ঢাকা ১১:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সরকারের অ্যাসিড টেস্ট

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ১০:৪৭:৪০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
  • / 13

মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সরকারের অ্যাসিড টেস্ট

আধুনিক সিঙ্গাপুরের রূপকার লি কুয়ান ইউ (Lee Kuan Yew) বলেছিলেন, “মাদক হলো সব অপরাধের মা (Mother of all crime)।” এই দর্শন থেকে ১৯৭৩ সালে সিঙ্গাপুরে ‘মিউজিস অব ড্রাগস অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করে নির্দিষ্ট পরিমাণ মাদক চোরাচালানের জন্য মৃত্যুদণ্ড এবং সেন্ট্রাল নারকোটিকস ব্যুরোকে (CNB) সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়া হয়। লি কুয়ানের এই ‘শূন্য সহনশীলতা’ বা জিরো-টলারেন্স নীতির কারণেই সিঙ্গাপুর আজ বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও মাদকমুক্ত রাষ্ট্র। শুধু সিঙ্গাপুর নয়; মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া কিংবা সৌদি আরব ও কুয়েতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও মাদক পাচার বা বিক্রির অপরাধে মৃত্যুদণ্ডসহ প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত ও কঠোর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এমনকি ১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মাদককে ‘এক নম্বর গণশত্রু’ ঘোষণা করে বিশ্বব্যাপী এর নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দেওয়ার যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে তাঁর বিতর্কিত ও কঠোর মাদকবিরোধী অভিযানের কারণে আন্তর্জাতিক আদালতে (ICC) বিচারের মুখোমুখি হলেও, তাঁর দেশের মানুষ এখনও ফিলিপাইনকে মাদকের অবাধ বিস্তার থেকে মুক্ত করার জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

বিশ্বের যেসব দেশ মাদকের করাল গ্রাস থেকে বাঁচতে পেরেছে, তারা সবাই আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও যথাযথ প্রয়োগের অভাবে দেশ যেন মাদক কারবারিদের এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত আজ মাদকের মরণ ছোবলে আক্রান্ত। বাংলাদেশে সংঘটিত মোট অপরাধের প্রায় ৯০ শতাংশেরই মূল উৎস এই মাদক। কিশোর গ্যাং কালচার, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসার পেছনে রয়েছে মাদক সিন্ডিকেটের প্রত্যক্ষ প্রভাব। এই সিন্ডিকেটের ওপর ভর করেই দেশে চোরাচালান ও মানব পাচারের মতো ভয়াবহ অপরাধ ডালপালা মেলছে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছেন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দেশব্যাপী চিরুনি অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন। সম্প্রতি সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দেশে ৩০,৭৪৪টি মাদকবিরোধী অভিযানে ৯,৬৮৫ জন চোরাকারবারিকে গ্রেপ্তার এবং ৯,২৫১টি মামলা করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, ২৯২ জন গডফাদারসহ ৪,০০০ শীর্ষ মাদক কারবারির একটি চূড়ান্ত তালিকা ধরে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে (যদিও ২০২৩ সালে হাইকোর্টের নির্দেশনার পর ৩,০০০ কারবারির একটি তালিকা আলোর মুখ দেখেনি)।

তবে সরকারি এসব কঠোর পদক্ষেপের দাবির মধ্যেই গত ২২ জুন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ‘নতুন মাদকের নীরব বিস্তার’-এর এক ভয়াবহ চিত্র। প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি দেশে সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদক যেমন— এমডিএমবি, আইস, এলএসডি, ফেন্টানাইল, ব্ল্যাক কোকেন, ম্যাজিক মাশরুম, কুশ ও ট্যাপেন্টাডলের মতো মারাত্মক নতুন প্রজন্মের মাদক ছড়িয়ে পড়েছে, যা তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার রোধ করতে না পারার প্রধান কারণ হলো ত্রুটিপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। মাদক চোরাচালানের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। পুলিশী তদন্তের দুর্বলতা এবং সাক্ষীর অভাবে আসামিরা সহজেই জামিনে পার পেয়ে যায়। এছাড়া অতীতে চিহ্নিত মাদক কারবারিদের জাতীয় সংসদে বসার মতো ঘটনাও ঘটেছে। রাজনৈতিক দল পরিবর্তনের সাথে সাথে গডফাদাররা খোলস বদলে নতুন শাসক দলের ছত্রছায়ায় চলে যায়।

এই মরণব্যাধি থেকে বাঁচতে হলে বাংলাদেশকে এখনই কিছু বাস্তবমুখী ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে:

শুধু গাড়িচালকদের জন্য নয়, সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা এবং প্রতি বছর সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জন্য নিয়মিত ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে।

সব রাজনৈতিক দলকে এক টেবিলে এসে অঙ্গীকার করতে হবে যে, কোনো মাদক কারবারি বা গডফাদারকে কোনো দলে আশ্রয় বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হবে না।

বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে মাদক মামলার দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে হবে এবং সাক্ষীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

পরিবার ও সমাজ পর্যায় থেকে মাদকের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

মাদকের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ বর্তমান সরকারের জন্য একটি ‘অ্যাসিড টেস্ট’ বা অগ্নিপরীক্ষা। জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলকে কাঁধ মেলাতে হবে। মনে রাখতে হবে, মাদকের সর্বনাশা ছোবল থেকে প্রজন্মকে মুক্ত করতে না পারলে দেশের কোনো টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নই সম্ভব হবে না। এই যুদ্ধে বাংলাদেশের সামনে জয়ের কোনো বিকল্প নেই।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সরকারের অ্যাসিড টেস্ট

সর্বশেষ আপডেট ১০:৪৭:৪০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

আধুনিক সিঙ্গাপুরের রূপকার লি কুয়ান ইউ (Lee Kuan Yew) বলেছিলেন, “মাদক হলো সব অপরাধের মা (Mother of all crime)।” এই দর্শন থেকে ১৯৭৩ সালে সিঙ্গাপুরে ‘মিউজিস অব ড্রাগস অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করে নির্দিষ্ট পরিমাণ মাদক চোরাচালানের জন্য মৃত্যুদণ্ড এবং সেন্ট্রাল নারকোটিকস ব্যুরোকে (CNB) সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়া হয়। লি কুয়ানের এই ‘শূন্য সহনশীলতা’ বা জিরো-টলারেন্স নীতির কারণেই সিঙ্গাপুর আজ বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও মাদকমুক্ত রাষ্ট্র। শুধু সিঙ্গাপুর নয়; মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া কিংবা সৌদি আরব ও কুয়েতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও মাদক পাচার বা বিক্রির অপরাধে মৃত্যুদণ্ডসহ প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত ও কঠোর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এমনকি ১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মাদককে ‘এক নম্বর গণশত্রু’ ঘোষণা করে বিশ্বব্যাপী এর নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দেওয়ার যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে তাঁর বিতর্কিত ও কঠোর মাদকবিরোধী অভিযানের কারণে আন্তর্জাতিক আদালতে (ICC) বিচারের মুখোমুখি হলেও, তাঁর দেশের মানুষ এখনও ফিলিপাইনকে মাদকের অবাধ বিস্তার থেকে মুক্ত করার জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

বিশ্বের যেসব দেশ মাদকের করাল গ্রাস থেকে বাঁচতে পেরেছে, তারা সবাই আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও যথাযথ প্রয়োগের অভাবে দেশ যেন মাদক কারবারিদের এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত আজ মাদকের মরণ ছোবলে আক্রান্ত। বাংলাদেশে সংঘটিত মোট অপরাধের প্রায় ৯০ শতাংশেরই মূল উৎস এই মাদক। কিশোর গ্যাং কালচার, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি এবং অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসার পেছনে রয়েছে মাদক সিন্ডিকেটের প্রত্যক্ষ প্রভাব। এই সিন্ডিকেটের ওপর ভর করেই দেশে চোরাচালান ও মানব পাচারের মতো ভয়াবহ অপরাধ ডালপালা মেলছে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছেন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দেশব্যাপী চিরুনি অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন। সম্প্রতি সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দেশে ৩০,৭৪৪টি মাদকবিরোধী অভিযানে ৯,৬৮৫ জন চোরাকারবারিকে গ্রেপ্তার এবং ৯,২৫১টি মামলা করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, ২৯২ জন গডফাদারসহ ৪,০০০ শীর্ষ মাদক কারবারির একটি চূড়ান্ত তালিকা ধরে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে (যদিও ২০২৩ সালে হাইকোর্টের নির্দেশনার পর ৩,০০০ কারবারির একটি তালিকা আলোর মুখ দেখেনি)।

তবে সরকারি এসব কঠোর পদক্ষেপের দাবির মধ্যেই গত ২২ জুন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ‘নতুন মাদকের নীরব বিস্তার’-এর এক ভয়াবহ চিত্র। প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি দেশে সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদক যেমন— এমডিএমবি, আইস, এলএসডি, ফেন্টানাইল, ব্ল্যাক কোকেন, ম্যাজিক মাশরুম, কুশ ও ট্যাপেন্টাডলের মতো মারাত্মক নতুন প্রজন্মের মাদক ছড়িয়ে পড়েছে, যা তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার রোধ করতে না পারার প্রধান কারণ হলো ত্রুটিপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। মাদক চোরাচালানের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে। পুলিশী তদন্তের দুর্বলতা এবং সাক্ষীর অভাবে আসামিরা সহজেই জামিনে পার পেয়ে যায়। এছাড়া অতীতে চিহ্নিত মাদক কারবারিদের জাতীয় সংসদে বসার মতো ঘটনাও ঘটেছে। রাজনৈতিক দল পরিবর্তনের সাথে সাথে গডফাদাররা খোলস বদলে নতুন শাসক দলের ছত্রছায়ায় চলে যায়।

এই মরণব্যাধি থেকে বাঁচতে হলে বাংলাদেশকে এখনই কিছু বাস্তবমুখী ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে:

শুধু গাড়িচালকদের জন্য নয়, সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা এবং প্রতি বছর সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জন্য নিয়মিত ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে হবে।

সব রাজনৈতিক দলকে এক টেবিলে এসে অঙ্গীকার করতে হবে যে, কোনো মাদক কারবারি বা গডফাদারকে কোনো দলে আশ্রয় বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হবে না।

বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে মাদক মামলার দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে হবে এবং সাক্ষীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

পরিবার ও সমাজ পর্যায় থেকে মাদকের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

মাদকের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ বর্তমান সরকারের জন্য একটি ‘অ্যাসিড টেস্ট’ বা অগ্নিপরীক্ষা। জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলকে কাঁধ মেলাতে হবে। মনে রাখতে হবে, মাদকের সর্বনাশা ছোবল থেকে প্রজন্মকে মুক্ত করতে না পারলে দেশের কোনো টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নই সম্ভব হবে না। এই যুদ্ধে বাংলাদেশের সামনে জয়ের কোনো বিকল্প নেই।