ঢাকা ০২:০৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকার সব মাঠে ও পার্কে প্রবেশের দাবি জানিয়েছে আইপিডি

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৮:২১:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬
  • / 39

রাজউক কর্তৃক গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক ও স্পোর্টস কমপ্লেক্সের পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে দেবার মাধ্যমে রাজধানীর মাঠ-পার্ক-গণপরিসরে জনসাধারণের অবাধ প্রবেশাধিকার সংকুচিত করে বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে। গণঅভ্যুত্থান এর পর যেখানে সকল মাঠ-পার্ক সকলের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবার কথা, সেখানে এই ধরনের নতুন বন্দোবস্ত সরকারকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে।

গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক’সহ দেশের সব পাবলিক মাঠ-পার্কে জনগণের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিতে গুরুত্ব দেন বক্তারা।

শুক্রবার (২২মে) ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) আয়োজিত “গুলশান সেন্ট্রাল পার্ককে গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের নিকট সমর্পণ: মাঠ-পার্কের দখলদারিত্বের নতুন বাস্তবতা” শিরোনামে অনলাইন আলোচনায় বক্তারা এ দাবি জানান।

অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। আলোচনায় অংশ নেন পরিবেশ বিষয়ক আইনজীবী সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন, বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন এর সমন্বয়ক আমিরুল রাজীব, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর শিক্ষক ও আইপিডির রিসার্চ ফেলো কে এম আসিফ ইকবাল, পরিবেশকর্মী নাঈম উল হাসান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও আইপিডির রিসার্চ ফেলো ড. ফরহাদুর রেজা, বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) এর সাবেক সদস্য পরিকল্পনাবিদ আবু নইম সোহাগ
প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, ঢাকা শহরে যেখানে প্রয়োজনের তুলনায় দশ ভাগের এক ভাগও মাঠ-পার্ক ও নেই, সেখানে বাণিজ্যিক ক্লাবকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া দেশের মাঠ-পার্ক সংক্রান্ত আইন এবং শহরের মহাপরিকল্পনার সাথে সাংঘর্ষিক। ফলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী, ডিএনসিসি প্রশাসক ও রাজউকের চেয়ারম্যান এর উপস্থিতিতে প্রাইভেট ক্লাবকে পার্কের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া জনগণের সাথে চূড়ান্ত ধরনের প্রহসন। এটা অন্তর্ভূক্তিতামূলক নগর পরিকল্পনা ও সরকারের খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানোর প্রতিজ্ঞার সাথে সাংঘর্ষিক। এছাড়া সবার অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে অবিলম্বে মাঠ পার্ক এর ব্যবস্থাপনার জন্য কমিউনিটি ও ওয়ার্ড কাউন্সিল এর যৌথ ব্যবস্থাপনাভিত্তিক নীতিমালা তৈরি করবার কোন বিকল্প নেই।

অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী ও ক্রীড়ামন্ত্রী যেখানে খেলাধূলার সুযোগ সম্প্রসারিত করবার কথা বলছেন, সেখানে গুলশান এর এই পার্ক নিয়ে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট রায় থাকবার পরেও গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের কাছে খেলার মাঠ সমর্পণ করা সুস্পষ্ট আদালত অবমাননা। এর মাধ্যমে জনসাধারণের খেলাধুলা ও বিনোদন অধিকার কেড়ে নেয়া হচ্ছে।

কয়েক মাস আগে খোদ রাজউকই গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে অবৈধ দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং অনুমোদনহীন নির্মাণের দায়ে অভিযুক্ত করেছে। অথচ সেই রাজউকই কয়েক মাসের মাথায় এই দখলদার ক্লাবকেই মাঠের পরিচালনার দায়িত্ব দিল। ইতিপূর্বে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এবং ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই ক্লাবকেই মাঠ পরিচালনার দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে দিয়ে রেখেছিল।

