ঢাকা ০৬:৫৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দিল্লি সফর বাতিলের পর আদানির বিদ্যুতে ধাক্কা

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৫:৪৩:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 7

দিল্লি সফর বাতিলের পর আদানির বিদ্যুতে ধাক্কা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরদিনই ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে যায়। এতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে গিয়ে চলমান সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ঘটনাগুলোর সময়গত নৈকট্যকে কেন্দ্র করে নানা প্রশ্ন উঠলেও, এর সঙ্গে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কোনো সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে; এমন প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে ভারতে যাচ্ছেন না। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে তার অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি সফর বাতিল করেন।

এর পরদিনই জানা যায়, গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮০০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট কারিগরি সমস্যায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে কেন্দ্রটির উৎপাদন ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে। একই সময়ে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ঘাটতি ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া যায়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ব্রিকস সম্মেলনে তার অংশগ্রহণ হয়নি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন বলেও ঢাকা জানিয়েছে।

এদিকে আদানি পাওয়ারের পক্ষ থেকে গোড্ডা কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে আগে কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন এবং পরে কারিগরি ত্রুটির কথা বলা হয়েছে। ২ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ভারতীয় রেলপথে জট, লোডিং বিধিনিষেধ ও কয়লা পরিবহনে সমস্যার কারণে কেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ কমেছে। পরে কেন্দ্রের একটি ইউনিটের বয়লার-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে সেটি বন্ধ করা হয়।

পিডিবি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউনিটটির একটি ফিড ইউনিটে সমস্যা দেখা দেওয়ার পর অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে পড়ায় সেটি বন্ধ করতে হয়। মেরামতের আগে ইউনিটটি ঠান্ডা করার প্রয়োজন হয় এবং পুরোপুরি উৎপাদনে ফিরতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।

তবে আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার আগেই দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা চাপের মধ্যে ছিল। গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকটে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছিল না। ফলে গোড্ডা কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

২০১৭ সালের চুক্তি, দীর্ঘমেয়াদি দায়

আদানি পাওয়ারের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি হয় ২০১৭ সালে। কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট এবং দুটি ইউনিটের প্রতিটির সক্ষমতা ৮০০ মেগাওয়াট। আগের সরকারের সময়ে করা দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ এখনো কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ কিনছে।

চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি সংগ্রহ, উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখা এবং নির্ধারিত বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে কী ধরনের দায় রয়েছে, তা চুক্তির নির্দিষ্ট ধারা পর্যালোচনা করেই নির্ধারণ করা সম্ভব। সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশের কী ধরনের ক্ষতিপূরণ বা চুক্তিগত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই আদানি চুক্তির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। বিশেষ করে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং চুক্তির শর্তগুলো বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ; তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

আদানির ব্যাখ্যা কী?

আদানি পাওয়ারের দেওয়া ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গোড্ডা কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহের সমস্যা তৈরি হয়েছিল ভারতীয় রেলপথে পরিবহনসংক্রান্ত জটিলতার কারণে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, বিষয়টি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে এবং ভারতীয় রেলের সঙ্গে সমন্বয় করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।

এর কয়েক দিন পর উৎপাদন বাড়তে শুরু করলেও একটি ইউনিট বয়লার-সংক্রান্ত সমস্যায় বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইউনিটটি পুরোপুরি সচল করতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটি হওয়া অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। তবে আন্তঃদেশীয় দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ চুক্তির ক্ষেত্রে সরবরাহ ব্যাহত হলে তা কত দ্রুত সমাধান করা হচ্ছে এবং বাংলাদেশের ওপর প্রভাব কমাতে সরবরাহকারী কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

সময়ের মিলেই যত প্রশ্ন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আগস্ট থেকেই আলোচনা চলছিল। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন। সেপ্টেম্বরের শুরুতেও সফরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত ছিল।

১০ সেপ্টেম্বর স্পষ্ট হয়, তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন না। এর পরদিনই সামনে আসে গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার খবর। ফলে দুই ঘটনার সময়গত মিলকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তবে সময়ের এই মিলকে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য কোনো নথি বা নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় ভারত সরকার বা আদানি পাওয়ার ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়েছে।

অন্যদিকে, বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ঘাটতিও বড় কারণ। গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকটের কারণে আগে থেকেই জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছিল। ফলে আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি পড়েছে।

বিদ্যুৎ নিরাপত্তায় নির্ভরতার প্রশ্ন

বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থায় আমদানিনির্ভরতা বাড়ায় সরবরাহ নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একটি ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়ার কারণে সেখানে উৎপাদন ব্যাহত হলে জাতীয় গ্রিডে তার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।

এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতি পুরোনো একটি প্রশ্ন আবার সামনে এনেছে; দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা কি নির্দিষ্ট কয়েকটি আমদানি ও বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে? একই সঙ্গে বড় কোনো কেন্দ্রের উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হলে ঘাটতি সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত বিকল্প উৎপাদন সক্ষমতা বা ‘বাফার’ ব্যবস্থা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম এবং ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলমসহ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ এর আগে আদানি বিদ্যুৎ চুক্তির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

এখন যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন

গোড্ডা কেন্দ্রের ইউনিট বন্ধ হওয়ার প্রকৃত কারণ, মেরামতের অগ্রগতি এবং চুক্তিগত দায় সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন কেন দীর্ঘস্থায়ী হলো এবং সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশের কী ধরনের ক্ষতিপূরণ বা প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, তাও জানা দরকার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাজনৈতিক সময়ের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার উত্তর অনুমান বা রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে খুঁজে বের করা। কেন্দ্রটির উৎপাদন ডেটা, কয়লা সরবরাহের নথি, কারিগরি ত্রুটির প্রতিবেদন এবং বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির শর্ত পর্যালোচনা করলেই বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না; এমন প্রশ্ন উঠলেও, সেটি প্রমাণের জন্য আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। একইভাবে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটিকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করাও প্রমাণ ছাড়া ঠিক হবে না।

বিদ্যুৎ কোনো রাজনৈতিক অস্ত্র হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক ও জ্বালানি সম্পর্ক চুক্তির শর্ত, পারস্পরিক দায়বদ্ধতা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিল্লি যাবেন কি না, সেটি বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। আর আদানি পাওয়ার বাংলাদেশে কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে, সেটি নির্ধারিত হবে বাণিজ্যিক চুক্তি ও তার বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে।

তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো; আদানির বিদ্যুৎ কমার কারণ, চুক্তিগত দায় এবং বাংলাদেশের বিকল্প ব্যবস্থা সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা। ঘটনাটি যদি নিছক কারিগরি ত্রুটি হয়, তাহলে দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করাই প্রত্যাশিত। আর যদি চুক্তি বা সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো অনিয়ম কিংবা অন্য কোনো চাপের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে জাতীয় স্বার্থে তার যথাযথ তদন্ত ও প্রতিকার প্রয়োজন।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

দিল্লি সফর বাতিলের পর আদানির বিদ্যুতে ধাক্কা

সর্বশেষ আপডেট ০৫:৪৩:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরদিনই ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে যায়। এতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে গিয়ে চলমান সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ঘটনাগুলোর সময়গত নৈকট্যকে কেন্দ্র করে নানা প্রশ্ন উঠলেও, এর সঙ্গে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কোনো সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে; এমন প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে ভারতে যাচ্ছেন না। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে তার অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি সফর বাতিল করেন।

এর পরদিনই জানা যায়, গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮০০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট কারিগরি সমস্যায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে কেন্দ্রটির উৎপাদন ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে। একই সময়ে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ঘাটতি ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছানোর তথ্য পাওয়া যায়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ব্রিকস সম্মেলনে তার অংশগ্রহণ হয়নি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন বলেও ঢাকা জানিয়েছে।

এদিকে আদানি পাওয়ারের পক্ষ থেকে গোড্ডা কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে আগে কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন এবং পরে কারিগরি ত্রুটির কথা বলা হয়েছে। ২ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ভারতীয় রেলপথে জট, লোডিং বিধিনিষেধ ও কয়লা পরিবহনে সমস্যার কারণে কেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ কমেছে। পরে কেন্দ্রের একটি ইউনিটের বয়লার-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে সেটি বন্ধ করা হয়।

পিডিবি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউনিটটির একটি ফিড ইউনিটে সমস্যা দেখা দেওয়ার পর অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে পড়ায় সেটি বন্ধ করতে হয়। মেরামতের আগে ইউনিটটি ঠান্ডা করার প্রয়োজন হয় এবং পুরোপুরি উৎপাদনে ফিরতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।

তবে আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার আগেই দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা চাপের মধ্যে ছিল। গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকটে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছিল না। ফলে গোড্ডা কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

২০১৭ সালের চুক্তি, দীর্ঘমেয়াদি দায়

আদানি পাওয়ারের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি হয় ২০১৭ সালে। কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট এবং দুটি ইউনিটের প্রতিটির সক্ষমতা ৮০০ মেগাওয়াট। আগের সরকারের সময়ে করা দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ এখনো কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ কিনছে।

চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি সংগ্রহ, উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখা এবং নির্ধারিত বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে কী ধরনের দায় রয়েছে, তা চুক্তির নির্দিষ্ট ধারা পর্যালোচনা করেই নির্ধারণ করা সম্ভব। সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশের কী ধরনের ক্ষতিপূরণ বা চুক্তিগত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই আদানি চুক্তির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। বিশেষ করে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং চুক্তির শর্তগুলো বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ; তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

আদানির ব্যাখ্যা কী?

আদানি পাওয়ারের দেওয়া ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গোড্ডা কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহের সমস্যা তৈরি হয়েছিল ভারতীয় রেলপথে পরিবহনসংক্রান্ত জটিলতার কারণে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, বিষয়টি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে এবং ভারতীয় রেলের সঙ্গে সমন্বয় করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।

এর কয়েক দিন পর উৎপাদন বাড়তে শুরু করলেও একটি ইউনিট বয়লার-সংক্রান্ত সমস্যায় বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইউনিটটি পুরোপুরি সচল করতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটি হওয়া অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। তবে আন্তঃদেশীয় দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ চুক্তির ক্ষেত্রে সরবরাহ ব্যাহত হলে তা কত দ্রুত সমাধান করা হচ্ছে এবং বাংলাদেশের ওপর প্রভাব কমাতে সরবরাহকারী কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

সময়ের মিলেই যত প্রশ্ন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আগস্ট থেকেই আলোচনা চলছিল। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন। সেপ্টেম্বরের শুরুতেও সফরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত ছিল।

১০ সেপ্টেম্বর স্পষ্ট হয়, তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন না। এর পরদিনই সামনে আসে গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার খবর। ফলে দুই ঘটনার সময়গত মিলকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তবে সময়ের এই মিলকে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য কোনো নথি বা নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় ভারত সরকার বা আদানি পাওয়ার ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়েছে।

অন্যদিকে, বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ঘাটতিও বড় কারণ। গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকটের কারণে আগে থেকেই জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছিল। ফলে আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি পড়েছে।

বিদ্যুৎ নিরাপত্তায় নির্ভরতার প্রশ্ন

বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থায় আমদানিনির্ভরতা বাড়ায় সরবরাহ নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একটি ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়ার কারণে সেখানে উৎপাদন ব্যাহত হলে জাতীয় গ্রিডে তার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।

এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতি পুরোনো একটি প্রশ্ন আবার সামনে এনেছে; দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা কি নির্দিষ্ট কয়েকটি আমদানি ও বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে? একই সঙ্গে বড় কোনো কেন্দ্রের উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হলে ঘাটতি সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত বিকল্প উৎপাদন সক্ষমতা বা ‘বাফার’ ব্যবস্থা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম এবং ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলমসহ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ এর আগে আদানি বিদ্যুৎ চুক্তির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

এখন যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন

গোড্ডা কেন্দ্রের ইউনিট বন্ধ হওয়ার প্রকৃত কারণ, মেরামতের অগ্রগতি এবং চুক্তিগত দায় সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন কেন দীর্ঘস্থায়ী হলো এবং সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশের কী ধরনের ক্ষতিপূরণ বা প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, তাও জানা দরকার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাজনৈতিক সময়ের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার উত্তর অনুমান বা রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে খুঁজে বের করা। কেন্দ্রটির উৎপাদন ডেটা, কয়লা সরবরাহের নথি, কারিগরি ত্রুটির প্রতিবেদন এবং বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির শর্ত পর্যালোচনা করলেই বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না; এমন প্রশ্ন উঠলেও, সেটি প্রমাণের জন্য আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। একইভাবে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটিকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করাও প্রমাণ ছাড়া ঠিক হবে না।

বিদ্যুৎ কোনো রাজনৈতিক অস্ত্র হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক ও জ্বালানি সম্পর্ক চুক্তির শর্ত, পারস্পরিক দায়বদ্ধতা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিল্লি যাবেন কি না, সেটি বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। আর আদানি পাওয়ার বাংলাদেশে কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে, সেটি নির্ধারিত হবে বাণিজ্যিক চুক্তি ও তার বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে।

তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো; আদানির বিদ্যুৎ কমার কারণ, চুক্তিগত দায় এবং বাংলাদেশের বিকল্প ব্যবস্থা সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা। ঘটনাটি যদি নিছক কারিগরি ত্রুটি হয়, তাহলে দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করাই প্রত্যাশিত। আর যদি চুক্তি বা সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো অনিয়ম কিংবা অন্য কোনো চাপের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে জাতীয় স্বার্থে তার যথাযথ তদন্ত ও প্রতিকার প্রয়োজন।