আসন্ন বাজেটে তামাকপণ্যে কার্যকর কর ও মূল্য বৃদ্ধির দাবি
- সর্বশেষ আপডেট ০৬:২৭:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
- / 23
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সকল তামাকপণ্যের উপর মূল্য বৃদ্ধি ও সুনির্দিষ্ট কর আরোপের দাবিতে বৃহস্পতিবার (২১ মে ) সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেল-এ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন অব দি রুরাল পূয়র-ডব়্প আয়োজিত সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সভায় মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও অতি উচ্চ—এই চার স্তরের সিগারেট বিদ্যমান; এর মধ্যে বাজারে বিক্রিত সিগারেটের প্রায় ৯০ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম স্তরের। এই স্তরে তামাকপণ্য সস্তা হওয়ায় তরুণ জনগোষ্ঠী তামাক ব্যবহারে আসক্ত হয়ে থাকে। সস্তা তামাকপণ্য সহজলভ্য হওয়ায় তরুণসমাজ ও নিম্ন আয়ের মানুষের তামাক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ কোন কাজে আসছে না।
তাই আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তামাকপণ্যে কার্যকর করারোপের মাধ্যমে দাম বৃদ্ধি করে নিম্ন ও মধ্যম স্তরকে একত্র করে প্রতি ১০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেটের সর্বনিম্ন দাম ১০০ টাকা, উচ্চ স্তরে ১৫০ টাকা, ও অতি উচ্চ স্তরে ২০০ টাকা নির্ধারণ এবং সকল স্তরে ৬৭% সম্পূরক শুল্ক বহাল রেখে প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করতে হবে।
তামাকপণ্যে এই কর ও মূল্য প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা গেলে ৩ লক্ষ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ১ লক্ষ ৮৫ হাজারের বেশি তরুণ জনগোষ্ঠীর অকালমৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এমপি বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার ছিল জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও তামাক নিয়ন্ত্রণ।
তিনি বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নের পাশাপাশি তামাকপণ্যে কার্যকর কর ও মূল্য বৃদ্ধি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
মূল প্রবন্ধে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম ২৭ থেকে ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেলেও একই সময়ে বিভিন্ন স্তরের সিগারেটের দাম বেড়েছে মাত্র ৬ থেকে ১৫ শতাংশ। ফলে মানুষের খাদ্য ব্যয় বাড়লেও সিগারেট তুলনামূলকভাবে আরও সস্তা ও সহজলভ্য হয়ে উঠছে, যা বিশেষ করে তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি।
তিনি আরও বলেন, তামাক কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদী ভোক্তা তৈরির উদ্দেশ্যে তরুণদের লক্ষ্যবস্তু করে থাকে।
তিনি আশ্বাস দেন যে, তামাকপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি ও কার্যকর করারোপের বিষয়টি তিনি সংসদে উত্থাপন করবেন এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের সাথেও আলোচনা করবেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সুলতানা জেসমিন জুঁই এমপি বলেন, একজন নারী সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন যে তামাকের ক্ষতি শুধু ব্যবহারকারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব নারী, শিশু ও পুরো পরিবারের ওপর পড়ে।
তিনি বলেন, আজকের আলোচনায় উঠে এসেছে যে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি এবং দেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লক্ষ মানুষ তামাকজনিত রোগে অকালমৃত্যুর শিকার হয়। এছাড়া ২০২৪ সালে তামাকের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা এই খাত থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের দ্বিগুণেরও বেশি।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে কার্যকর তামাক করনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে একইসাথে ধূমপান কমানো ও রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব।
ফিলিপাইনে দেখা গেছে, সিন ট্যাক্স সংস্কারের মাধ্যমে সিগারেটের মূল্য বৃদ্ধি ও একক কর কাঠামো চালুর ফলে ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে সিগারেট বিক্রি ২৮.১ শতাংশ কমে যায় এবং রাজস্ব তিন গুণের বেশি বৃদ্ধি পায়। তিনি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং নারী, শিশু ও তরুণ সমাজকে তামাকের ক্ষতি থেকে রক্ষায় সংসদে সোচ্চার ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন এমপি বলেন, আজকের আলোচনায় উপস্থাপিত তথ্য থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, বিদ্যমান তামাক কর কাঠামোর কারণে সরকার বছরে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের সুযোগ হারাচ্ছে।
তিনি সামাজিক আন্দোলনের পক্ষে মত দিয়ে বলেন, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একইসঙ্গে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সস্তা সিগারেটের সহজলভ্যতার কারণে দেশের তরুণ সমাজ ক্রমেই তামাকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি।
তিনি মনে করেন, কার্যকর তামাক করনীতি শুধু রাজস্ব বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি তরুণদের তামাক আসক্তি থেকে সুরক্ষা দেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন ডব়্প-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও এএইচএম নোমান, সমাপনী বক্তব্য দেন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন এবং সঞ্চালনা করেন উপ-নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান। আরও উপস্থিত ছিলেন বিসিআইসি-এর সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান, তামাকবিরোধী যুব প্রতিনিধি নাইমা আহমেদ, ইমরান হাসানসহ আরো অনেকে।




































