নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ বর্তমানের ভরসা
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:২৯:১১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
- / 174
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থানার সোনারগাঁও গ্রামের নাফিসা আক্তার। ২০১৬ সাল থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করছেন।
নাফিসা আক্তারের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে রান্না করায় সময় কম লাগে।
ধোঁয়া মুক্ত পরিবেশে রান্না করার পাশাপাশি অনেকটা সময়ও বেঁচে যায়। এই সময়টাকে গরু ও হাঁস-মুরগির পালনে যেমন কাজে লাগাতে পারছি। তেমনি সবজি চাষ ধানের রোয়ার যত্ন করতে পারি।
নাফিসা আক্তারের দুই মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ে ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিংনিয়ারিংএর শিক্ষার্থী। মেজ মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পড়ছে। ছেলে এইচএসসি পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষা দিচ্ছে।
এভাবে সোলার এনার্জি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার তৃণমূল পর্যায়ের নারীর জীবনে পরিবর্তন এনেছে। এর ব্যবহারে নারীর গৃহস্থালি কাজের সময় সীমা কমিয়ে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নারীর ক্ষমতায়নের পথকে প্রশস্ত করছে।
গ্রামীণ নারীরা লাকড়ি দিয়ে মাটির চুলায় রান্না করতে গিয়ে ধোঁয়ার সম্মুখীন হতো। যা তার প্রজননস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। প্রতিটি পরিবারের নারীরা ঘরের কাজে সোলার এনার্জি ব্যবহার করলে তার রান্নাবান্নার জন্য সময়টা যেমন কমে যাচ্ছে তেমনি, এই সময়টাকে সে সন্তানদের লেখাপড়া, অর্থনৈতিক কমকান্ডেও কাজে লাগাতে পারছে। এর ফলে তার সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ বেড়েছে। নারীর ক্ষমতানের পথ প্রশস্ত হচ্ছে। সেসাথে বায়ুদুষণ, পানি দুষণ কমাতেও ভূমিকা রাখছে।
কিভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে জানালেন ময়মনসিংহের একটি বেসরকারি সংস্থা ন্যাফ (নুরালয় স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ফাউন্ডেশন) নির্বাহী পরিচালক সবুরা আসমা। তিনি বলেন, ময়মনসিংহ সদরের চরাঞ্চলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কয়েকটি সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। ময়মনসিংহ সদরে গুচ্ছ গ্রামে এই জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে ধোঁয়াবিহীন চুলায় নারীরা রান্না করতে পারছেন। শ্বাসকষ্ট রোগে নারীর আক্রান্ত হওয়ার আশংকা থাকে না। অনেকসময় সোলার প্যানেলে ক্রটি দেখা দেয়। নারীদের এ ব্যাপারে কারিগরী প্রশিক্ষণ দিলে তারা এই সম্পর্কে জ্ঞান অজন করতে পারবে।
তিনি আরো বলেন, অন্যদিকে প্রাকৃতিকভাবে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহার কম হয়। বিদ্যুৎ না থাকলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে হস্তশিল্পে নারী উদ্যোক্তা ও হস্তশিল্পীরা কাজ করতে পারছেন। মোবাইল চার্জ করতে পারছেন। ইন্টারনেট সুবিধার মাধ্যমে হস্তশিল্পের তথ্যের আদান-প্রদান করতে পারছেন। লাইট জ্বালিয়ে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া করতে পারছে। টেলিভিশন, ফ্রিজ চালানোর কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে নারীরা অথনৈতিক ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছেন।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, এটি শুধু পরিবেশের জন্যই নয়, জীবাশ্ম জ্বালানি নারীর স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ালে নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নীতিমালায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৪ হাজার ১০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ। গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর জন্যই মূলত এই উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়েছে। এই উৎপাদনের অর্ধেক অর্থাৎ ২ হাজার ২৭৭ মেগাওয়াট আসবে সৌরশক্তি থেকে। পানি ও বায়ুর ব্যবহার করে উৎপাদন হবে যথাক্রমে ১ হাজার ও ৫৯৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