তিনি বলেন, গুলশান এর এই পার্কই শুধু নয়, ঢাকার ধানমন্ডি-উত্তরাসহ দেশের অনেক মাঠ-পার্কই এখনো অনেক দখলদারদের অবৈধ দখলে রয়েছে। একের পর এক সরকার পরিবর্তন হলেও দখলদাররা যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। সাধারণ শিশু-কিশোর-কিশোরীদের অবাধে খেলবার অধিকার এখন রাষ্ট্র ও সরকার যেন ভুলতে বসেছে। যাদের টাকা দিয়ে খেলবার সামর্থ্য আছে, সেই বিত্তশালীদের জন্যেই ক্লাবের নামে খেলাধূলার সুযোগ তৈরি করে অন্যায্য বৈষম্য তৈরি করা হচ্ছে বলে আইপিডির পর্যবেক্ষণ। জনগণ রাষ্ট্র ও সিটি কর্পোরেশনকে ট্যাক্স, কর ও বিভিন্ন ফিস দিয়ে থাকে।

শহরের শত শত কিলোমিটার রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণের টাকা থাকলেও মাঠ-পার্ক রক্ষণাবেক্ষণ এর সময় বলা হয় টাকা নেই; তাহলে জনগণ ট্যাক্স দেয় কেন। এগুলো সবই আসলে আজুহাত। ক্লাব ও গোষ্ঠীকে পার্ক-মাঠ ইজারা দেবার জন্যে সরকারের সংস্থাসমূহের ভেতরেও একটা চক্র কাজ করে বলে মনে করে আইপিডি।

আইপিডির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, কমিউনিটি পার্ক বা পাবলিক স্পেস পুরোপুরি সাধারণ মানুষের উন্মুক্ত ব্যবহারের জন্য থাকার কথা। কিন্তু গুলশান সেন্ট্রাল পার্কের একটি বড় অংশ গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় সাধারণ নাগরিকদের সার্বজনীন প্রবেশাধিকার চরমভাবে লংঘিত হচ্ছে। পার্কের মাঠটিতে সাধারণ শিশু বা কিশোরদের খেলার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। নির্দিষ্ট মেম্বারশিপ বা অনুমতি ছাড়া মাঠে প্রবেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পার্কের অভ্যন্তরে বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা, ফুড কোর্ট এবং ক্লাবের নিজস্ব পরিকাঠামো তৈরির কারণে পার্কের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সবুজায়ন ব্যাহত হচ্ছে। “পাবলিক পার্ক-খেলার মাঠ” কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ক্লাবের একক নিয়ন্ত্রণে যেতে পারে, তা নিয়ে রাজউক এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ভূমিকা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

এড. সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ইশতেহারে প্রতিটি এলাকায় পার্ক নির্মাণের বিষয়ে বলা থাকলেও মাঠ-পার্ক গুলো দখলদারের হাতে চলে যাওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। এতে সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, যা সরকারকে বিতর্কিত করছে। হাইকোর্ট এর রায় থাকা সত্বেও রাজউক ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে যে পার্কটি ক্লাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে তা খুবই হতাশাজনক। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ক্লাবের হাতে তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন ধরনের দূর্নীতি হয়েছে কিনা, সেটা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর তদন্ত করে দেখা উচিত।

আমিরুল রাজীব বলেন, আমাদের মধ্যে যারা মাঠ পার্ক রক্ষায় আন্দোলন করেছেন, সেই আন্দোলনকারীদের মধ্যে কারো কারো নৈতিক বিচ্যুতি দেখা গিয়েছে। এদের অনেকেই সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বে থেকেও মাঠ-পার্কের দখলদারদের পক্ষে কাজ করে গিয়েছেন। এর ফলে যারা আন্দোলন করেন তাদের নৈতিক ভিত্তি কিছুটা দুর্বল হয়ে যায় সাধারণ মানুষের চোখে। পাশাপাশি আমাদের হতাশাও তৈরি হয়। রাজনীতিবিদ এবং আমলারা হয়তো দখলদারদের স্বার্থের পক্ষে থাকবে, তাদের বিপক্ষে গিয়েই আমাদের কথা বলা চালিয়ে যেতে হবে, কারণ এটি আমাদের প্রাণের দাবি। আমাদের গণঅভ্যুত্থানের পর যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা এখনো বিদ্যমান। যারা মনে করছেন গোষ্ঠীস্বার্থের পক্ষে দাঁড়াবেন, তাদের আরও অনেক বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।

কে এম আসিফ ইকবাল বলেন, ঢাকা শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে খেলার মাঠ-পার্কের উপরও চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং তা নিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে যার সুবিধা নিতে চায় স্বার্থান্বেষী মহল। বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে আমাদের নাগরিক সুবিধা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সরকারকে বিভিন্ন ওয়ার্ডে খাস জমি চিহ্নিত করে খেলার মাঠ বা পার্ক বানাতে হবে।

পরিবেশকর্মী নাঈম উল হাসান বলেন, আমরা যদিও ঢাকার গুলশান ক্লাবের দখলদারিত্বের বিষয় নিয়ে কথা বলছি, তবে এই দখলদারিত্ব শুধু ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ নয়; দেশের অন্যান্য প্রান্তেও একই ধরনের দখলদারিত্ব বিদ্যমান। যখন আমরা ঢাকার দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কথা বলি, তখন তা অন্যান্য অঞ্চলের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধেও একটি প্রভাব তৈরি করে বা অনুপ্রাণিত করে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, মন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের ক্লাবের সদস্যপদ প্রদান, এমনকি বিভিন্ন স্থানে এসপি, ডিসি এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে এই দখলদারিত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করা হয় যা একটি সংগঠিত কৌশল। এর বিপরীতে আন্দোলনের কৌশল বের করতে হবে নাগরিকদের।

তিনি বলেন, মাঠ পার্কের দখলদারিত্বের মাধ্যমে যে অর্থ উপার্জন করা হয়, তা দুর্নীতির মাধ্যমেই হয় এবং এজন্য এর যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এতবার আলোচনা হওয়ার পরও কেন কর্তৃপক্ষ এখনো দখলদারদের পক্ষেই অবস্থান নেয়।

ড. ফরহাদুর রেজা বলেন, জনসংখ্যার তুলনায় পার্ক বা খেলার মাঠের সংখ্যা আমাদের দেশে অনেক কম। সেখানে এই পার্কগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশের পরিকল্পনায় পার্ক-খেলার মাঠকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়। গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে বেসরকারি চুক্তির মাধ্যমে আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

পরিকল্পনাবিদ আবু নইম সোহাগ বলেন, প্রধানমন্ত্রী এবং ক্রীড়া মন্ত্রী উভয়েই ঘোষণা দিয়েছেন যে প্রতিটি এলাকায় মাঠ থাকবে। তাহলে প্রশ্ন আসে, কোনো অনুমোদন ছাড়া কীভাবে একটি মাঠ কেড়ে নেওয়া সম্ভব? এবং কোন যুক্তিতে তারা এটি করতে পারে। এ ধরনের অপরিণামদর্শী কাজের পরিণতি কখনোই ভালো হয় না বলে তিনি সতর্ক করেন।

আইপিডি সদস্য পরিকল্পনাবিদ ফাহিম মন্ডল বলেন, ঢাকার পার্ক-মাঠগুলো সরকার নিজেরা রক্ষণাবেক্ষণ বা সংরক্ষণের তুলনায় তৃতীয় পক্ষের কাছে ইজারা দিতে বেশি আগ্রহী। নাম পরিবর্তনের বিষয়টিও দখলদারিত্ব জারি রাখবার একটা কৌশল। পার্কের পূর্বের নাম শহীদ তাজউদ্দীন পার্ক ফিরিয়ে আনতে হবে।

আইপিডির গবেষণা সহকারী জিনিয়াস জান্নাত বলেন, ভূমি ও আবাসন সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পে এলাকাবাসীর জন্য মাঠ-পার্ক নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়—তা ভূমি অধিগ্রহণ এর মতো আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই করা হয়। তাহলে প্রশ্ন হলো, সেই একই জমি আবার কীভাবে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়?

আইপিডির গবেষণা সহকারী কাজী তাসনিয়া তাবাসসুম বলেন, জনসাধারণের স্থান যখন বেসরকারি তত্ত্বাবধানে চলে যায় তখন তার অসম ব্যবহার শুরু হয়। যার জন্য জায়গাগুলোতে ‘সফট প্রাইভেটাইজেশন’ শুরু হচ্ছে। গুলশানের মত এলাকায় যদি বেসরকারি সংস্থার অধীনে পার্ক লগুলো চলে যায় তবে স্বল্প আয়ের মানুষরা নিজেদের আরও প্রান্তিক মনে করবে। এর ফলে ভবিষ্যতের ঢাকায় সামাজিক বিভাজন আরো বেড়ে যাবে।

ঢাকা শহরের মাঠ-পার্ক এর সার্বিক পরিচালনার জন্য আইপিডির পক্ষ থেকে কমিউনিটি ও সিটি কর্পোরেশনভিত্তিক যৌথ ব্যবস্থাপনা মডেল প্রস্তাব করা হয়। দ্বি-স্তরের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে মাঠ-পার্ক পরিচালনার জন্য একটি বিশেষ যৌথ কমিটি গঠিত করবার সুপারিশ করা হয়।

প্রথম স্তর হবে সিটি কর্পোরেশন ভিত্তিক। ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিস এবং সিটি কর্পোরেশনের প্রতিনিধিরা এর আইনি ও কাঠামোগত অভিভাবক হিসেবে থাকবেন। দ্বিতীয় স্তর হবে স্থানীয় কমিউনিটির নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বশীল কমিটি। এতে এলাকার সমাজসেবক, পরিবেশবিদ এবং বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নাগরিকদের নিয়ে প্রতিনিধিত্ব থাকবে।

মূলত পার্কের উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ বিল, সিসিটিভি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ এবং মূল নিরাপত্তা অবকাঠামো তদারকি করবে সিটি কর্পোরেশন। এছাড়া প্রতিদিনের পরিচ্ছন্নতা, তদারকি, যত্ন এবং দর্শনার্থী ও ব্যবহারকারীরা মাঠপার্কের নিয়ম ও নীতিমালা মানছেন কিনা তা দেখাশোনা করবে কমিউনিটিভিত্তিক কমিটি। মাঠ-পার্কের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সিটি কর্পোরেশন এর বাজেটে বরাদ্দ থাকতে হবে।

এছাড়া প্রয়োজন হলে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর ফান্ড কিংবা ডোনেশন ও সংগ্রহ করা যেতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থাপনা মডেলে কোনো নির্দিষ্ট স্পোর্টিং ক্লাব বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী পার্ক বা মাঠকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে বাণিজ্য করতে পারে না, যা ঢাকার বিভিন্ন মাঠ-পার্কে এখন দেখা যাচ্ছে।

এছাড়া আইপিডির পক্ষ থেকে অন্য যে সকল সুপারিশস করা হিয়, সেগুলো হল:
১. গুলশান সেন্ট্রাল পার্কের মাঠসহ সকল সুযোগ সুবিধাদি সর্বসাধারণের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দিতে হবে।
২. রাজউক ও গুলশান ইয়ুথ ক্লাব এর মধ্যে সাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অবিলম্বে বাতিল করতে হবে
৩. পার্কের নাম পুনরায় “শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক” রাখতে হবে
৪. এই যাবতকাল গুলশান সেন্ট্রাল পার্কের দখলদারিত্বের বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে
৫. ঢাকা শহরসহ সারা দেশের সকল মাঠ-পার্কের বাণিজ্যিক ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
৬. ঢাকা শহরসহ সারা দেশের সকল মাঠ-পার্কের বাণিজ্যিক ব্যবহার ও দখলদারিত্বের পূর্ণ তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ ও দোষীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
৭. মাঠ পার্ক এর ব্যবস্থাপনার জন্য কমিউনিটি ও ওয়ার্ড কাউন্সিলকে এর যৌথ ব্যবস্থাপনাভিত্তিক নীতিমালা তৈরি করতে হবে।
৮. প্রতিটি এলাকায় সার্বজনীন প্রবেশগম্য মাঠ পার্ক এর জন্য যথাযথ পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের পথরেখা তৈরি করতে হবে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

