ঢাকা ০৪:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুন্দরবন কি এলএনজি টার্মিনালের ঝুঁকি নিতে পারবে?

তারিক লিটু
  • সর্বশেষ আপডেট ০২:৩৬:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
  • / 34

তারিক লিটু

জ্বালানি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। শিল্পকারখানা সচল রাখা, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরিতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সেই জ্বালানির ব্যবস্থা করতে গিয়ে যদি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ সুন্দরবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়, তাহলে উন্নয়নের সেই পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারণ উন্নয়ন মানুষের জীবনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য, মানুষের বেঁচে থাকার প্রাকৃতিক ভিত্তিকে বিপন্ন করার জন্য নয়।

সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনের আকরাম পয়েন্টে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা এমনই একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে। প্রস্তাবিত টার্মিনাল থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস নেওয়া হবে মোংলায়। পরে তা ব্যবহার করা হবে অর্থনৈতিক অঞ্চলের শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে। অর্থনৈতিক বিবেচনায় এই উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে। কিন্তু সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল প্রতিবেশব্যবস্থার মধ্যে এমন অবকাঠামো নির্মাণের আগে এর সম্ভাব্য পরিবেশগত ক্ষতি কতটা হতে পারে, তা গভীরভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

সুন্দরবন শুধু বন নয়, উপকূলের রক্ষাকবচ

সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি উপকূলের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ, অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল এবং লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অমূল্য সম্পদ। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের অভিঘাত মোকাবিলায় এই বনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একই সঙ্গে বাঘ, হরিণ, কুমির, ডলফিন, মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি ও অসংখ্য প্রজাতির প্রাণীর জীবন নির্ভর করে এর নদী, খাল ও স্থলভাগের স্বাভাবিক পরিবেশের ওপর। জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালসহ বহু মানুষের জীবিকাও এই বনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে সুন্দরবনের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব শুধু বনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, ছড়িয়ে পড়বে উপকূলের মানুষের জীবনেও।

প্রস্তাবিত টার্মিনালের স্থান আকরাম পয়েন্ট পশুর ও শিবসা নদী এবং বঙ্গোপসাগরের সংযোগ এলাকার কাছাকাছি। এলাকাটি মোংলা বন্দরের বহির্নোঙর হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। আশপাশে বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য ও ডলফিনের বিচরণক্ষেত্র রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। গাঙ্গেয় ও ইরাবতী ডলফিনের মতো জলজ প্রাণীর জন্য নদী ও মোহনার স্বাভাবিক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন এলাকায় নতুন করে জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়ার আগে তাই পরিবেশগত ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।

নদী ও জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য জাহাজ চলাচল, গ্যাস খালাস, পাইপলাইন স্থাপন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হবে। এসব কার্যক্রমের ফলে নদীর পরিবেশে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের নকশা, প্রযুক্তি ও পরিচালনাপদ্ধতির ওপর। নির্মাণকাজের জন্য নদীর তলদেশ খনন করতে হলে পানির ঘোলাটে ভাব বাড়তে পারে, তলদেশের স্বাভাবিক পরিবেশে পরিবর্তন আসতে পারে। জাহাজের জ্বালানি বা তৈলাক্ত বর্জ্য নদীতে ছড়িয়ে পড়লেও জলজ প্রাণীর ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। আবার গ্যাস স্থানান্তর ও পাইপলাইন পরিচালনায় কোনো ত্রুটি দেখা দিলে তা পরিবেশ ও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এসব ক্ষতির মাত্রা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু সম্ভাব্য ঝুঁকি রয়েছে বলেই প্রকল্প শুরুর আগে সেগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে সুন্দরবনের মতো একটি সংবেদনশীল এলাকায় কোনো দুর্ঘটনা বা দূষণের প্রভাব কত দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে, তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

নদীর পরিবেশের সঙ্গে সুন্দরবনের মাছ, কাঁকড়া ও চিংড়ির জীবনচক্র গভীরভাবে সম্পর্কিত। নদীর পানির গুণমান নষ্ট হলে কিংবা মাছের প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব পড়তে পারে জলজ প্রাণীর ওপর। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে নদীনির্ভর জেলেদের জীবিকায়। যাঁদের সংসার চলে মাছ ও কাঁকড়া বিক্রির টাকায়, তাঁদের কাছে নদী দূষিত হওয়া মানে শুধু পরিবেশের ক্ষতি নয়; এটি আয় কমে যাওয়া, সংসার চালাতে কষ্ট হওয়া এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার বিষয়।

