ঢাকা ০৯:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সুন্দরবন উপকূলে স্বাস্থ্যসেবার সংকট: সমাধান কোথায়?

তারিক লিটু
  • সর্বশেষ আপডেট ০৭:১৯:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
  • / 188

তারিক লিটু

আমার দাদা সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে ২০০৭ সালে বাঘের আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। বাঘের সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই করে তিনি বেঁচে ফিরেছিলেন। অন্য মৌয়ালি ও জেলেদের সহযোগিতায় তাঁকে সুন্দরবন থেকে লোকালয়ে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু ততক্ষণে তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। প্রয়োজন ছিল দ্রুত উন্নত চিকিৎসার। অথচ তখন খুলনার কয়রায় গুরুতর আহত রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় মানের হাসপাতাল ও সুযোগ-সুবিধা ছিল না। ফলে তাঁকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরের জেলা সদরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি বেঁচে ফিরেছিলেন।

কিন্তু আমার পরিবারের আরেকজন দাদা সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু আজও মনে করিয়ে দেয়, সুন্দরবনের সঙ্গে জীবিকা জড়িয়ে থাকা মানুষের জীবন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে মনে প্রশ্ন জাগে, দুর্ঘটনার পরপরই যদি কাছাকাছি উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকত, তাহলে কি আরও অনেক মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হতো?

আমার পরিবারের এই অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া জেলে, মধু সংগ্রহকারী মৌয়ালি ও অন্যান্য বনজীবী প্রতিনিয়ত নানা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। তাঁদের কেউ বাঘের আক্রমণের শিকার হন, কেউ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন।

সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে মানুষের মৃত্যুর পরিসংখ্যানই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বন বিভাগের তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ২৫ বছরে সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে ৪২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে আহত হয়েছেন অন্তত ৯৫ জন। তবে বন বিভাগের নথির বাইরে আরও কিছু ঘটনা থেকে থাকতে পারে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাঘের আক্রমণে মানুষের মৃত্যুর পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, জীবিকার জন্য সংগ্রাম করা একজন মানুষ এবং তাঁর ওপর নির্ভরশীল স্বজনদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। একজন মৌয়াল বা জেলে বনে গিয়ে বাঘের আক্রমণের শিকার হলে তাঁর পরিবার শুধু উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারানোর আশঙ্কায় পড়ে না, অনেক ক্ষেত্রে তাদের সামনে নেমে আসে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটও। কিন্তু বিপদের মুহূর্তে দ্রুত ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ কতটুকু রয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সামনে আসে। বিশেষ করে খুলনার কয়রা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার মানুষের জন্য আধুনিক চিকিৎসাসেবার সুযোগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে দাকোপ ও পাইকগাছাসহ সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার মানুষের চিকিৎসার প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দিকে তাকালে সংকটের একটি চিত্র পাওয়া যায়। হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও বাস্তবে ১৯ শয্যার অবকাঠামোয় চিকিৎসাসেবা চলছে। ছয় বছর আগে ৩১ শয্যার পুরোনো ভবনটি ভেঙে ফেলার পর নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অবকাঠামোগত সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে রোগীদের সেবা দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে জনবল ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিয়ে নানা অভিযোগ।

কয়রা উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মানুষ এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য হাসপাতালে পৌঁছানোই অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। দক্ষিণ বেদকাশীসহ দূরবর্তী এলাকার মানুষকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। গুরুতর রোগীকে খুলনা শহরে নিতে হলে দূরত্ব, যাতায়াতের সময় ও পরিবহন ব্যয়, সব মিলিয়ে পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

কয়রা থেকে খুলনা শহরের দূরত্ব প্রায় ১২০ কিলোমিটার। এই দূরত্ব শুধু মানচিত্রের হিসাব নয়; জরুরি রোগীর ক্ষেত্রে এটি সময়ের হিসাবও। একজন অসচ্ছল পরিবারের সদস্যের পক্ষে দ্রুত গাড়ি ভাড়া করে রোগীকে দূরের হাসপাতালে নেওয়া সব সময় সম্ভব হয় না। আবার সড়ক বা নৌপথে যোগাযোগ ব্যাহত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। প্রশ্ন হচ্ছে, উপকূলের মানুষকে কি প্রতিটি গুরুতর অসুস্থতার সময় জেলা শহরের ওপর নির্ভর করতে হবে? উপজেলা পর্যায়ে এমন চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলা কি সম্ভব নয়, যেখানে অন্তত জরুরি চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রসূতিসেবা ও প্রাথমিক অস্ত্রোপচারের সুযোগ থাকবে?