ঢাকার সব মাঠে ও পার্কে প্রবেশের দাবি জানিয়েছে আইপিডি

সর্বশেষ আপডেট ০৮:২১:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬

রাজউক কর্তৃক গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক ও স্পোর্টস কমপ্লেক্সের পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে দেবার মাধ্যমে রাজধানীর মাঠ-পার্ক-গণপরিসরে জনসাধারণের অবাধ প্রবেশাধিকার সংকুচিত করে বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে। গণঅভ্যুত্থান এর পর যেখানে সকল মাঠ-পার্ক সকলের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবার কথা, সেখানে এই ধরনের নতুন বন্দোবস্ত সরকারকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে।

গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক’সহ দেশের সব পাবলিক মাঠ-পার্কে জনগণের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিতে গুরুত্ব দেন বক্তারা।

শুক্রবার (২২মে) ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) আয়োজিত “গুলশান সেন্ট্রাল পার্ককে গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের নিকট সমর্পণ: মাঠ-পার্কের দখলদারিত্বের নতুন বাস্তবতা” শিরোনামে অনলাইন আলোচনায় বক্তারা এ দাবি জানান।

অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। আলোচনায় অংশ নেন পরিবেশ বিষয়ক আইনজীবী সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন, বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন এর সমন্বয়ক আমিরুল রাজীব, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর শিক্ষক ও আইপিডির রিসার্চ ফেলো কে এম আসিফ ইকবাল, পরিবেশকর্মী নাঈম উল হাসান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও আইপিডির রিসার্চ ফেলো ড. ফরহাদুর রেজা, বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) এর সাবেক সদস্য পরিকল্পনাবিদ আবু নইম সোহাগ
প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, ঢাকা শহরে যেখানে প্রয়োজনের তুলনায় দশ ভাগের এক ভাগও মাঠ-পার্ক ও নেই, সেখানে বাণিজ্যিক ক্লাবকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া দেশের মাঠ-পার্ক সংক্রান্ত আইন এবং শহরের মহাপরিকল্পনার সাথে সাংঘর্ষিক। ফলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী, ডিএনসিসি প্রশাসক ও রাজউকের চেয়ারম্যান এর উপস্থিতিতে প্রাইভেট ক্লাবকে পার্কের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া জনগণের সাথে চূড়ান্ত ধরনের প্রহসন। এটা অন্তর্ভূক্তিতামূলক নগর পরিকল্পনা ও সরকারের খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানোর প্রতিজ্ঞার সাথে সাংঘর্ষিক। এছাড়া সবার অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে অবিলম্বে মাঠ পার্ক এর ব্যবস্থাপনার জন্য কমিউনিটি ও ওয়ার্ড কাউন্সিল এর যৌথ ব্যবস্থাপনাভিত্তিক নীতিমালা তৈরি করবার কোন বিকল্প নেই।

অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী ও ক্রীড়ামন্ত্রী যেখানে খেলাধূলার সুযোগ সম্প্রসারিত করবার কথা বলছেন, সেখানে গুলশান এর এই পার্ক নিয়ে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট রায় থাকবার পরেও গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের কাছে খেলার মাঠ সমর্পণ করা সুস্পষ্ট আদালত অবমাননা। এর মাধ্যমে জনসাধারণের খেলাধুলা ও বিনোদন অধিকার কেড়ে নেয়া হচ্ছে।

কয়েক মাস আগে খোদ রাজউকই গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে অবৈধ দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং অনুমোদনহীন নির্মাণের দায়ে অভিযুক্ত করেছে। অথচ সেই রাজউকই কয়েক মাসের মাথায় এই দখলদার ক্লাবকেই মাঠের পরিচালনার দায়িত্ব দিল। ইতিপূর্বে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এবং ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই ক্লাবকেই মাঠ পরিচালনার দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে দিয়ে রেখেছিল।

তিনি বলেন, গুলশান এর এই পার্কই শুধু নয়, ঢাকার ধানমন্ডি-উত্তরাসহ দেশের অনেক মাঠ-পার্কই এখনো অনেক দখলদারদের অবৈধ দখলে রয়েছে। একের পর এক সরকার পরিবর্তন হলেও দখলদাররা যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। সাধারণ শিশু-কিশোর-কিশোরীদের অবাধে খেলবার অধিকার এখন রাষ্ট্র ও সরকার যেন ভুলতে বসেছে। যাদের টাকা দিয়ে খেলবার সামর্থ্য আছে, সেই বিত্তশালীদের জন্যেই ক্লাবের নামে খেলাধূলার সুযোগ তৈরি করে অন্যায্য বৈষম্য তৈরি করা হচ্ছে বলে আইপিডির পর্যবেক্ষণ। জনগণ রাষ্ট্র ও সিটি কর্পোরেশনকে ট্যাক্স, কর ও বিভিন্ন ফিস দিয়ে থাকে।

শহরের শত শত কিলোমিটার রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণের টাকা থাকলেও মাঠ-পার্ক রক্ষণাবেক্ষণ এর সময় বলা হয় টাকা নেই; তাহলে জনগণ ট্যাক্স দেয় কেন। এগুলো সবই আসলে আজুহাত। ক্লাব ও গোষ্ঠীকে পার্ক-মাঠ ইজারা দেবার জন্যে সরকারের সংস্থাসমূহের ভেতরেও একটা চক্র কাজ করে বলে মনে করে আইপিডি।

আইপিডির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, কমিউনিটি পার্ক বা পাবলিক স্পেস পুরোপুরি সাধারণ মানুষের উন্মুক্ত ব্যবহারের জন্য থাকার কথা। কিন্তু গুলশান সেন্ট্রাল পার্কের একটি বড় অংশ গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় সাধারণ নাগরিকদের সার্বজনীন প্রবেশাধিকার চরমভাবে লংঘিত হচ্ছে। পার্কের মাঠটিতে সাধারণ শিশু বা কিশোরদের খেলার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। নির্দিষ্ট মেম্বারশিপ বা অনুমতি ছাড়া মাঠে প্রবেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পার্কের অভ্যন্তরে বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা, ফুড কোর্ট এবং ক্লাবের নিজস্ব পরিকাঠামো তৈরির কারণে পার্কের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সবুজায়ন ব্যাহত হচ্ছে। “পাবলিক পার্ক-খেলার মাঠ” কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ক্লাবের একক নিয়ন্ত্রণে যেতে পারে, তা নিয়ে রাজউক এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ভূমিকা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

এড. সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ইশতেহারে প্রতিটি এলাকায় পার্ক নির্মাণের বিষয়ে বলা থাকলেও মাঠ-পার্ক গুলো দখলদারের হাতে চলে যাওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। এতে সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, যা সরকারকে বিতর্কিত করছে। হাইকোর্ট এর রায় থাকা সত্বেও রাজউক ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে যে পার্কটি ক্লাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে তা খুবই হতাশাজনক। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ক্লাবের হাতে তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন ধরনের দূর্নীতি হয়েছে কিনা, সেটা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর তদন্ত করে দেখা উচিত।

আমিরুল রাজীব বলেন, আমাদের মধ্যে যারা মাঠ পার্ক রক্ষায় আন্দোলন করেছেন, সেই আন্দোলনকারীদের মধ্যে কারো কারো নৈতিক বিচ্যুতি দেখা গিয়েছে। এদের অনেকেই সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বে থেকেও মাঠ-পার্কের দখলদারদের পক্ষে কাজ করে গিয়েছেন। এর ফলে যারা আন্দোলন করেন তাদের নৈতিক ভিত্তি কিছুটা দুর্বল হয়ে যায় সাধারণ মানুষের চোখে। পাশাপাশি আমাদের হতাশাও তৈরি হয়। রাজনীতিবিদ এবং আমলারা হয়তো দখলদারদের স্বার্থের পক্ষে থাকবে, তাদের বিপক্ষে গিয়েই আমাদের কথা বলা চালিয়ে যেতে হবে, কারণ এটি আমাদের প্রাণের দাবি। আমাদের গণঅভ্যুত্থানের পর যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা এখনো বিদ্যমান। যারা মনে করছেন গোষ্ঠীস্বার্থের পক্ষে দাঁড়াবেন, তাদের আরও অনেক বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।

কে এম আসিফ ইকবাল বলেন, ঢাকা শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে খেলার মাঠ-পার্কের উপরও চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং তা নিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে যার সুবিধা নিতে চায় স্বার্থান্বেষী মহল। বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে আমাদের নাগরিক সুবিধা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সরকারকে বিভিন্ন ওয়ার্ডে খাস জমি চিহ্নিত করে খেলার মাঠ বা পার্ক বানাতে হবে।

পরিবেশকর্মী নাঈম উল হাসান বলেন, আমরা যদিও ঢাকার গুলশান ক্লাবের দখলদারিত্বের বিষয় নিয়ে কথা বলছি, তবে এই দখলদারিত্ব শুধু ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ নয়; দেশের অন্যান্য প্রান্তেও একই ধরনের দখলদারিত্ব বিদ্যমান। যখন আমরা ঢাকার দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কথা বলি, তখন তা অন্যান্য অঞ্চলের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধেও একটি প্রভাব তৈরি করে বা অনুপ্রাণিত করে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, মন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের ক্লাবের সদস্যপদ প্রদান, এমনকি বিভিন্ন স্থানে এসপি, ডিসি এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে এই দখলদারিত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করা হয় যা একটি সংগঠিত কৌশল। এর বিপরীতে আন্দোলনের কৌশল বের করতে হবে নাগরিকদের।

তিনি বলেন, মাঠ পার্কের দখলদারিত্বের মাধ্যমে যে অর্থ উপার্জন করা হয়, তা দুর্নীতির মাধ্যমেই হয় এবং এজন্য এর যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এতবার আলোচনা হওয়ার পরও কেন কর্তৃপক্ষ এখনো দখলদারদের পক্ষেই অবস্থান নেয়।

ড. ফরহাদুর রেজা বলেন, জনসংখ্যার তুলনায় পার্ক বা খেলার মাঠের সংখ্যা আমাদের দেশে অনেক কম। সেখানে এই পার্কগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশের পরিকল্পনায় পার্ক-খেলার মাঠকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়। গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে বেসরকারি চুক্তির মাধ্যমে আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

পরিকল্পনাবিদ আবু নইম সোহাগ বলেন, প্রধানমন্ত্রী এবং ক্রীড়া মন্ত্রী উভয়েই ঘোষণা দিয়েছেন যে প্রতিটি এলাকায় মাঠ থাকবে। তাহলে প্রশ্ন আসে, কোনো অনুমোদন ছাড়া কীভাবে একটি মাঠ কেড়ে নেওয়া সম্ভব? এবং কোন যুক্তিতে তারা এটি করতে পারে। এ ধরনের অপরিণামদর্শী কাজের পরিণতি কখনোই ভালো হয় না বলে তিনি সতর্ক করেন।

আইপিডি সদস্য পরিকল্পনাবিদ ফাহিম মন্ডল বলেন, ঢাকার পার্ক-মাঠগুলো সরকার নিজেরা রক্ষণাবেক্ষণ বা সংরক্ষণের তুলনায় তৃতীয় পক্ষের কাছে ইজারা দিতে বেশি আগ্রহী। নাম পরিবর্তনের বিষয়টিও দখলদারিত্ব জারি রাখবার একটা কৌশল। পার্কের পূর্বের নাম শহীদ তাজউদ্দীন পার্ক ফিরিয়ে আনতে হবে।

আইপিডির গবেষণা সহকারী জিনিয়াস জান্নাত বলেন, ভূমি ও আবাসন সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পে এলাকাবাসীর জন্য মাঠ-পার্ক নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়—তা ভূমি অধিগ্রহণ এর মতো আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই করা হয়। তাহলে প্রশ্ন হলো, সেই একই জমি আবার কীভাবে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়?