ডলফিনের বিষয়টিও এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। টার্মিনাল পরিচালনার কারণে জাহাজ চলাচল বাড়লে পানির নিচের শব্দ, জাহাজের ঢেউ এবং সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এসব বিষয় ডলফিনের চলাচল, যোগাযোগ ও খাদ্য অনুসন্ধানে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে মাছের আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্রের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ একটি প্রজাতির আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব কখনো কখনো পুরো খাদ্যশৃঙ্খলেই ছড়িয়ে পড়ে।

এলএনজি টার্মিনালের নিরাপত্তা ঝুঁকি

এলএনজি টার্মিনালের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার প্রশ্নটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এলএনজি মূলত মিথেনসমৃদ্ধ প্রাকৃতিক গ্যাস, যা তরল অবস্থায় সংরক্ষণ ও পরিবহন করা হয়। তরল এলএনজি নিজে সহজে জ্বলে ওঠে না; তবে তা বাষ্পে পরিণত হয়ে বাতাসের সঙ্গে দাহ্য মিশ্রণ তৈরি করলে আগুনের সংস্পর্শে জ্বলতে পারে। গ্যাস স্থানান্তরের সময় লিকেজ, কারিগরি ত্রুটি, জাহাজের সংঘর্ষ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো পরিস্থিতিতে গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি রয়েছে।

এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটবেই, এমন কথা বলা ঠিক হবে না। যথাযথ নকশা, আধুনিক প্রযুক্তি ও কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। কিন্তু সুন্দরবনের মতো দুর্গম এলাকায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কতটা সম্ভব হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর আগেই খুঁজতে হবে।

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকারডুবির ঘটনা আমাদের জন্য বড় শিক্ষা। ওই দুর্ঘটনায় নদীতে জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়েছিল এবং বনের পরিবেশ নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। একটি জাহাজ দুর্ঘটনা কীভাবে সুন্দরবনের নদী ও জলজ পরিবেশের জন্য সংকট তৈরি করতে পারে, সেই অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। তাই নতুন কোনো জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে শুধু স্বাভাবিক অবস্থায় কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা থাকলেই চলবে না; দুর্ঘটনা ঘটলে কীভাবে ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তারও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা থাকতে হবে।

পাইপলাইন নির্মাণেও ঝুঁকি বিবেচনা জরুরি

টার্মিনাল থেকে মোংলা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। পাইপলাইন কোন পথে যাবে, নদী বা খাল অতিক্রম করবে কি না, সুন্দরবনের কোনো অংশের মধ্য দিয়ে যাবে কি না এবং নির্মাণের জন্য কী ধরনের খননকাজ প্রয়োজন হবে; এসব তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও তলদেশের পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পাইপলাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কোথাও গ্যাস লিকেজ হলে কীভাবে তা শনাক্ত করা হবে এবং দ্রুত সরবরাহ বন্ধ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হবে, সেটিও স্পষ্ট করতে হবে।

সুন্দরবন ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য। এই স্বীকৃতি শুধু আন্তর্জাতিক পরিচিতির বিষয় নয়, বনের অসামান্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের দায়িত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলাদেশের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা এবং উচ্চ ঝুঁকির শিল্পপ্রকল্পের বিষয়ে বিধিনিষেধ ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রস্তাবিত টার্মিনালের সুনির্দিষ্ট অবস্থান, নকশা ও প্রযুক্তির ভিত্তিতে এসব বিধান কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিষ্কার করা উচিত। প্রকল্পটি সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে কি না, সেটিও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।

বিকল্প স্থান ও পরিবেশগত সমীক্ষা প্রয়োজন

প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে কি সুন্দরবনের কাছাকাছি কোনো উন্নয়নই করা যাবে না? অবশ্যই বিষয়টি এমন নয়। দেশের উন্নয়ন প্রয়োজন, শিল্পকারখানার জন্য জ্বালানি প্রয়োজন, কর্মসংস্থানও প্রয়োজন। কিন্তু উন্নয়নের পরিকল্পনা এমন হওয়া উচিত, যাতে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের পাশাপাশি প্রকৃতি ও মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর অগ্রহণযোগ্য ঝুঁকি তৈরি না হয়।