সুন্দরবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের জীবন-জীবিকা। জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের অনেকে জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করেন। বনের ভেতরে তাঁদের বিপদের ঝুঁকি যেমন রয়েছে, তেমনি দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগও সীমিত। বাঘের আক্রমণে গুরুতর আহত ব্যক্তির ক্ষেত্রে দ্রুত রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ, ক্ষত পরিচর্যা, প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার এবং রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু দুর্গম বনাঞ্চল থেকে রোগী উদ্ধার, নৌপথে পরিবহন এবং পরে সড়কপথে হাসপাতালে নেওয়ার প্রতিটি ধাপেই সময় লাগতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে স্থানীয় পর্যায়ে জরুরি চিকিৎসার সক্ষমতা থাকলে রোগীকে প্রাথমিকভাবে স্থিতিশীল করা সম্ভব হতে পারে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নত হাসপাতালে পাঠানো যাবে। তবে সব ধরনের চিকিৎসা স্থানীয় পর্যায়ে করা সম্ভব নয়। সে জন্য কোন হাসপাতালে কী ধরনের চিকিৎসা থাকবে এবং গুরুতর রোগীকে কোথায় পাঠানো হবে, তা আগেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই ব্যবস্থা কাজে আসবে সাপের কামড়, নৌদুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রসূতি জটিলতার ক্ষেত্রেও। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার গর্ভবতী নারীকে জরুরি সময়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জীবনকে কঠিন করে তুলছে। সুপেয় পানির সংকট এবং দুর্যোগের পর নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও প্রস্তুত ও সহনশীল করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় ও খরাপ্রবণ অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। ফলে উপকূলের স্বাস্থ্য অবকাঠামো পরিকল্পনার সময় স্থানীয় পরিবেশগত বাস্তবতা ও দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
ঘূর্ণিঝড়ের সময় কিংবা এর পরপরই হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়ে যেতে পারে। আহত মানুষের পাশাপাশি ডায়রিয়া, জ্বর, পানিবাহিত রোগ ও অন্যান্য সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরাও চিকিৎসার প্রয়োজন অনুভব করেন। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়লে দূরের হাসপাতাল থেকে সেবা নেওয়াও কঠিন হয়ে যায়।

এ কারণে উপকূলীয় হাসপাতালকে শুধু স্বাভাবিক সময়ের রোগীর চাপ বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করলে চলবে না। দুর্যোগের সময়ও যাতে জরুরি বিভাগ চালু রাখা যায়, সে প্রস্তুতি থাকতে হবে। নিরাপদ স্থানে হাসপাতাল নির্মাণ, বিকল্প বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুত এবং প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিশ্চিত করা জরুরি।

উপকূলের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই নতুন হাসপাতাল নির্মাণের দাবি ওঠে। কিন্তু নতুন ভবন নির্মাণই কি সব সমস্যার সমাধান? বাস্তবতা হচ্ছে, চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ওষুধ ছাড়া একটি আধুনিক ভবনও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা দিতে পারবে না।

কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ক্ষেত্রে প্রথমেই ৫০ শয্যার অনুমোদিত সক্ষমতা বাস্তবে কার্যকর করা প্রয়োজন। নতুন ভবনের নির্মাণকাজের বর্তমান অবস্থা, প্রকল্পের অগ্রগতি, অর্থায়ন এবং কাজ শেষ করার সময়সীমা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট বক্তব্য থাকা দরকার। দীর্ঘদিন ধরে কেন অবকাঠামোগত সংকটের সমাধান হয়নি, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে হাসপাতালের শূন্য পদ পূরণ, চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি, নার্স ও টেকনিশিয়ানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য অ্যাম্বুলেন্স থাকলেই হবে না; চালকসহ সেটিকে কার্যকর রাখতে হবে। তবে বিদ্যমান হাসপাতালের উন্নয়ন করলেই প্রত্যন্ত উপকূলের সব মানুষের চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত হবে না। কারণ, ভৌগোলিক দূরত্ব ও যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এখনো বড় বাধা। এ জন্য কয়রা সদরে আধুনিক হাসপাতাল বা পূর্ণাঙ্গ জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কয়রা উপজেলার দূরবর্তী ইউনিয়নগুলোতে এমবিবিএস চিকিৎসক দিয়ে জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে জনসংখ্যা, রোগীর চাপ, বিদ্যমান হাসপাতাল থেকে দূরত্ব, যাতায়াতে প্রয়োজনীয় সময় এবং স্থানীয় মানুষের চিকিৎসার চাহিদা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শুধু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বিবেচনায় হাসপাতালের স্থান নির্ধারণ না করে তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা করা জরুরি।

খুলনার কয়রার মতো শ্যামনগর, আশাশুনি ও দাকোপের মানুষেরও সহজলভ্য ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন। পাইকগাছা এবং আশপাশের উপকূলীয় এলাকার মানুষের চিকিৎসার চাহিদাও আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা দরকার। সব উপজেলায় একই ধরনের বড় হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়তো প্রয়োজনীয় বা বাস্তবসম্মত হবে না। কোথাও বিদ্যমান হাসপাতালকে আধুনিক করা দরকার, কোথাও শয্যা ও জনবল বাড়াতে হবে, আবার কোথাও প্রত্যন্ত মানুষের জন্য জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন অধিক কার্যকর হতে পারে। তাই প্রথমে একটি সমন্বিত উপকূলীয় স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন। কোন এলাকায় কত মানুষ চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, গুরুতর রোগীকে নিকটতম সক্ষম হাসপাতালে পৌঁছাতে কত সময় লাগে, কোথায় প্রসূতিসেবা ও জরুরি অস্ত্রোপচারের ঘাটতি রয়েছে, এসব তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।

বন বিভাগের কার্যালয়, স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল, কোস্ট গার্ড ও উদ্ধারকারী দলের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি। সুন্দরবনে দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর দ্রুত উদ্ধার এবং রোগীকে উপযুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার জন্য একটি সমন্বিত জরুরি সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকায় টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। তবে এটি সরাসরি চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার কিংবা জরুরি পরিবহনের বিকল্প নয়; বরং বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবাকে সহায়তা করার একটি উপায়।

উপকূলের মানুষের জন্য আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়। একজন বনজীবী, একজন কৃষক, একজন জেলে কিংবা একজন গর্ভবতী নারী; সবার জন্য প্রয়োজনের সময় চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ থাকা জরুরি। মানুষের জীবন রক্ষার সুযোগ যেন তার আর্থিক সামর্থ্য কিংবা বসবাসের এলাকার কারণে সীমিত না হয়।

কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৫০ শয্যার অনুমোদন বাস্তবে কার্যকর করা এখন জরুরি। পাশাপাশি কয়রা, শ্যামনগর, আশাশুনি ও দাকোপসহ সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিক হাসপাতাল, জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র এবং রোগী পরিবহনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল এবং বাস্তবায়নের জবাবদিহি।

সুন্দরবন দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের এক অমূল্য আধার। এই বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বনজীবীদের জীবিকা রক্ষার কথা বলব, অথচ তাঁদের বিপদের মুহূর্তে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করব না, এমন উন্নয়ন পরিকল্পনা পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।

২০০৭ সালে আমার দাদা বাঘের আক্রমণে গুরুতর আহত হওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ১২০ কি.মি দূরের জেলা সদরে হাসপাতালে নিতে হয়েছিল। তিনি বেঁচে ফিরেছিলেন, কিন্তু পরিবারের আরেকজন দাদাকে বাঘের আক্রমণে হারিয়েছি। ব্যক্তিগত এই অভিজ্ঞতা আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, সুন্দরবনের মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা কতটা জরুরি। আমি চাই না, ভবিষ্যতে কোনো বনজীবীর পরিবারকে আমার পরিবারের মতো এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হোক। বিপদের মুহূর্তে একজন মানুষ যেন শুধু হাসপাতাল দূরে বলে কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই বলে জীবন হারানোর ঝুঁকিতে না পড়েন।

উপকূলের মানুষ কত দূরে থাকেন, তা নয়; বিপদের মুহূর্তে তাঁরা কত দ্রুত চিকিৎসা পান, সেটিই হওয়া উচিত স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান বিবেচনা। সুন্দরবন উপকূলে আধুনিক ও দুর্যোগসহনশীল হাসপাতাল গড়ে তোলার দাবি তাই শুধু স্থানীয় মানুষের দাবি নয়, এটি জীবন রক্ষার দাবি।

লেখক: সংবাদকর্মী ও প্রধান সমন্বয়ক, সুন্দরবন ইকো-রিজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভ

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

সুন্দরবন উপকূলে স্বাস্থ্যসেবার সংকট: সমাধান কোথায়?

