ঢাকা ০১:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পান্থকুঞ্জ প্রকল্পে পরিবেশ ও নাগরিক জীবনের ক্ষতির আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৬:০১:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
  • / 70

পান্থকুঞ্জ পার্ক এলাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে নগরের উন্মুক্ত স্থান, পরিবেশ ও নাগরিক জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে জানালেন বিশিষ্টজনেরা।

শনিবার (২৫ জুলাই ) সকাল সাড়ে ১০ টায় রাজধানীর প্ল্যানার্স টাওয়ারে বিআইপি কনফারেন্স হলে “পান্থকুঞ্জ পার্কঃ ফাইট ফর দ্য ‘আরবান কমন্স’ ইন ঢাকা” শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজনেরা এ মন্তব্য করেন।

আরবান স্টাডিজ ফাউন্ডেশন (ইউএসএফ) অ্যাওয়ার্ড ২০২৫-এর আওতায় পরিচালিত “দ্য ফাইভ সিটি মাস্টারক্লাস সিরিজ: অর্ডিনারি ইকোলজিস অব রিপেয়ার”-এর অংশ হিসেবে ইনটারডিসিপ্লিনারি সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব গ্লোবাল চেঞ্জ, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, বুয়েট, বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি), দুনিয়াদারি আর্কাইভ যৌথভাবে এ গোলটেবিল বৈঠকটি আয়োজন করে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসানের সঞ্চালনায় বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক আমিরুল রাজীব ও নাঈম উল হাসান মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

আমিরুল রাজীব তাঁর মূল প্রবন্ধে বলেন, ঢাকার বিভিন্ন বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজউক ও রিহ্যাবের ভূমিকা এবং সম্পৃক্ততা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
তাঁর মতে, আবাসন খাতের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার ফলে নাগরিক অধিকার ও পরিবেশগত বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ড্যাপ সংশোধনের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন পক্ষের প্রভাব পরিলক্ষিত হয় এবং গণমাধ্যমের একটি অংশও বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রভাবের কারণে জনগণের কাছে প্রকৃত তথ্য যথাযথভাবে পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হয়। তিনি দাবি করেন, পান্থকুঞ্জ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে প্রায় দুই হাজার গাছ অপসারণ করা হয়েছে, যার ফলে জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নাঈম উল হাসান উপস্থাপনার মাধ্যমে পান্থকুঞ্জ আন্দোলনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি ১৬৮ দিনব্যাপী আন্দোলনের আলোকচিত্র, নাগরিকদের সংগঠিত করার প্রক্রিয়া এবং আদালতে রিট দায়েরের বিষয় উপস্থাপন করেন। পাশাপাশি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সীমাবদ্ধতা, ঢাকা শহরের পরিকল্পনা অনুসরণ না করা, প্রকল্প ব্যয় সংক্রান্ত প্রশ্ন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে সাধারণ মানুষের প্রাণহানিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন।

মূল উপস্থাপনার পর শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় ঢাকার অপরিকল্পিত নগরায়ন, উন্মুক্ত স্থানের সংকট, দূষণ, ভূমিকম্পের সময় নিরাপদ আশ্রয়স্থলের অভাব এবং নগরবাসীর জীবনমানের অবনতির বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।

কাঁঠালবাগান এলাকার বাসিন্দা সাদমান সাকিব বলেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দাদের পর্যাপ্তভাবে অবহিত করা হয়নি।
তিনি উল্লেখ করেন, পান্থকুঞ্জ এলাকাটি স্থানীয়দের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্মুক্ত স্থান ছিল এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে এর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গুরুত্বসহকারে ভাবা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ বলেন, আদালত পরিবেশ সংরক্ষণের পক্ষে অবস্থান নিলেও আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তিনি পরিবেশ ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কার্যকর আইন প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলনের সদস্য মোহাইমিনুল বাশার রাজ বলেন, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় বহুমাত্রিক সমাধান, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষার প্রসার এবং তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। একই সংগঠনের

অপর এক সদস্য রাফিয়া মাহজাবীন বুশরা বলেন, দূষণের কারণে ঢাকা ক্রমেই বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। তিনি পরিবেশ রক্ষায় নাগরিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক সৈয়দা রত্না বলেন, অহিংস নাগরিক আন্দোলন কখনো ব্যর্থ হয় না। তিনি শিশুদের সুস্থ বিকাশে উন্মুক্ত মাঠের গুরুত্ব তুলে ধরে নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।

নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মতিন আবদুল্লাহ পরিবেশ ও নগর উন্নয়ন বিষয়ক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা আরও জোরদার করার আহ্বান জানান।

বিআইপি’র সাবেক সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ সৈয়দ শাহারিয়ার আমিন বলেন, একটি বাসযোগ্য নগরের জন্য উন্মুক্ত মাঠ, জলাধার ও উদ্যান অপরিহার্য। তিনি সুশাসন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন ও আলাই কেন্দ্রের সদস্য আমিনা আনসারী নগরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় পার্ক ও উন্মুক্ত সবুজ স্থানের অপরিহার্যতা তুলে ধরেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলনের সদস্য শাহ নেওয়াজ সৈকত বলেন, জনসচেতনতা ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবেশ ও উন্মুক্ত স্থান পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

কাঁঠালবাগান এলাকার বাসিন্ধা এবং ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের শিক্ষার্থী সানজানা মারিয়া কবির নগরের দূষণ, যানজট এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব তুলে ধরে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান অনুসন্ধানের আহ্বান জানান।

পরিকল্পনাবিদ নিয়াজ রহমান বলেন, এ ধরনের সমস্যার অন্যতম কারণ পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও জবাবদিহিতার অভাব। তিনি পরিকল্পনা প্রণয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

লেখক ও চিন্তাবিদ ফিরোজ আহমেদ বলেন, পার্ক ও জলাধার ধ্বংসের জন্য জনগণের চেয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনাই বেশি দায়ী। এ বিষয়ে পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষকে আরও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।

বুয়েটের অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসীব চৌধুরী বলেন, বিদ্যমান আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে নগরের উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি জনস্বার্থভিত্তিক আইন ও নীতিমালার সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বেঙ্গল স্ট্রিমের স্থপতি ও কিউরেটর নিকলাউস গ্র্যাবার বলেন, বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য। তিনি স্থানীয় চাহিদা ও এলাকার বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে সমগ্র নগরব্যবস্থার জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান। একইসঙ্গে, তিনি নগর পরিকল্পনায় কমিউনিটি ও পাড়াভিত্তিক পরিকল্পনাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন।

পান্থকুঞ্জ প্রভাতী সংঘের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুদ্দিন তুহিন বলেন, উন্নয়নের নামে নাগরিকদের উন্মুক্ত স্থান ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নষ্ট করা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি মানুষের জীবনমান ও পরিবেশকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান।

বিআইপি’র উপদেষ্টা পরিষদের আহ্বায়ক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, “আরবান কমন্স” সংরক্ষণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তিনি পরিকল্পনার অব্যবস্থাপনা দূর করে নগরের পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান ব্যবস্থাপনায় কার্যকর জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বিআইপি’র সদস্য ও সাবেক সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, পান্থকুঞ্জে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র‌্যাম্প নির্মাণের সিদ্ধান্ত কীভাবে গৃহীত হয়েছে, এ বিষয়ে যথাযথ সমীক্ষা ও পরামর্শ গ্রহণ করা হয়েছে কি না তা তদন্ত করা প্রয়োজন।

তিনি প্রকল্পটির পুনর্মূল্যায়ন এবং র‌্যাম্প নির্মাণের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার ও নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় গণআন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

গোলটেবিল বৈঠকের সভাপতি এবং বিআইপি’র সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান সমাপনী বক্তব্যে বলেন, এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য বিষয়টিকে গবেষণা ও প্রমাণভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে সামনে নিয়ে আসা।

তিনি ঘটনাপ্রবাহ, তথ্য-উপাত্ত ও প্রাসঙ্গিক নথি সংরক্ষণের জন্য একটি যৌথ প্রমাণভিত্তিক তথ্যসংকলন প্রণয়নের প্রস্তাব দেন এবং গবেষণা, জ্ঞান সৃজন, অ্যাডভোকেসি ও বিভিন্ন সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

পান্থকুঞ্জ প্রকল্পে পরিবেশ ও নাগরিক জীবনের ক্ষতির আশঙ্কা

সর্বশেষ আপডেট ০৬:০১:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

পান্থকুঞ্জ পার্ক এলাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে নগরের উন্মুক্ত স্থান, পরিবেশ ও নাগরিক জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে জানালেন বিশিষ্টজনেরা।

শনিবার (২৫ জুলাই ) সকাল সাড়ে ১০ টায় রাজধানীর প্ল্যানার্স টাওয়ারে বিআইপি কনফারেন্স হলে “পান্থকুঞ্জ পার্কঃ ফাইট ফর দ্য ‘আরবান কমন্স’ ইন ঢাকা” শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজনেরা এ মন্তব্য করেন।

আরবান স্টাডিজ ফাউন্ডেশন (ইউএসএফ) অ্যাওয়ার্ড ২০২৫-এর আওতায় পরিচালিত “দ্য ফাইভ সিটি মাস্টারক্লাস সিরিজ: অর্ডিনারি ইকোলজিস অব রিপেয়ার”-এর অংশ হিসেবে ইনটারডিসিপ্লিনারি সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব গ্লোবাল চেঞ্জ, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, বুয়েট, বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি), দুনিয়াদারি আর্কাইভ যৌথভাবে এ গোলটেবিল বৈঠকটি আয়োজন করে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসানের সঞ্চালনায় বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক আমিরুল রাজীব ও নাঈম উল হাসান মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

আমিরুল রাজীব তাঁর মূল প্রবন্ধে বলেন, ঢাকার বিভিন্ন বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজউক ও রিহ্যাবের ভূমিকা এবং সম্পৃক্ততা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
তাঁর মতে, আবাসন খাতের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার ফলে নাগরিক অধিকার ও পরিবেশগত বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ড্যাপ সংশোধনের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন পক্ষের প্রভাব পরিলক্ষিত হয় এবং গণমাধ্যমের একটি অংশও বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রভাবের কারণে জনগণের কাছে প্রকৃত তথ্য যথাযথভাবে পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হয়। তিনি দাবি করেন, পান্থকুঞ্জ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে প্রায় দুই হাজার গাছ অপসারণ করা হয়েছে, যার ফলে জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নাঈম উল হাসান উপস্থাপনার মাধ্যমে পান্থকুঞ্জ আন্দোলনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি ১৬৮ দিনব্যাপী আন্দোলনের আলোকচিত্র, নাগরিকদের সংগঠিত করার প্রক্রিয়া এবং আদালতে রিট দায়েরের বিষয় উপস্থাপন করেন। পাশাপাশি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সীমাবদ্ধতা, ঢাকা শহরের পরিকল্পনা অনুসরণ না করা, প্রকল্প ব্যয় সংক্রান্ত প্রশ্ন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে সাধারণ মানুষের প্রাণহানিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন।

মূল উপস্থাপনার পর শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় ঢাকার অপরিকল্পিত নগরায়ন, উন্মুক্ত স্থানের সংকট, দূষণ, ভূমিকম্পের সময় নিরাপদ আশ্রয়স্থলের অভাব এবং নগরবাসীর জীবনমানের অবনতির বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।

কাঁঠালবাগান এলাকার বাসিন্দা সাদমান সাকিব বলেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দাদের পর্যাপ্তভাবে অবহিত করা হয়নি।
তিনি উল্লেখ করেন, পান্থকুঞ্জ এলাকাটি স্থানীয়দের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্মুক্ত স্থান ছিল এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে এর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গুরুত্বসহকারে ভাবা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ বলেন, আদালত পরিবেশ সংরক্ষণের পক্ষে অবস্থান নিলেও আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তিনি পরিবেশ ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কার্যকর আইন প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলনের সদস্য মোহাইমিনুল বাশার রাজ বলেন, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় বহুমাত্রিক সমাধান, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষার প্রসার এবং তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। একই সংগঠনের

অপর এক সদস্য রাফিয়া মাহজাবীন বুশরা বলেন, দূষণের কারণে ঢাকা ক্রমেই বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। তিনি পরিবেশ রক্ষায় নাগরিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক সৈয়দা রত্না বলেন, অহিংস নাগরিক আন্দোলন কখনো ব্যর্থ হয় না। তিনি শিশুদের সুস্থ বিকাশে উন্মুক্ত মাঠের গুরুত্ব তুলে ধরে নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।

নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মতিন আবদুল্লাহ পরিবেশ ও নগর উন্নয়ন বিষয়ক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা আরও জোরদার করার আহ্বান জানান।

বিআইপি’র সাবেক সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ সৈয়দ শাহারিয়ার আমিন বলেন, একটি বাসযোগ্য নগরের জন্য উন্মুক্ত মাঠ, জলাধার ও উদ্যান অপরিহার্য। তিনি সুশাসন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলন ও আলাই কেন্দ্রের সদস্য আমিনা আনসারী নগরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় পার্ক ও উন্মুক্ত সবুজ স্থানের অপরিহার্যতা তুলে ধরেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলনের সদস্য শাহ নেওয়াজ সৈকত বলেন, জনসচেতনতা ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবেশ ও উন্মুক্ত স্থান পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

কাঁঠালবাগান এলাকার বাসিন্ধা এবং ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের শিক্ষার্থী সানজানা মারিয়া কবির নগরের দূষণ, যানজট এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব তুলে ধরে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান অনুসন্ধানের আহ্বান জানান।

পরিকল্পনাবিদ নিয়াজ রহমান বলেন, এ ধরনের সমস্যার অন্যতম কারণ পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও জবাবদিহিতার অভাব। তিনি পরিকল্পনা প্রণয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

লেখক ও চিন্তাবিদ ফিরোজ আহমেদ বলেন, পার্ক ও জলাধার ধ্বংসের জন্য জনগণের চেয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনাই বেশি দায়ী। এ বিষয়ে পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষকে আরও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।

বুয়েটের অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসীব চৌধুরী বলেন, বিদ্যমান আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে নগরের উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি জনস্বার্থভিত্তিক আইন ও নীতিমালার সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বেঙ্গল স্ট্রিমের স্থপতি ও কিউরেটর নিকলাউস গ্র্যাবার বলেন, বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য। তিনি স্থানীয় চাহিদা ও এলাকার বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে সমগ্র নগরব্যবস্থার জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান। একইসঙ্গে, তিনি নগর পরিকল্পনায় কমিউনিটি ও পাড়াভিত্তিক পরিকল্পনাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন।

পান্থকুঞ্জ প্রভাতী সংঘের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুদ্দিন তুহিন বলেন, উন্নয়নের নামে নাগরিকদের উন্মুক্ত স্থান ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নষ্ট করা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি মানুষের জীবনমান ও পরিবেশকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান।

বিআইপি’র উপদেষ্টা পরিষদের আহ্বায়ক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, “আরবান কমন্স” সংরক্ষণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তিনি পরিকল্পনার অব্যবস্থাপনা দূর করে নগরের পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান ব্যবস্থাপনায় কার্যকর জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বিআইপি’র সদস্য ও সাবেক সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, পান্থকুঞ্জে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র‌্যাম্প নির্মাণের সিদ্ধান্ত কীভাবে গৃহীত হয়েছে, এ বিষয়ে যথাযথ সমীক্ষা ও পরামর্শ গ্রহণ করা হয়েছে কি না তা তদন্ত করা প্রয়োজন।

তিনি প্রকল্পটির পুনর্মূল্যায়ন এবং র‌্যাম্প নির্মাণের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার ও নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় গণআন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

গোলটেবিল বৈঠকের সভাপতি এবং বিআইপি’র সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান সমাপনী বক্তব্যে বলেন, এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য বিষয়টিকে গবেষণা ও প্রমাণভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে সামনে নিয়ে আসা।

তিনি ঘটনাপ্রবাহ, তথ্য-উপাত্ত ও প্রাসঙ্গিক নথি সংরক্ষণের জন্য একটি যৌথ প্রমাণভিত্তিক তথ্যসংকলন প্রণয়নের প্রস্তাব দেন এবং গবেষণা, জ্ঞান সৃজন, অ্যাডভোকেসি ও বিভিন্ন সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।