তাই আকরাম পয়েন্টের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ কোনো স্থানে টার্মিনাল নির্মাণ করা সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। পানির গভীরতা, জাহাজ চলাচল, বন্দরের দূরত্ব ও নির্মাণব্যয়ের পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকিকেও স্থান নির্বাচনের অন্যতম প্রধান বিবেচনা করতে হবে। বিকল্প কোনো স্থানে নির্মাণব্যয় কিছুটা বেশি হলেও যদি সুন্দরবনের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হয়, তাহলে সেই বিকল্পের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুবিধা তুলনামূলকভাবে মূল্যায়ন করা উচিত।

প্রকল্পটি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা প্রকাশ করা প্রয়োজন। সেখানে টার্মিনাল নির্মাণ, পাইপলাইন স্থাপন, জাহাজ চলাচল, পানির গুণমান, ডলফিনের বিচরণ, মাছের প্রজননক্ষেত্র এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরতে হবে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও জরুরি সাড়াব্যবস্থার সক্ষমতাও মূল্যায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় জেলে, বনজীবী, জনপ্রতিনিধি, পরিবেশবিদ ও গবেষকদের মতামত নিতে হবে। কারণ প্রকল্পের সম্ভাব্য ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন যাঁরা, তাঁদের মতামত উপেক্ষা করে এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

সবচেয়ে বড় কথা, উন্নয়নের লাভ-ক্ষতির হিসাব করতে গিয়ে শুধু গ্যাস সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন কিংবা শিল্পকারখানার সুবিধা বিবেচনা করলে চলবে না। নদীর মাছ কমে গেলে, ডলফিনের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য নষ্ট হলে তার দীর্ঘমেয়াদি মূল্যও বিবেচনায় নিতে হবে। এসব ক্ষতির সবকিছু অর্থ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। কোনো আবাসস্থল একবার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়াও কঠিন হতে পারে।

উন্নয়ন হোক, সুন্দরবনকে বিপন্ন করে নয়

জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের উপকূলে সুন্দরবনের গুরুত্ব অপরিসীম। এই বনকে রক্ষা করা মানে শুধু বন্য প্রাণী রক্ষা করা নয়; উপকূলের মানুষের জীবন, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ ধরে রাখাও।

সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্টে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে তাই তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না। প্রকল্পটির সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব, দুর্ঘটনার ঝুঁকি, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং বিকল্প স্থানগুলো সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, যাতে জ্বালানি সরবরাহের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি সুন্দরবনের ভবিষ্যৎও সুরক্ষিত থাকে।

আমরা জ্বালানি নিরাপত্তা চাই, শিল্পকারখানার বিকাশ চাই, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নও চাই। কিন্তু সেই উন্নয়নের জন্য সুন্দরবনের নদী, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকাকে অযথা ঝুঁকিতে ফেলতে চাই না। সুন্দরবন কোনো একটি প্রকল্পের জন্য তৈরি সম্পদ নয়; এটি আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, উপকূলের রক্ষাকবচ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়ার অমূল্য সম্পদ।

সুন্দরবনের বুকে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে তাই কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জরুরি: সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধার তুলনায় পরিবেশগত ঝুঁকি কতটা? অপেক্ষাকৃত নিরাপদ কোনো বিকল্প স্থান কি নেই? আর কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার ক্ষতি ও দায় কে বহন করবে?

এই প্রশ্নগুলোর নির্ভরযোগ্য উত্তর ছাড়া প্রকল্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। কারণ শিল্পকারখানার জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প খুঁজে পাওয়া সম্ভব হতে পারে, কিন্তু সুন্দরবনের অপূরণীয় ক্ষতি হলে সেই ক্ষতি পূরণ করা সহজ হবে না।

উন্নয়ন হোক, কিন্তু সেই উন্নয়ন যেন সুন্দরবনকে বিপন্ন না করে। জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রকৃতি ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই আমাদের এগোতে হবে। সুন্দরবন বেঁচে থাকলে উপকূল বাঁচবে, বাঁচবে এই অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা।

লেখক: সংবাদকর্মী ও প্রধান সমন্বয়ক, সুন্দরবন ইকো-রেজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভ।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

সুন্দরবন কি এলএনজি টার্মিনালের ঝুঁকি নিতে পারবে?