সর্বশেষ আপডেট ০৭:১৯:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

আমার দাদা সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে ২০০৭ সালে বাঘের আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। বাঘের সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই করে তিনি বেঁচে ফিরেছিলেন। অন্য মৌয়ালি ও জেলেদের সহযোগিতায় তাঁকে সুন্দরবন থেকে লোকালয়ে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু ততক্ষণে তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। প্রয়োজন ছিল দ্রুত উন্নত চিকিৎসার। অথচ তখন খুলনার কয়রায় গুরুতর আহত রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় মানের হাসপাতাল ও সুযোগ-সুবিধা ছিল না। ফলে তাঁকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরের জেলা সদরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি বেঁচে ফিরেছিলেন।

কিন্তু আমার পরিবারের আরেকজন দাদা সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু আজও মনে করিয়ে দেয়, সুন্দরবনের সঙ্গে জীবিকা জড়িয়ে থাকা মানুষের জীবন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে মনে প্রশ্ন জাগে, দুর্ঘটনার পরপরই যদি কাছাকাছি উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকত, তাহলে কি আরও অনেক মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হতো?

আমার পরিবারের এই অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া জেলে, মধু সংগ্রহকারী মৌয়ালি ও অন্যান্য বনজীবী প্রতিনিয়ত নানা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। তাঁদের কেউ বাঘের আক্রমণের শিকার হন, কেউ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন।

সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে মানুষের মৃত্যুর পরিসংখ্যানই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বন বিভাগের তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ২৫ বছরে সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে ৪২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে আহত হয়েছেন অন্তত ৯৫ জন। তবে বন বিভাগের নথির বাইরে আরও কিছু ঘটনা থেকে থাকতে পারে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাঘের আক্রমণে মানুষের মৃত্যুর পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, জীবিকার জন্য সংগ্রাম করা একজন মানুষ এবং তাঁর ওপর নির্ভরশীল স্বজনদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। একজন মৌয়াল বা জেলে বনে গিয়ে বাঘের আক্রমণের শিকার হলে তাঁর পরিবার শুধু উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারানোর আশঙ্কায় পড়ে না, অনেক ক্ষেত্রে তাদের সামনে নেমে আসে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটও। কিন্তু বিপদের মুহূর্তে দ্রুত ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ কতটুকু রয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সামনে আসে। বিশেষ করে খুলনার কয়রা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার মানুষের জন্য আধুনিক চিকিৎসাসেবার সুযোগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে দাকোপ ও পাইকগাছাসহ সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার মানুষের চিকিৎসার প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দিকে তাকালে সংকটের একটি চিত্র পাওয়া যায়। হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও বাস্তবে ১৯ শয্যার অবকাঠামোয় চিকিৎসাসেবা চলছে। ছয় বছর আগে ৩১ শয্যার পুরোনো ভবনটি ভেঙে ফেলার পর নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও অবকাঠামোগত সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে রোগীদের সেবা দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে জনবল ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিয়ে নানা অভিযোগ।

কয়রা উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মানুষ এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য হাসপাতালে পৌঁছানোই অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। দক্ষিণ বেদকাশীসহ দূরবর্তী এলাকার মানুষকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। গুরুতর রোগীকে খুলনা শহরে নিতে হলে দূরত্ব, যাতায়াতের সময় ও পরিবহন ব্যয়, সব মিলিয়ে পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

কয়রা থেকে খুলনা শহরের দূরত্ব প্রায় ১২০ কিলোমিটার। এই দূরত্ব শুধু মানচিত্রের হিসাব নয়; জরুরি রোগীর ক্ষেত্রে এটি সময়ের হিসাবও। একজন অসচ্ছল পরিবারের সদস্যের পক্ষে দ্রুত গাড়ি ভাড়া করে রোগীকে দূরের হাসপাতালে নেওয়া সব সময় সম্ভব হয় না। আবার সড়ক বা নৌপথে যোগাযোগ ব্যাহত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। প্রশ্ন হচ্ছে, উপকূলের মানুষকে কি প্রতিটি গুরুতর অসুস্থতার সময় জেলা শহরের ওপর নির্ভর করতে হবে? উপজেলা পর্যায়ে এমন চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলা কি সম্ভব নয়, যেখানে অন্তত জরুরি চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রসূতিসেবা ও প্রাথমিক অস্ত্রোপচারের সুযোগ থাকবে?

সুন্দরবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের জীবন-জীবিকা। জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের অনেকে জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করেন। বনের ভেতরে তাঁদের বিপদের ঝুঁকি যেমন রয়েছে, তেমনি দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগও সীমিত। বাঘের আক্রমণে গুরুতর আহত ব্যক্তির ক্ষেত্রে দ্রুত রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ, ক্ষত পরিচর্যা, প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার এবং রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু দুর্গম বনাঞ্চল থেকে রোগী উদ্ধার, নৌপথে পরিবহন এবং পরে সড়কপথে হাসপাতালে নেওয়ার প্রতিটি ধাপেই সময় লাগতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে স্থানীয় পর্যায়ে জরুরি চিকিৎসার সক্ষমতা থাকলে রোগীকে প্রাথমিকভাবে স্থিতিশীল করা সম্ভব হতে পারে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নত হাসপাতালে পাঠানো যাবে। তবে সব ধরনের চিকিৎসা স্থানীয় পর্যায়ে করা সম্ভব নয়। সে জন্য কোন হাসপাতালে কী ধরনের চিকিৎসা থাকবে এবং গুরুতর রোগীকে কোথায় পাঠানো হবে, তা আগেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই ব্যবস্থা কাজে আসবে সাপের কামড়, নৌদুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রসূতি জটিলতার ক্ষেত্রেও। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার গর্ভবতী নারীকে জরুরি সময়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জীবনকে কঠিন করে তুলছে। সুপেয় পানির সংকট এবং দুর্যোগের পর নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও প্রস্তুত ও সহনশীল করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় ও খরাপ্রবণ অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। ফলে উপকূলের স্বাস্থ্য অবকাঠামো পরিকল্পনার সময় স্থানীয় পরিবেশগত বাস্তবতা ও দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
ঘূর্ণিঝড়ের সময় কিংবা এর পরপরই হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়ে যেতে পারে। আহত মানুষের পাশাপাশি ডায়রিয়া, জ্বর, পানিবাহিত রোগ ও অন্যান্য সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরাও চিকিৎসার প্রয়োজন অনুভব করেন। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়লে দূরের হাসপাতাল থেকে সেবা নেওয়াও কঠিন হয়ে যায়।

এ কারণে উপকূলীয় হাসপাতালকে শুধু স্বাভাবিক সময়ের রোগীর চাপ বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করলে চলবে না। দুর্যোগের সময়ও যাতে জরুরি বিভাগ চালু রাখা যায়, সে প্রস্তুতি থাকতে হবে। নিরাপদ স্থানে হাসপাতাল নির্মাণ, বিকল্প বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুত এবং প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিশ্চিত করা জরুরি।

উপকূলের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই নতুন হাসপাতাল নির্মাণের দাবি ওঠে। কিন্তু নতুন ভবন নির্মাণই কি সব সমস্যার সমাধান? বাস্তবতা হচ্ছে, চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ওষুধ ছাড়া একটি আধুনিক ভবনও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা দিতে পারবে না।

কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ক্ষেত্রে প্রথমেই ৫০ শয্যার অনুমোদিত সক্ষমতা বাস্তবে কার্যকর করা প্রয়োজন। নতুন ভবনের নির্মাণকাজের বর্তমান অবস্থা, প্রকল্পের অগ্রগতি, অর্থায়ন এবং কাজ শেষ করার সময়সীমা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট বক্তব্য থাকা দরকার। দীর্ঘদিন ধরে কেন অবকাঠামোগত সংকটের সমাধান হয়নি, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে হাসপাতালের শূন্য পদ পূরণ, চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতি, নার্স ও টেকনিশিয়ানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য অ্যাম্বুলেন্স থাকলেই হবে না; চালকসহ সেটিকে কার্যকর রাখতে হবে। তবে বিদ্যমান হাসপাতালের উন্নয়ন করলেই প্রত্যন্ত উপকূলের সব মানুষের চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত হবে না। কারণ, ভৌগোলিক দূরত্ব ও যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এখনো বড় বাধা। এ জন্য কয়রা সদরে আধুনিক হাসপাতাল বা পূর্ণাঙ্গ জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কয়রা উপজেলার দূরবর্তী ইউনিয়নগুলোতে এমবিবিএস চিকিৎসক দিয়ে জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে জনসংখ্যা, রোগীর চাপ, বিদ্যমান হাসপাতাল থেকে দূরত্ব, যাতায়াতে প্রয়োজনীয় সময় এবং স্থানীয় মানুষের চিকিৎসার চাহিদা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শুধু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বিবেচনায় হাসপাতালের স্থান নির্ধারণ না করে তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা করা জরুরি।