আইপিডির গবেষণা সহকারী কাজী তাসনিয়া তাবাসসুম বলেন, জনসাধারণের স্থান যখন বেসরকারি তত্ত্বাবধানে চলে যায় তখন তার অসম ব্যবহার শুরু হয়। যার জন্য জায়গাগুলোতে ‘সফট প্রাইভেটাইজেশন’ শুরু হচ্ছে। গুলশানের মত এলাকায় যদি বেসরকারি সংস্থার অধীনে পার্ক লগুলো চলে যায় তবে স্বল্প আয়ের মানুষরা নিজেদের আরও প্রান্তিক মনে করবে। এর ফলে ভবিষ্যতের ঢাকায় সামাজিক বিভাজন আরো বেড়ে যাবে।

ঢাকা শহরের মাঠ-পার্ক এর সার্বিক পরিচালনার জন্য আইপিডির পক্ষ থেকে কমিউনিটি ও সিটি কর্পোরেশনভিত্তিক যৌথ ব্যবস্থাপনা মডেল প্রস্তাব করা হয়। দ্বি-স্তরের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে মাঠ-পার্ক পরিচালনার জন্য একটি বিশেষ যৌথ কমিটি গঠিত করবার সুপারিশ করা হয়।

প্রথম স্তর হবে সিটি কর্পোরেশন ভিত্তিক। ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিস এবং সিটি কর্পোরেশনের প্রতিনিধিরা এর আইনি ও কাঠামোগত অভিভাবক হিসেবে থাকবেন। দ্বিতীয় স্তর হবে স্থানীয় কমিউনিটির নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বশীল কমিটি। এতে এলাকার সমাজসেবক, পরিবেশবিদ এবং বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নাগরিকদের নিয়ে প্রতিনিধিত্ব থাকবে।

মূলত পার্কের উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ বিল, সিসিটিভি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ এবং মূল নিরাপত্তা অবকাঠামো তদারকি করবে সিটি কর্পোরেশন। এছাড়া প্রতিদিনের পরিচ্ছন্নতা, তদারকি, যত্ন এবং দর্শনার্থী ও ব্যবহারকারীরা মাঠপার্কের নিয়ম ও নীতিমালা মানছেন কিনা তা দেখাশোনা করবে কমিউনিটিভিত্তিক কমিটি। মাঠ-পার্কের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সিটি কর্পোরেশন এর বাজেটে বরাদ্দ থাকতে হবে।

এছাড়া প্রয়োজন হলে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর ফান্ড কিংবা ডোনেশন ও সংগ্রহ করা যেতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থাপনা মডেলে কোনো নির্দিষ্ট স্পোর্টিং ক্লাব বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী পার্ক বা মাঠকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে বাণিজ্য করতে পারে না, যা ঢাকার বিভিন্ন মাঠ-পার্কে এখন দেখা যাচ্ছে।

এছাড়া আইপিডির পক্ষ থেকে অন্য যে সকল সুপারিশস করা হিয়, সেগুলো হল:
১. গুলশান সেন্ট্রাল পার্কের মাঠসহ সকল সুযোগ সুবিধাদি সর্বসাধারণের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দিতে হবে।
২. রাজউক ও গুলশান ইয়ুথ ক্লাব এর মধ্যে সাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অবিলম্বে বাতিল করতে হবে
৩. পার্কের নাম পুনরায় “শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক” রাখতে হবে
৪. এই যাবতকাল গুলশান সেন্ট্রাল পার্কের দখলদারিত্বের বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে
৫. ঢাকা শহরসহ সারা দেশের সকল মাঠ-পার্কের বাণিজ্যিক ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
৬. ঢাকা শহরসহ সারা দেশের সকল মাঠ-পার্কের বাণিজ্যিক ব্যবহার ও দখলদারিত্বের পূর্ণ তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ ও দোষীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
৭. মাঠ পার্ক এর ব্যবস্থাপনার জন্য কমিউনিটি ও ওয়ার্ড কাউন্সিলকে এর যৌথ ব্যবস্থাপনাভিত্তিক নীতিমালা তৈরি করতে হবে।
৮. প্রতিটি এলাকায় সার্বজনীন প্রবেশগম্য মাঠ পার্ক এর জন্য যথাযথ পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের পথরেখা তৈরি করতে হবে।