সর্বশেষ আপডেট ০২:৩৬:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

জ্বালানি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। শিল্পকারখানা সচল রাখা, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরিতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সেই জ্বালানির ব্যবস্থা করতে গিয়ে যদি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ সুন্দরবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়, তাহলে উন্নয়নের সেই পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারণ উন্নয়ন মানুষের জীবনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য, মানুষের বেঁচে থাকার প্রাকৃতিক ভিত্তিকে বিপন্ন করার জন্য নয়।

সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনের আকরাম পয়েন্টে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা এমনই একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে। প্রস্তাবিত টার্মিনাল থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস নেওয়া হবে মোংলায়। পরে তা ব্যবহার করা হবে অর্থনৈতিক অঞ্চলের শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে। অর্থনৈতিক বিবেচনায় এই উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে। কিন্তু সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল প্রতিবেশব্যবস্থার মধ্যে এমন অবকাঠামো নির্মাণের আগে এর সম্ভাব্য পরিবেশগত ক্ষতি কতটা হতে পারে, তা গভীরভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

সুন্দরবন শুধু বন নয়, উপকূলের রক্ষাকবচ

সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি উপকূলের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ, অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল এবং লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অমূল্য সম্পদ। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের অভিঘাত মোকাবিলায় এই বনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একই সঙ্গে বাঘ, হরিণ, কুমির, ডলফিন, মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি ও অসংখ্য প্রজাতির প্রাণীর জীবন নির্ভর করে এর নদী, খাল ও স্থলভাগের স্বাভাবিক পরিবেশের ওপর। জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালসহ বহু মানুষের জীবিকাও এই বনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে সুন্দরবনের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব শুধু বনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, ছড়িয়ে পড়বে উপকূলের মানুষের জীবনেও।

প্রস্তাবিত টার্মিনালের স্থান আকরাম পয়েন্ট পশুর ও শিবসা নদী এবং বঙ্গোপসাগরের সংযোগ এলাকার কাছাকাছি। এলাকাটি মোংলা বন্দরের বহির্নোঙর হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। আশপাশে বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য ও ডলফিনের বিচরণক্ষেত্র রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। গাঙ্গেয় ও ইরাবতী ডলফিনের মতো জলজ প্রাণীর জন্য নদী ও মোহনার স্বাভাবিক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন এলাকায় নতুন করে জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়ার আগে তাই পরিবেশগত ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।

নদী ও জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য জাহাজ চলাচল, গ্যাস খালাস, পাইপলাইন স্থাপন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হবে। এসব কার্যক্রমের ফলে নদীর পরিবেশে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের নকশা, প্রযুক্তি ও পরিচালনাপদ্ধতির ওপর। নির্মাণকাজের জন্য নদীর তলদেশ খনন করতে হলে পানির ঘোলাটে ভাব বাড়তে পারে, তলদেশের স্বাভাবিক পরিবেশে পরিবর্তন আসতে পারে। জাহাজের জ্বালানি বা তৈলাক্ত বর্জ্য নদীতে ছড়িয়ে পড়লেও জলজ প্রাণীর ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। আবার গ্যাস স্থানান্তর ও পাইপলাইন পরিচালনায় কোনো ত্রুটি দেখা দিলে তা পরিবেশ ও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এসব ক্ষতির মাত্রা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু সম্ভাব্য ঝুঁকি রয়েছে বলেই প্রকল্প শুরুর আগে সেগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে সুন্দরবনের মতো একটি সংবেদনশীল এলাকায় কোনো দুর্ঘটনা বা দূষণের প্রভাব কত দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে, তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

নদীর পরিবেশের সঙ্গে সুন্দরবনের মাছ, কাঁকড়া ও চিংড়ির জীবনচক্র গভীরভাবে সম্পর্কিত। নদীর পানির গুণমান নষ্ট হলে কিংবা মাছের প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব পড়তে পারে জলজ প্রাণীর ওপর। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে নদীনির্ভর জেলেদের জীবিকায়। যাঁদের সংসার চলে মাছ ও কাঁকড়া বিক্রির টাকায়, তাঁদের কাছে নদী দূষিত হওয়া মানে শুধু পরিবেশের ক্ষতি নয়; এটি আয় কমে যাওয়া, সংসার চালাতে কষ্ট হওয়া এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার বিষয়।

