পোশাক খাতের জ্বালানি রূপান্তরে ব্র্যান্ডগুলোর অর্থায়ন দাবি
- সর্বশেষ আপডেট ০১:১৮:২৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
- / 46
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের ব্যয় বহনে বৈশ্বিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর আর্থিক অংশীদারত্ব নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা। একই সঙ্গে জ্বালানি রূপান্তরের নামে শ্রমিকদের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ না দিয়ে তাঁদের কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর লেকশোর হোটেলে ‘ফ্রম ফ্রেমওয়ার্ক টু অ্যাকশন: অ্যাডভান্সিং অ্যা মাল্টি-স্টেকহোল্ডার ইনিশিয়েটিভ ফর অ্যা জাস্ট ট্রানজিশন ইন বাংলাদেশস ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে এসব দাবি উঠে আসে।
স্ট্যান্ড.আর্থ, অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশ ও ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের (বিটিএস) যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত সংলাপে সরকারের নীতিনির্ধারক, ফ্যাশন ব্র্যান্ড, পোশাক প্রস্তুতকারক, ট্রেড ইউনিয়ন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), জিআইজেড এবং কর্নেল ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে স্ট্যান্ড.আর্থ তাদের ‘ক্লিন ফ্যাশন ইনভেস্টমেন্ট প্যাক্ট’ বা পরিচ্ছন্ন ফ্যাশন বিনিয়োগ চুক্তি তুলে ধরে। পাশাপাশি নারী শ্রমিকদের সুরক্ষা, জ্বালানি রূপান্তরে অর্থায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে দুটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
অ্যাপারেল ইমপ্যাক্ট ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব ফ্যাশন খাতে কার্বন নিঃসরণ ২০২৩ সালে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে আরও ৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে এ খাতে বছরে প্রায় ১০০ কোটি টন কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে। বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা নবম শীর্ষ দেশ। দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের বড় অংশ নারী। তাঁরা ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ ও বন্যার মতো জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি রূপান্তর শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; এটি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক পরিবর্তনের বিষয়। শিল্পকে পরিবেশবান্ধব করার পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, জ্বালানি রূপান্তরের ব্যয় বহন করতে হচ্ছে শিল্প ও শ্রমিকদের। কিন্তু এই পরিবর্তনের সুবিধা কারা পাচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
স্ট্যান্ড.আর্থ রিসার্চ গ্রুপের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৫টি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড সম্মিলিতভাবে কাজ করলে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বছরে ১২ লাখ ৬০ হাজার টন এবং সামগ্রিকভাবে ৮৫ লাখ ৯০ হাজার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানো সম্ভব। এই পরিমাণ নিঃসরণ উত্তর আমেরিকার ৩০ লাখের বেশি বাড়ির এক বছরের কার্বন নিঃসরণের সমান।
স্ট্যান্ড.আর্থের সিনিয়র ক্যাম্পেইন ম্যানেজার র্যাচেল কিচিন বলেন, কার্বন নিঃসরণ কমানো ও শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যয়ে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর ন্যায্য অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য যৌথ বিনিয়োগ, অংশীদারত্বভিত্তিক অর্থায়ন এবং অনুদানভিত্তিক প্রকল্প চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি জলবায়ু সুরক্ষায় জাতীয় বা বৈশ্বিক তহবিল গঠনের উদ্যোগেও ব্র্যান্ডগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
বিজিএমইএর পরিচালক রুমানা রশীদ বলেন, কারখানাগুলো পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, জ্বালানিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ও নতুন উৎপাদন পদ্ধতি গ্রহণ করলে শ্রমিকদেরও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে। তাঁদের প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
‘২০২৫ ফসিল ফ্রি ফ্যাশন স্কোরকার্ড’-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৪২টি প্রধান ব্র্যান্ডের মধ্যে মাত্র ছয়টি তাদের সরবরাহকারীদের কার্বন নিঃসরণ কমাতে অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে মাত্র একটি ব্র্যান্ড ঋণের বোঝা ছাড়াই অর্থায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে পোশাক খাতের ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় ৯০ শতাংশ এখনো কারখানায় পোড়ানো জীবাশ্ম গ্যাস থেকে আসে।
অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ইউনিটের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান মো. আতোয়ার রহমান বলেন, জলবায়ু সুবিচার ও অর্থনৈতিক সুবিচার পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার ব্যয় যেন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর না পড়ে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
সংলাপে জানানো হয়, বৈশ্বিক জলবায়ু দূষণের প্রায় ৪ শতাংশের জন্য দায়ী ফ্যাশন খাত। এ খাতের উৎপাদনব্যবস্থা এখনো কয়লা ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এতে পরিবেশের পাশাপাশি শ্রমিক ও আশপাশের জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ২০২১ সালে হার্ভার্ডের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী প্রতি পাঁচটি মৃত্যুর একটির সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট বায়ুদূষণের সম্পর্ক রয়েছে।
ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানা বলেন, কারখানার মালিকদের একার পক্ষে জ্বালানি রূপান্তরের ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। ন্যায্য ও টেকসই পরিবর্তনের জন্য সরকার, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, উন্নয়ন সহযোগী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
সংলাপের শেষ পর্যায়ে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোকে ‘ক্লিন ফ্যাশন ইনভেস্টমেন্ট প্যাক্ট’-এ যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে সরবরাহকারীদের জন্য অনুদানভিত্তিক ও যৌথ অর্থায়ন, পণ্যের ক্রয়মূল্যে কার্বন নিঃসরণ কমানোর ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা, শ্রমিকদের তাপপ্রবাহ থেকে সুরক্ষা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী শ্রমিকদের মতামত নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।































