ঢাকা ০৭:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সরব এমপি বকুল

রায়পুরায় ক্লাস ছাড়াই বেতন, অভিযোগ ৭ এমপিও শিক্ষকের বিরুদ্ধে

বশির আহম্মদ মোল্লা, নরসিংদী
  • সর্বশেষ আপডেট ০৬:৩৬:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
  • / 32

রায়পুরায় সাত শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় একই নাম ও একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শনাক্তকরণ নম্বর (ইআইআইএন) ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হচ্ছে দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এ ঘটনায় প্রশাসনিক জটিলতার পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। একই পরিচয়ে দুটি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হওয়ায় সরকারি কার্যক্রম, শিক্ষা বোর্ডের নথি, শিক্ষার্থীদের তথ্য এবং এমপিও ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

বিষয়টি আলোচনায় আসার পর নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সহ-সম্পাদক প্রকৌশলী আশরাফ উদ্দিন বকুল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি মূল প্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।

১৯৮১ সালের প্রতিষ্ঠিত স্কুল, পরে শুরু হয় দ্বন্দ্ব

জানা গেছে, উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নের গৌরিপুর গ্রামে ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কোহিনুর জুট মিলস হাই স্কুল। ১৯৯৫ সালে বিদ্যালয়টি পাঁচজন শিক্ষকসহ এমপিওভুক্ত হয়।

পরবর্তীতে বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে ২০০৫ সালে দুই শিক্ষক মো. আতিকুর রহমান ও আহসান হাবিবকে বহিষ্কার করা হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে তারা পুনর্বহাল হন। এরপর ২০০৬ সালে মহেশপুর ইউনিয়নের ঘাগটিয়া এলাকায় একই নাম ও একই ইআইআইএন নম্বর ব্যবহার করে ‘কোহিনুর জুট মিলস হাই স্কুল ঘাগটিয়া’ নামে আরেকটি বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করেন। এরপর থেকেই একই পরিচয়ে দুটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলতে থাকে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এ অনিয়মের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিকবার মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি।

কাগজে শতাধিক শিক্ষার্থী, শ্রেণিকক্ষে নেই ছাত্রছাত্রী

সরেজমিনে দেখা যায়, গৌরিপুরের মূল বিদ্যালয়ে চারতলা ভবনসহ কয়েকশ শিক্ষার্থী নিয়মিত পাঠ গ্রহণ করছে।

অন্যদিকে ঘাগটিয়ার বিদ্যালয়টি তিনটি টিনশেড কক্ষে পরিচালিত হলেও সেখানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। গত ১৪ জুলাই বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে একটি শ্রেণিকক্ষে মাত্র দুই শিক্ষার্থীকে পাওয়া যায়। নিজেদের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী পরিচয় দিয়ে তারা জানায়, ওই শ্রেণিতে ১০৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে শ্রেণিকক্ষ ছোট হওয়ায় সবাই একসঙ্গে ক্লাস করতে পারে না বলে দাবি করে তারা।

৭ এমপিও শিক্ষকের বিরুদ্ধে ক্লাস না নিয়েই বেতন নেওয়ার অভিযোগ

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুটি প্রতিষ্ঠানে মোট আটজন এমপিওভুক্ত শিক্ষকের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে সাতজনই ঘাগটিয়া বিদ্যালয়ে কর্মরত। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত পাঠদান না করেই সরকারি বেতন-ভাতা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে মূল প্রতিষ্ঠান গৌরিপুরের কোহিনুর জুট মিলস হাই স্কুলে মাত্র একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন। তিনি প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। ফলে বিদ্যালয়টিতে খণ্ডকালীন ও নন-এমপিও শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালাতে হচ্ছে। এসব শিক্ষকের সম্মানী স্থানীয় দানশীল ব্যক্তিদের সহায়তায় পরিশোধ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা সরকারি উপবৃত্তির সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

ঘাগটিয়া বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আতিকুর রহমান বলেন, ২০০৬ সালে তৎকালীন প্রধান শিক্ষকের উদ্যোগে বিদ্যালয়টি ঘাগটিয়ায় স্থানান্তর করা হয়। আদালতের রায় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতেই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

সংসদ সদস্য প্রকৌশলী আশরাফ উদ্দিন বকুল বলেন, “এটি একটি গুরুতর অনিয়ম। একই নামে পরিচালিত ঘাগটিয়ার প্রতিষ্ঠানটির কোনো বৈধতা নেই। তাদের অবিলম্বে মূল প্রতিষ্ঠানে ফিরে যেতে হবে। আদালতের আদেশ থাকলেও সেখানে কার্যকর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না।”

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সামালগীর আলম বলেন, গৌরিপুরের কোহিনুর জুট মিলস হাই স্কুলই মূল প্রতিষ্ঠান। তবে আদালতের নির্দেশনার ভিত্তিতে ঘাগটিয়ায়ও একই নামে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা জানান, বিষয়টি তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