ডলফিনের বিষয়টিও এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। টার্মিনাল পরিচালনার কারণে জাহাজ চলাচল বাড়লে পানির নিচের শব্দ, জাহাজের ঢেউ এবং সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এসব বিষয় ডলফিনের চলাচল, যোগাযোগ ও খাদ্য অনুসন্ধানে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে মাছের আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্রের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ একটি প্রজাতির আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব কখনো কখনো পুরো খাদ্যশৃঙ্খলেই ছড়িয়ে পড়ে।

এলএনজি টার্মিনালের নিরাপত্তা ঝুঁকি

এলএনজি টার্মিনালের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার প্রশ্নটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এলএনজি মূলত মিথেনসমৃদ্ধ প্রাকৃতিক গ্যাস, যা তরল অবস্থায় সংরক্ষণ ও পরিবহন করা হয়। তরল এলএনজি নিজে সহজে জ্বলে ওঠে না; তবে তা বাষ্পে পরিণত হয়ে বাতাসের সঙ্গে দাহ্য মিশ্রণ তৈরি করলে আগুনের সংস্পর্শে জ্বলতে পারে। গ্যাস স্থানান্তরের সময় লিকেজ, কারিগরি ত্রুটি, জাহাজের সংঘর্ষ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো পরিস্থিতিতে গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি রয়েছে।

এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটবেই, এমন কথা বলা ঠিক হবে না। যথাযথ নকশা, আধুনিক প্রযুক্তি ও কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। কিন্তু সুন্দরবনের মতো দুর্গম এলাকায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কতটা সম্ভব হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর আগেই খুঁজতে হবে।

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকারডুবির ঘটনা আমাদের জন্য বড় শিক্ষা। ওই দুর্ঘটনায় নদীতে জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়েছিল এবং বনের পরিবেশ নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। একটি জাহাজ দুর্ঘটনা কীভাবে সুন্দরবনের নদী ও জলজ পরিবেশের জন্য সংকট তৈরি করতে পারে, সেই অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। তাই নতুন কোনো জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে শুধু স্বাভাবিক অবস্থায় কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা থাকলেই চলবে না; দুর্ঘটনা ঘটলে কীভাবে ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তারও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা থাকতে হবে।

পাইপলাইন নির্মাণেও ঝুঁকি বিবেচনা জরুরি

টার্মিনাল থেকে মোংলা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। পাইপলাইন কোন পথে যাবে, নদী বা খাল অতিক্রম করবে কি না, সুন্দরবনের কোনো অংশের মধ্য দিয়ে যাবে কি না এবং নির্মাণের জন্য কী ধরনের খননকাজ প্রয়োজন হবে; এসব তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও তলদেশের পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পাইপলাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কোথাও গ্যাস লিকেজ হলে কীভাবে তা শনাক্ত করা হবে এবং দ্রুত সরবরাহ বন্ধ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হবে, সেটিও স্পষ্ট করতে হবে।

সুন্দরবন ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য। এই স্বীকৃতি শুধু আন্তর্জাতিক পরিচিতির বিষয় নয়, বনের অসামান্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের দায়িত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলাদেশের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা এবং উচ্চ ঝুঁকির শিল্পপ্রকল্পের বিষয়ে বিধিনিষেধ ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রস্তাবিত টার্মিনালের সুনির্দিষ্ট অবস্থান, নকশা ও প্রযুক্তির ভিত্তিতে এসব বিধান কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিষ্কার করা উচিত। প্রকল্পটি সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে কি না, সেটিও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।

বিকল্প স্থান ও পরিবেশগত সমীক্ষা প্রয়োজন

প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে কি সুন্দরবনের কাছাকাছি কোনো উন্নয়নই করা যাবে না? অবশ্যই বিষয়টি এমন নয়। দেশের উন্নয়ন প্রয়োজন, শিল্পকারখানার জন্য জ্বালানি প্রয়োজন, কর্মসংস্থানও প্রয়োজন। কিন্তু উন্নয়নের পরিকল্পনা এমন হওয়া উচিত, যাতে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের পাশাপাশি প্রকৃতি ও মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর অগ্রহণযোগ্য ঝুঁকি তৈরি না হয়।

তাই আকরাম পয়েন্টের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ কোনো স্থানে টার্মিনাল নির্মাণ করা সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। পানির গভীরতা, জাহাজ চলাচল, বন্দরের দূরত্ব ও নির্মাণব্যয়ের পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকিকেও স্থান নির্বাচনের অন্যতম প্রধান বিবেচনা করতে হবে। বিকল্প কোনো স্থানে নির্মাণব্যয় কিছুটা বেশি হলেও যদি সুন্দরবনের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হয়, তাহলে সেই বিকল্পের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুবিধা তুলনামূলকভাবে মূল্যায়ন করা উচিত।

প্রকল্পটি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা প্রকাশ করা প্রয়োজন। সেখানে টার্মিনাল নির্মাণ, পাইপলাইন স্থাপন, জাহাজ চলাচল, পানির গুণমান, ডলফিনের বিচরণ, মাছের প্রজননক্ষেত্র এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরতে হবে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও জরুরি সাড়াব্যবস্থার সক্ষমতাও মূল্যায়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় জেলে, বনজীবী, জনপ্রতিনিধি, পরিবেশবিদ ও গবেষকদের মতামত নিতে হবে। কারণ প্রকল্পের সম্ভাব্য ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন যাঁরা, তাঁদের মতামত উপেক্ষা করে এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

সবচেয়ে বড় কথা, উন্নয়নের লাভ-ক্ষতির হিসাব করতে গিয়ে শুধু গ্যাস সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন কিংবা শিল্পকারখানার সুবিধা বিবেচনা করলে চলবে না। নদীর মাছ কমে গেলে, ডলফিনের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য নষ্ট হলে তার দীর্ঘমেয়াদি মূল্যও বিবেচনায় নিতে হবে। এসব ক্ষতির সবকিছু অর্থ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। কোনো আবাসস্থল একবার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়াও কঠিন হতে পারে।

উন্নয়ন হোক, সুন্দরবনকে বিপন্ন করে নয়

জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের উপকূলে সুন্দরবনের গুরুত্ব অপরিসীম। এই বনকে রক্ষা করা মানে শুধু বন্য প্রাণী রক্ষা করা নয়; উপকূলের মানুষের জীবন, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ ধরে রাখাও।

সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্টে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে তাই তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না। প্রকল্পটির সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব, দুর্ঘটনার ঝুঁকি, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং বিকল্প স্থানগুলো সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, যাতে জ্বালানি সরবরাহের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি সুন্দরবনের ভবিষ্যৎও সুরক্ষিত থাকে।

আমরা জ্বালানি নিরাপত্তা চাই, শিল্পকারখানার বিকাশ চাই, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নও চাই। কিন্তু সেই উন্নয়নের জন্য সুন্দরবনের নদী, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকাকে অযথা ঝুঁকিতে ফেলতে চাই না। সুন্দরবন কোনো একটি প্রকল্পের জন্য তৈরি সম্পদ নয়; এটি আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, উপকূলের রক্ষাকবচ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়ার অমূল্য সম্পদ।

সুন্দরবনের বুকে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে তাই কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জরুরি: সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধার তুলনায় পরিবেশগত ঝুঁকি কতটা? অপেক্ষাকৃত নিরাপদ কোনো বিকল্প স্থান কি নেই? আর কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার ক্ষতি ও দায় কে বহন করবে?

এই প্রশ্নগুলোর নির্ভরযোগ্য উত্তর ছাড়া প্রকল্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। কারণ শিল্পকারখানার জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প খুঁজে পাওয়া সম্ভব হতে পারে, কিন্তু সুন্দরবনের অপূরণীয় ক্ষতি হলে সেই ক্ষতি পূরণ করা সহজ হবে না।

উন্নয়ন হোক, কিন্তু সেই উন্নয়ন যেন সুন্দরবনকে বিপন্ন না করে। জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রকৃতি ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই আমাদের এগোতে হবে। সুন্দরবন বেঁচে থাকলে উপকূল বাঁচবে, বাঁচবে এই অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা।

লেখক: সংবাদকর্মী ও প্রধান সমন্বয়ক, সুন্দরবন ইকো-রেজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভ।