেওয়া হয়েছে বিশেষ রূপ। আয়োজকদের দাবি, খুলনা অঞ্চলে এ ধরনের প্রতিমা নির্মাণের উদ্যোগ এবারই প্রথম।

মন্দির পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুমন রায় বলেন, ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নতুন কিছু উপহার দেওয়ার চিন্তা থেকেই ধান দিয়ে প্রতিমা সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও পরিশ্রমের পর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

প্রতিমায় প্রতিমায় ইতিহাস ও ধর্মীয় আখ্যান

ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া ইউনিয়নের মিকশিমিল সাহাপাড়া সার্বজনীন পূজা মন্দিরে এবার ১৫২তম দুর্গোৎসব উপলক্ষে নির্মাণ করা হয়েছে ১৫২টি প্রতিমা। এগুলোর মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে বিভিন্ন ধর্মীয় উপাখ্যান, দেবদেবীর লীলাকথা এবং ঐতিহাসিক ঘটনা।

আয়োজনের মধ্যে রয়েছে হনুমান, রাম-লক্ষণ-সীতা, শ্রীকৃষ্ণ-রাধা, জগন্নাথদেবের রথযাত্রা, দেবী দুর্গা ও কালীসহ বিভিন্ন প্রতিমা। পাশাপাশি স্থান পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে স্বামী বিবেকানন্দের ঐতিহাসিক ভাষণের দৃশ্য।

মন্দিরের কোষাধ্যক্ষ সুমন শীল বলেন, প্রতিবছরই তাঁরা ব্যতিক্রমী আয়োজনের চেষ্টা করেন। এবার ১৫২তম পূজা উপলক্ষে ১৫২টি প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে। ধর্মীয় ইতিহাস ও মূল্যবোধ সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করাই এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

খুলনায় ৯৬৬ মণ্ডপে দুর্গাপূজা

খুলনা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এবার মহানগরীর ৭৬টিসহ জেলার নয়টি উপজেলায় মোট ৯৬৬টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

উপজেলাগুলোর মধ্যে ডুমুরিয়ায় সর্বাধিক ২২৬টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া পাইকগাছায় ১৫১টি, বটিয়াঘাটায় ১০৮টি, তেরখাদায় ৯৭টি, দাকোপে ৮১টি, রূপসায় ৭৬টি, দিঘলিয়ায় ৬১টি, কয়রায় ৫৭টি এবং ফুলতলায় ৩৩টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হচ্ছে।

মহানগরীর পাঁচ থানার মধ্যে খুলনা সদরে ২৬টি, দৌলতপুরে ২০টি, সোনাডাঙ্গায় ১১টি, খালিশপুরে ১১টি এবং খানজাহান আলী থানায় আটটি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে।

দুর্গোৎসবে নিরাপত্তায় পুলিশ ও এসআরবি-৬

দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন রাখতে খুলনা মহানগরীতে ১ হাজার ২০০-এর বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। মণ্ডপের গুরুত্ব ও ঝুঁকি বিবেচনায় তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান।

রোববার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব তথ্য জানান। এ সময় তিনি পূজারি ও আয়োজকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

এর আগে শনিবার (১৭ অক্টোবর) খুলনার ঐতিহ্যবাহী ধর্মসভা মন্দিরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পরিদর্শন করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-৬ (এসআরবি-৬)। ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিস্তার আহমেদ এ সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করেন এবং সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।

এসআরবি-৬ জানিয়েছে, খুলনা জেলা ও মহানগরীর ৩৯৪টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় নিয়মিত টহল, অস্থায়ী চেকপোস্ট, গোয়েন্দা নজরদারি এবং রিজার্ভ ফোর্স প্রস্তুত রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পূজা উদ্‌যাপন কমিটি, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে দুর্গোৎসব সম্পন্ন হবে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

খুলনায় ধানের প্রতিমায় দেবী দুর্গা, ইতিহাস ও ধর্মীয় আখ্যান

সর্বশেষ আপডেট ০২:০৩:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

ধান দিয়ে তৈরি দেবী দুর্গার প্রতিমা, ১৫২টি প্রতিমায় ধর্মীয় উপাখ্যান ও ইতিহাসের নানা চিত্র; ব্যতিক্রমী সব আয়োজনের মধ্য দিয়ে খুলনায় উদযাপিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসব। নান্দনিক প্রতিমা, বর্ণিল আলোকসজ্জা ও ঐতিহ্যনির্ভর মণ্ডপসজ্জায় দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছে মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ।

খুলনা নগরীর বাগমারা তেঁতুলতলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরে প্রায় ৩০ কেজি চিনিগুঁড়া ধান দিয়ে সাজানো হয়েছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। অন্যদিকে, ডুমুরিয়া উপজেলার মিকশিমিল সাহাপাড়া সার্বজনীন পূজা মন্দিরে ১৫২টি প্রতিমার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে ধর্মীয় কাহিনি, ঐতিহাসিক ঘটনা ও সমাজজীবনের নানা দিক।

রোববার (১৮ অক্টোবর) মহাসপ্তমীতে খুলনা মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্ত-দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। আয়োজকদের ভাষ্য, সন্ধ্যার পর বিভিন্ন মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে।

ধানের প্রতিমায় ব্যতিক্রমী আয়োজন

বাগমারা তেঁতুলতলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরের প্রায় অর্ধশত বছরের ঐতিহ্যের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে ধান দিয়ে প্রতিমা সাজানোর ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। চার ভাস্করের দেড় মাসের পরিশ্রমে তৈরি প্রতিমাটি সাজাতে ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ৩০ কেজি চিনিগুঁড়া ধান।

মাটির কাঠামোর ওপর ধান বসিয়ে পরে সোনালি রং প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিমাটিকে দেওয়া হয়েছে বিশেষ রূপ। আয়োজকদের দাবি, খুলনা অঞ্চলে এ ধরনের প্রতিমা নির্মাণের উদ্যোগ এবারই প্রথম।

মন্দির পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুমন রায় বলেন, ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নতুন কিছু উপহার দেওয়ার চিন্তা থেকেই ধান দিয়ে প্রতিমা সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও পরিশ্রমের পর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

প্রতিমায় প্রতিমায় ইতিহাস ও ধর্মীয় আখ্যান

ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া ইউনিয়নের মিকশিমিল সাহাপাড়া সার্বজনীন পূজা মন্দিরে এবার ১৫২তম দুর্গোৎসব উপলক্ষে নির্মাণ করা হয়েছে ১৫২টি প্রতিমা। এগুলোর মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে বিভিন্ন ধর্মীয় উপাখ্যান, দেবদেবীর লীলাকথা এবং ঐতিহাসিক ঘটনা।

আয়োজনের মধ্যে রয়েছে হনুমান, রাম-লক্ষণ-সীতা, শ্রীকৃষ্ণ-রাধা, জগন্নাথদেবের রথযাত্রা, দেবী দুর্গা ও কালীসহ বিভিন্ন প্রতিমা। পাশাপাশি স্থান পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে স্বামী বিবেকানন্দের ঐতিহাসিক ভাষণের দৃশ্য।

মন্দিরের কোষাধ্যক্ষ সুমন শীল বলেন, প্রতিবছরই তাঁরা ব্যতিক্রমী আয়োজনের চেষ্টা করেন। এবার ১৫২তম পূজা উপলক্ষে ১৫২টি প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে। ধর্মীয় ইতিহাস ও মূল্যবোধ সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করাই এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

খুলনায় ৯৬৬ মণ্ডপে দুর্গাপূজা

খুলনা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এবার মহানগরীর ৭৬টিসহ জেলার নয়টি উপজেলায় মোট ৯৬৬টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

উপজেলাগুলোর মধ্যে ডুমুরিয়ায় সর্বাধিক ২২৬টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া পাইকগাছায় ১৫১টি, বটিয়াঘাটায় ১০৮টি, তেরখাদায় ৯৭টি, দাকোপে ৮১টি, রূপসায় ৭৬টি, দিঘলিয়ায় ৬১টি, কয়রায় ৫৭টি এবং ফুলতলায় ৩৩টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হচ্ছে।

মহানগরীর পাঁচ থানার মধ্যে খুলনা সদরে ২৬টি, দৌলতপুরে ২০টি, সোনাডাঙ্গায় ১১টি, খালিশপুরে ১১টি এবং খানজাহান আলী থানায় আটটি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে।

দুর্গোৎসবে নিরাপত্তায় পুলিশ ও এসআরবি-৬

দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন রাখতে খুলনা মহানগরীতে ১ হাজার ২০০-এর বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। মণ্ডপের গুরুত্ব ও ঝুঁকি বিবেচনায় তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান।

রোববার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব তথ্য জানান। এ সময় তিনি পূজারি ও আয়োজকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

এর আগে শনিবার (১৭ অক্টোবর) খুলনার ঐতিহ্যবাহী ধর্মসভা মন্দিরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পরিদর্শন করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-৬ (এসআরবি-৬)। ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিস্তার আহমেদ এ সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করেন এবং সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।

এসআরবি-৬ জানিয়েছে, খুলনা জেলা ও মহানগরীর ৩৯৪টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় নিয়মিত টহল, অস্থায়ী চেকপোস্ট, গোয়েন্দা নজরদারি এবং রিজার্ভ ফোর্স প্রস্তুত রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পূজা উদ্‌যাপন কমিটি, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে দুর্গোৎসব সম্পন্ন হবে।