দেশে ১০০ কোম্পানি ৫০০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদিত হচ্ছে । বর্তমানে, বাংলাদেশে ১৪৬টি পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং অন্যান্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৪ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে মাত্র ৭৭৬ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদিত হচ্ছে, যা সর্বমোট সক্ষমতার প্রায় ৩ শতাংশ।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিচালক (প্রকল্প) বনশ্রী মিত্র নিয়োগীর মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ন্যায্যতা নিশ্চিত করার জন্য নারীর ওপর বিনিয়োগে কোনো বিকল্প নেই । নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য নীতিমালা পর্যায়ে যেমন কাজ করতে হবে তেমনি তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের দক্ষতাও বাড়াতে হবে। সেসঙ্গে নারী শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে জ্বালানির রূপান্তর প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে। এতে একদিকে যেমন জেন্ডার সমতা নিশ্চিত হবে, তেমনি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে।
তৃণমূল পর্যায়ে গৃহস্থালি কাজে নারীর অংশগ্রহণ বেশি। শ্রম বাজারে কাঙ্খিত পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ কম। সময় বেঁচে যাবে। এনার্জি সেক্টরে বরাদ্দ বাড়িয়ে নারীদের গৃহস্থালি সেবা কাজের বোঝাটা কমানো যায়। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নারী নারীর অংশগ্রহণ একেবারেই নেই। একে নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
এনার্জি সেক্টরে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এনার্জির উপর নির্ভরশীল হলে সে এটাকে কাজে লাগাতে পারবে। সাসটেনেবিলিটি উৎপাদনের সাথে সে যুক্ত হতে পারবে। তার রোজগার হবে। অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবে। সন্ধ্যায় ঘরে আলো থাকলে, ফ্যান চললে তার সন্তানের লেখাপড়ায় ভূমিকা রাখতে পারবে। সোলারি প্যানেল থাকায় মোবাইল চার্জ করতে পারায় সকলের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। এর ফলে কম কার্বণ নিঃসরণ হবে।

নবায়নযোগ্য এনার্জি সেক্টরে জেন্ডার সংযুক্ত করলে এতে শুধু নারীরাই নয়, পুরুষরাও উপকৃত হবেন। পুরো পরিবার, সমাজ উপকৃত হবে। এর ফলে দেশ এগিয়ে যাবে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) এর চেয়ারম্যান মুনীরা সুলতানা, এনডিসি বলেন, ‘বৈশ্বিক পর্যায়ের তুলনায় বাংলাদেশ এখনও এই খাতে পিছিয়ে আছে। কৃষি ব্যবস্থা থেকে শুরু করে অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ স্বল্পতার কারণে কাজগুলো করা যাচ্ছে না। এজন্য সরকার এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছে। এখানে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে নারীদের ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে। শিক্ষা পদ্ধতির মধ্যে চেঞ্জ দরকার। নারীরা স্টেম শিক্ষায় খুব বেশি তাদের আগ্রহ দেখাচ্ছে না। শিক্ষা ও গ্রিন জবসের মধ্যে একটা সমন্বয় দরকার। দেশের পলিসি পর্যায়ে কোনও বৈষম্য নাই। আমরা সবাই অনেক কমিউনিটির সঙ্গে বসেছি। সবারই আসলে এই নীতিমালা ফলো করা উচিত। রিসোর্স এক্সেস করার ক্ষেত্রে নারীদের চ্যালেঞ্জ দেখা যায়। এখানে কাজ করার আছে।’
একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নারীদের অংশগ্রহণে তাদের প্রাধান্য দিতে হবে। এই খাতে বৈশ্বিক নারীদের কর্মসংস্থানের হার যখন ৩২ শতাংশ বাংলাদেশে এই হার ১০ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এই খাতে নারীদের প্রাধান্য দিতে হবে। স্টেম শিক্ষায় উদ্বুদ্ধকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে নারীদের। এছাড়াও এই খাতে নারীদের অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধিতে নেটওয়ার্ক তৈরি করা দরকার। স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে এই খাতে নারীদের ক্ষমতায়নে সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, একাডেমিয়া ও উন্নয়ন সংস্থার একসাথে সমন্বয়ে কাজ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে- নারী ছাড়া আমরা সমাজ চিন্তা করতে পারি না। নারী ছাড়া কোনো চেঞ্জ সম্ভব নয়।’




