সরব এমপি বকুল

রায়পুরায় ক্লাস ছাড়াই বেতন, অভিযোগ ৭ এমপিও শিক্ষকের বিরুদ্ধে

সর্বশেষ আপডেট ০৬:৩৬:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় একই নাম ও একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শনাক্তকরণ নম্বর (ইআইআইএন) ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হচ্ছে দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এ ঘটনায় প্রশাসনিক জটিলতার পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। একই পরিচয়ে দুটি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হওয়ায় সরকারি কার্যক্রম, শিক্ষা বোর্ডের নথি, শিক্ষার্থীদের তথ্য এবং এমপিও ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

বিষয়টি আলোচনায় আসার পর নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সহ-সম্পাদক প্রকৌশলী আশরাফ উদ্দিন বকুল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি মূল প্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।

১৯৮১ সালের প্রতিষ্ঠিত স্কুল, পরে শুরু হয় দ্বন্দ্ব

জানা গেছে, উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নের গৌরিপুর গ্রামে ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কোহিনুর জুট মিলস হাই স্কুল। ১৯৯৫ সালে বিদ্যালয়টি পাঁচজন শিক্ষকসহ এমপিওভুক্ত হয়।

পরবর্তীতে বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে ২০০৫ সালে দুই শিক্ষক মো. আতিকুর রহমান ও আহসান হাবিবকে বহিষ্কার করা হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে তারা পুনর্বহাল হন। এরপর ২০০৬ সালে মহেশপুর ইউনিয়নের ঘাগটিয়া এলাকায় একই নাম ও একই ইআইআইএন নম্বর ব্যবহার করে ‘কোহিনুর জুট মিলস হাই স্কুল ঘাগটিয়া’ নামে আরেকটি বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করেন। এরপর থেকেই একই পরিচয়ে দুটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলতে থাকে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এ অনিয়মের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিকবার মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি।

কাগজে শতাধিক শিক্ষার্থী, শ্রেণিকক্ষে নেই ছাত্রছাত্রী

সরেজমিনে দেখা যায়, গৌরিপুরের মূল বিদ্যালয়ে চারতলা ভবনসহ কয়েকশ শিক্ষার্থী নিয়মিত পাঠ গ্রহণ করছে।

অন্যদিকে ঘাগটিয়ার বিদ্যালয়টি তিনটি টিনশেড কক্ষে পরিচালিত হলেও সেখানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। গত ১৪ জুলাই বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে একটি শ্রেণিকক্ষে মাত্র দুই শিক্ষার্থীকে পাওয়া যায়। নিজেদের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী পরিচয় দিয়ে তারা জানায়, ওই শ্রেণিতে ১০৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে শ্রেণিকক্ষ ছোট হওয়ায় সবাই একসঙ্গে ক্লাস করতে পারে না বলে দাবি করে তারা।

৭ এমপিও শিক্ষকের বিরুদ্ধে ক্লাস না নিয়েই বেতন নেওয়ার অভিযোগ

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুটি প্রতিষ্ঠানে মোট আটজন এমপিওভুক্ত শিক্ষকের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে সাতজনই ঘাগটিয়া বিদ্যালয়ে কর্মরত। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত পাঠদান না করেই সরকারি বেতন-ভাতা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে মূল প্রতিষ্ঠান গৌরিপুরের কোহিনুর জুট মিলস হাই স্কুলে মাত্র একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন। তিনি প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। ফলে বিদ্যালয়টিতে খণ্ডকালীন ও নন-এমপিও শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালাতে হচ্ছে। এসব শিক্ষকের সম্মানী স্থানীয় দানশীল ব্যক্তিদের সহায়তায় পরিশোধ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা সরকারি উপবৃত্তির সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

ঘাগটিয়া বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আতিকুর রহমান বলেন, ২০০৬ সালে তৎকালীন প্রধান শিক্ষকের উদ্যোগে বিদ্যালয়টি ঘাগটিয়ায় স্থানান্তর করা হয়। আদালতের রায় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতেই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

সংসদ সদস্য প্রকৌশলী আশরাফ উদ্দিন বকুল বলেন, “এটি একটি গুরুতর অনিয়ম। একই নামে পরিচালিত ঘাগটিয়ার প্রতিষ্ঠানটির কোনো বৈধতা নেই। তাদের অবিলম্বে মূল প্রতিষ্ঠানে ফিরে যেতে হবে। আদালতের আদেশ থাকলেও সেখানে কার্যকর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না।”

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সামালগীর আলম বলেন, গৌরিপুরের কোহিনুর জুট মিলস হাই স্কুলই মূল প্রতিষ্ঠান। তবে আদালতের নির্দেশনার ভিত্তিতে ঘাগটিয়ায়ও একই নামে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা জানান, বিষয়টি তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবে।