ঢাকা ০২:০৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রাণ হাতে পার হচ্ছে হেমায়েতপুর ফুট ওভার ব্রিজ!

রেদোয়ান হাসান, সাভার
  • সর্বশেষ আপডেট ০৬:৪৫:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬
  • / 23

‘হেমায়েতপুরের এই ফুট ওভার ব্রিজে উঠলে মনে হয় কোনো ভিডিও গেমসের ‘সারভাইভাল’ রাউন্ডে নেমেছি। সিঁড়ির একেকটা ধাপ ভাঙা, পা ফসকালেই নিচে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের দ্রুতগতির গাড়ি। প্রতিদিন আমরা প্রাণ হাতে নিয়ে এই মরণখেলা খেলছি, অথচ প্রশাসনের কোনো হেলদোল নেই।’

তীব্র ক্ষোভ আর আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন সাভারের হেমায়েতপুর এলাকার বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকুরিজীবী কামরুল হাসান। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ব্যস্ততম হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডের ফুট ওভার ব্রিজটির বর্তমান জরাজীর্ণ দশা নিয়ে প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের মনে জমছে ক্ষোভের পাহাড়। কামরুল হাসানের মতো হাজারো মানুষের প্রশ্ন—প্রশাসন কি তবে বড় কোনো দূর্ঘটনার অপেক্ষায় দিন গুনছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই পয়েন্টে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পারাপার হন। সড়ক পারাপারের একমাত্র নিরাপদ মাধ্যম হওয়ার কথা থাকলেও এই ফুট ওভার ব্রিজটি এখন নিজেই এক মরণফাঁদ। ব্রিজের গোড়া থেকে শুরু করে ওপরের প্ল্যাটফর্ম—সর্বত্রই ধ্বংসস্তূপের ছাপ। সিঁড়ির লোহার প্লেটগুলো ক্ষয়ে গেছে, অনেক জায়গায় জং ধরে মরণফাঁদ তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, ব্রিজের মাঝপথে হাঁটার সময় পুরো কাঠামোটি তীব্রভাবে কাঁপতে থাকে, যা যেকোনো সুস্থ মানুষকেও আতঙ্কে ফেলে দেয়। নিচে তাকালে দেখা যায়, ব্রিজের মূল কাঠামোর অনেক অংশ ইতিমধ্যে খসে পড়েছে।

হেমায়েতপুরের স্থানীয় একটি পোশাক কারখানার সুপারভাইজার মোখলেসুর রহমান নিয়মিত এইভ ফূট ওভার ব্রিজটি ব্যবহার করেন। তিনি জানান, ‘কিছুদিন আগে ব্রিজের তলার একটা বড় লোহার শিট ভেঙে ঝুলে ছিল। পরে দায়সারাভাবে একটা ঝালাই দিয়ে জোড়াতালি দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার বা ছুটির দিনে যখন ব্রিজে মানুষের চাপ বাড়ে, তখন পুরো ব্রিজ যেভাবে দোলে, মনে হয় এই বুঝি ধসে পড়ল।’

রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে আসা পথচারী সুরাইয়া আক্তার ব্রিজে উঠে রীতিমতো ভয়ে জমে যান। তিনি বলেন, ‘ফুট ওভার ব্রিজ দিয়ে ওঠার সময় মনে হচ্ছিল ভূমিকম্প হচ্ছে। চারদিকের লোহার অ্যাঙ্গেলগুলো নড়বড়ে। গর্ভবতী নারী, শিশু কিংবা বৃদ্ধদের এই ব্রিজ দিয়ে পার করা এক প্রকার অসম্ভব।’

উদ্বেগ প্রকাশ করে স্থানীয় স্কুল শিক্ষক মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই নরককুণ্ড পার হয়ে যাতায়াত করছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো দুর্ঘটনার ছবি ভাইরাল হওয়ার পর আমাদের টনক নড়ে, তখন সবাই হাহাকার করি। কিন্তু সময় থাকতে এই মরণফাঁদ সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যে কারো স্বজন হারাতে পারে, এই দায় কে নেবে।’

এলাকার একটি ক্লিনিকের চিকিৎসক ডা. ফাহমিদা সুলতানা জানান, ‘ব্রিজের সিঁড়িগুলোর উচ্চতা এবং ভাঙাচোরা অবস্থার কারণে অসুস্থ রোগী এবং বয়োবৃদ্ধদের যাতায়াত করতে গিয়ে চরম বেগ পেতে হয়। দ্রুত বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই এটি পুনর্নির্মাণ করা জরুরি।’

স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘হেমায়েতপুরের এই ওভার ব্রিজটি এখন জনদুর্ভোগ আর আতঙ্কের প্রতীক। এটি অতি দ্রুত সংস্কার করা না হলে যেকোনো দিন সাভারবাসী এক বড় ট্র্যাজেডির সাক্ষী হবে।’

এ বিষয়ে জানতে সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী রিতেশ বড়ুয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং দায়সারা বক্তব্য দেন। তবে ব্রিজের জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার চিত্র এবং পথচারীদের চরম ক্ষোভের কথা জানালে একপর্যায়ে সুর নরম করেন। তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘জননিরাপত্তার বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। খুব দ্রুতই এই ফুট ওভার ব্রিজটির সংস্কার কাজ শুরু করার প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

প্রাণ হাতে পার হচ্ছে হেমায়েতপুর ফুট ওভার ব্রিজ!

সর্বশেষ আপডেট ০৬:৪৫:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬

‘হেমায়েতপুরের এই ফুট ওভার ব্রিজে উঠলে মনে হয় কোনো ভিডিও গেমসের ‘সারভাইভাল’ রাউন্ডে নেমেছি। সিঁড়ির একেকটা ধাপ ভাঙা, পা ফসকালেই নিচে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের দ্রুতগতির গাড়ি। প্রতিদিন আমরা প্রাণ হাতে নিয়ে এই মরণখেলা খেলছি, অথচ প্রশাসনের কোনো হেলদোল নেই।’

তীব্র ক্ষোভ আর আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন সাভারের হেমায়েতপুর এলাকার বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকুরিজীবী কামরুল হাসান। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ব্যস্ততম হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডের ফুট ওভার ব্রিজটির বর্তমান জরাজীর্ণ দশা নিয়ে প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের মনে জমছে ক্ষোভের পাহাড়। কামরুল হাসানের মতো হাজারো মানুষের প্রশ্ন—প্রশাসন কি তবে বড় কোনো দূর্ঘটনার অপেক্ষায় দিন গুনছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই পয়েন্টে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পারাপার হন। সড়ক পারাপারের একমাত্র নিরাপদ মাধ্যম হওয়ার কথা থাকলেও এই ফুট ওভার ব্রিজটি এখন নিজেই এক মরণফাঁদ। ব্রিজের গোড়া থেকে শুরু করে ওপরের প্ল্যাটফর্ম—সর্বত্রই ধ্বংসস্তূপের ছাপ। সিঁড়ির লোহার প্লেটগুলো ক্ষয়ে গেছে, অনেক জায়গায় জং ধরে মরণফাঁদ তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, ব্রিজের মাঝপথে হাঁটার সময় পুরো কাঠামোটি তীব্রভাবে কাঁপতে থাকে, যা যেকোনো সুস্থ মানুষকেও আতঙ্কে ফেলে দেয়। নিচে তাকালে দেখা যায়, ব্রিজের মূল কাঠামোর অনেক অংশ ইতিমধ্যে খসে পড়েছে।

হেমায়েতপুরের স্থানীয় একটি পোশাক কারখানার সুপারভাইজার মোখলেসুর রহমান নিয়মিত এইভ ফূট ওভার ব্রিজটি ব্যবহার করেন। তিনি জানান, ‘কিছুদিন আগে ব্রিজের তলার একটা বড় লোহার শিট ভেঙে ঝুলে ছিল। পরে দায়সারাভাবে একটা ঝালাই দিয়ে জোড়াতালি দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার বা ছুটির দিনে যখন ব্রিজে মানুষের চাপ বাড়ে, তখন পুরো ব্রিজ যেভাবে দোলে, মনে হয় এই বুঝি ধসে পড়ল।’

রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে আসা পথচারী সুরাইয়া আক্তার ব্রিজে উঠে রীতিমতো ভয়ে জমে যান। তিনি বলেন, ‘ফুট ওভার ব্রিজ দিয়ে ওঠার সময় মনে হচ্ছিল ভূমিকম্প হচ্ছে। চারদিকের লোহার অ্যাঙ্গেলগুলো নড়বড়ে। গর্ভবতী নারী, শিশু কিংবা বৃদ্ধদের এই ব্রিজ দিয়ে পার করা এক প্রকার অসম্ভব।’

উদ্বেগ প্রকাশ করে স্থানীয় স্কুল শিক্ষক মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই নরককুণ্ড পার হয়ে যাতায়াত করছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো দুর্ঘটনার ছবি ভাইরাল হওয়ার পর আমাদের টনক নড়ে, তখন সবাই হাহাকার করি। কিন্তু সময় থাকতে এই মরণফাঁদ সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যে কারো স্বজন হারাতে পারে, এই দায় কে নেবে।’

এলাকার একটি ক্লিনিকের চিকিৎসক ডা. ফাহমিদা সুলতানা জানান, ‘ব্রিজের সিঁড়িগুলোর উচ্চতা এবং ভাঙাচোরা অবস্থার কারণে অসুস্থ রোগী এবং বয়োবৃদ্ধদের যাতায়াত করতে গিয়ে চরম বেগ পেতে হয়। দ্রুত বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই এটি পুনর্নির্মাণ করা জরুরি।’

স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘হেমায়েতপুরের এই ওভার ব্রিজটি এখন জনদুর্ভোগ আর আতঙ্কের প্রতীক। এটি অতি দ্রুত সংস্কার করা না হলে যেকোনো দিন সাভারবাসী এক বড় ট্র্যাজেডির সাক্ষী হবে।’

এ বিষয়ে জানতে সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী রিতেশ বড়ুয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং দায়সারা বক্তব্য দেন। তবে ব্রিজের জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার চিত্র এবং পথচারীদের চরম ক্ষোভের কথা জানালে একপর্যায়ে সুর নরম করেন। তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘জননিরাপত্তার বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। খুব দ্রুতই এই ফুট ওভার ব্রিজটির সংস্কার কাজ শুরু করার প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে।’