খুলনার কয়রার মতো শ্যামনগর, আশাশুনি ও দাকোপের মানুষেরও সহজলভ্য ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন। পাইকগাছা এবং আশপাশের উপকূলীয় এলাকার মানুষের চিকিৎসার চাহিদাও আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা দরকার। সব উপজেলায় একই ধরনের বড় হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়তো প্রয়োজনীয় বা বাস্তবসম্মত হবে না। কোথাও বিদ্যমান হাসপাতালকে আধুনিক করা দরকার, কোথাও শয্যা ও জনবল বাড়াতে হবে, আবার কোথাও প্রত্যন্ত মানুষের জন্য জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন অধিক কার্যকর হতে পারে। তাই প্রথমে একটি সমন্বিত উপকূলীয় স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন। কোন এলাকায় কত মানুষ চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, গুরুতর রোগীকে নিকটতম সক্ষম হাসপাতালে পৌঁছাতে কত সময় লাগে, কোথায় প্রসূতিসেবা ও জরুরি অস্ত্রোপচারের ঘাটতি রয়েছে, এসব তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।

বন বিভাগের কার্যালয়, স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল, কোস্ট গার্ড ও উদ্ধারকারী দলের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি। সুন্দরবনে দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর দ্রুত উদ্ধার এবং রোগীকে উপযুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার জন্য একটি সমন্বিত জরুরি সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকায় টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। তবে এটি সরাসরি চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার কিংবা জরুরি পরিবহনের বিকল্প নয়; বরং বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবাকে সহায়তা করার একটি উপায়।

উপকূলের মানুষের জন্য আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়। একজন বনজীবী, একজন কৃষক, একজন জেলে কিংবা একজন গর্ভবতী নারী; সবার জন্য প্রয়োজনের সময় চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ থাকা জরুরি। মানুষের জীবন রক্ষার সুযোগ যেন তার আর্থিক সামর্থ্য কিংবা বসবাসের এলাকার কারণে সীমিত না হয়।

কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৫০ শয্যার অনুমোদন বাস্তবে কার্যকর করা এখন জরুরি। পাশাপাশি কয়রা, শ্যামনগর, আশাশুনি ও দাকোপসহ সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিক হাসপাতাল, জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র এবং রোগী পরিবহনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল এবং বাস্তবায়নের জবাবদিহি।

সুন্দরবন দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের এক অমূল্য আধার। এই বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বনজীবীদের জীবিকা রক্ষার কথা বলব, অথচ তাঁদের বিপদের মুহূর্তে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করব না, এমন উন্নয়ন পরিকল্পনা পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।

২০০৭ সালে আমার দাদা বাঘের আক্রমণে গুরুতর আহত হওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ১২০ কি.মি দূরের জেলা সদরে হাসপাতালে নিতে হয়েছিল। তিনি বেঁচে ফিরেছিলেন, কিন্তু পরিবারের আরেকজন দাদাকে বাঘের আক্রমণে হারিয়েছি। ব্যক্তিগত এই অভিজ্ঞতা আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, সুন্দরবনের মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা কতটা জরুরি। আমি চাই না, ভবিষ্যতে কোনো বনজীবীর পরিবারকে আমার পরিবারের মতো এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হোক। বিপদের মুহূর্তে একজন মানুষ যেন শুধু হাসপাতাল দূরে বলে কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই বলে জীবন হারানোর ঝুঁকিতে না পড়েন।

উপকূলের মানুষ কত দূরে থাকেন, তা নয়; বিপদের মুহূর্তে তাঁরা কত দ্রুত চিকিৎসা পান, সেটিই হওয়া উচিত স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান বিবেচনা। সুন্দরবন উপকূলে আধুনিক ও দুর্যোগসহনশীল হাসপাতাল গড়ে তোলার দাবি তাই শুধু স্থানীয় মানুষের দাবি নয়, এটি জীবন রক্ষার দাবি।

লেখক: সংবাদকর্মী ও প্রধান সমন্বয়ক, সুন্দরবন ইকো-রিজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভ