সমান অধিকার ও নিরাপদ পরিবেশ চায় কন্যাশিশুরা
- সর্বশেষ আপডেট ০৫:২২:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
- / 94
বাল্যবিবাহ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং কন্যাশিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সংলাপে। অনুষ্ঠানে নিজেদের অধিকার, বৈষম্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কন্যাশিশুরা।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুর-২-এর আলোক অডিটোরিয়ামে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) এ সংলাপের আয়োজন করে। ‘বাল্যবিবাহ বন্ধ করি, কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিতে বিনিয়োগ করি’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কন্যাশিশু, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল কন্যাশিশুদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরা। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অনলাইন পরিসরে বৈষম্য, সামাজিক বাধা, নিরাপত্তাহীনতা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার পথে নানা প্রতিবন্ধকতার কথা জানায় তারা।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, কন্যাশিশুদের সাফল্য উদ্যাপনের পাশাপাশি তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে বাধাগুলো দূর করতে হবে। শুধু মেয়েরা বিশ্বজয় করবে; এমন কথা বললেই হবে না; সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ কীভাবে তৈরি করা হচ্ছে, তা নিয়েও ভাবতে হবে।
তিনি বলেন, বাল্যবিবাহ কন্যাশিশুর মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এর ফলে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া, শিক্ষা গ্রহণ, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া ও ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাধাগ্রস্ত হয়। দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং বিকল্প সুযোগের অভাবে অনেক পরিবার মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সহকারী প্রকল্প ব্যবস্থাপক লাইসা মাহমুদ হেমা। ইউনিসেফ, ইউএনএফপিএ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপের তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, বাংলাদেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। তাঁদের মধ্যে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়সের আগেই।
তিনি আরও জানান, প্রাথমিক স্তরে শিক্ষা সমাপ্তির হার ৯১ দশমিক ৩ শতাংশ হলেও নিম্নমাধ্যমিকে তা কমে ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশে এবং উচ্চমাধ্যমিকে ৪১ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসে। কন্যাশিশুদের শিক্ষা, সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং নিজেদের জীবনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন তিয়াশা ইদরাক।
সংলাপে অংশ নিয়ে সেরাক বাংলাদেশের সুমাইয়া আক্তার বলেন, শিক্ষা ও নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শিক্ষার সুযোগ ছাড়া মেয়েদের পক্ষে স্বাধীনভাবে ও সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।
মায়ের আঁচলের সাদিয়া আক্তার ইভা বিদ্যালয়ে খেলাধুলার ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে বৈষম্যের কথা তুলে ধরেন। আশ্রয়কেন্দ্রে থেকে পড়াশোনা করা এই কিশোরী জানান, খেলাধুলার জন্য ছেলেরা তুলনামূলক বেশি সময় ও সুযোগ-সুবিধা পায়।
বিআইএসসির শিক্ষার্থী তাসনিম ফেরদৌসী বলেন, বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছালেই সমাজের অনেকেই একটি মেয়েকে বিয়ের উপযুক্ত মনে করে। অথচ ১৬ বা ১৭ বছর বয়সী একটি মেয়ে মানসিকভাবে পরিণত হওয়ার আগেই তার ওপর সংসার পরিচালনা ও সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়। খেলাধুলায় ছেলেদের দলকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
উখাইনু মারমা মাসিক নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার, জাতিগত বৈষম্য এবং মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্য অংশগ্রহণকারীরা বিদ্যালয়ে যাতায়াত, মাসিক স্বাস্থ্যসামগ্রী সংগ্রহের অসুবিধা এবং ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার অভিজ্ঞতা জানান।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কিশোরী আয়েশা আক্তার প্রতিবন্ধী কন্যাশিশুদের জন্য ব্রেইল ও অডিও শিক্ষাসামগ্রীসহ উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী কন্যাশিশুদের করুণা নয়, প্রয়োজন সমান অধিকার ও সুযোগ। অন্যান্য দেশে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নানা বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ পেলেও বাংলাদেশে এমন সুযোগ পাওয়া অনেকের কাছে এখনো স্বপ্ন।
এসএফএক্স গ্রিনহেরাল্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষার্থী ওয়াদিফা রহমান অপ্সরা প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা সমাপ্তির হার কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। ছেলে ও মেয়েদের শিক্ষায় সমান বিনিয়োগ এবং এ ক্ষেত্রে সফল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো ও বাল্যবিবাহ কমাতে সরকার, সমাজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানা, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ডিরেক্টর, ইনফ্লুয়েন্সিং ক্যাম্পেইন অ্যান্ড কমিউনিকেশনস নিশাত সুলতানা এবং সেরাক বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এস এম সৈকত।
বক্তারা বলেন, পড়াশোনা ও খেলাধুলায় মেয়েদের উল্লেখযোগ্য অর্জন থাকলেও দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক পরিবার মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেয়। বাল্যবিবাহের মূল কারণগুলো দূর করতে পরিবার, সমাজ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। অনুষ্ঠানে মায়ের আঁচলের শিশুদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হয়।
সমাপনী বক্তব্যে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের লিড, ইয়ুথ অ্যান্ড সোশ্যাল কোহেশন ওয়াসিউর রহমান তন্ময় অংশগ্রহণকারী কন্যাশিশু, সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের ধন্যবাদ জানান। এ সময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা, সুইজারল্যান্ড দূতাবাস, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এবং নাগরিকতা সিইএফের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
শুধু সচেতনতামূলক প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না থেকে কন্যাশিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া, সহিংসতামুক্ত জীবনযাপন এবং সমাজের সব ক্ষেত্রে সমান অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।



























