ঢাকা ০৮:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি নির্ভর পরিবহন কমানোর আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৬:৩০:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
  • / 10

জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিতে জ্বালানি নির্ভর যানের ব্যবহার কমানো, জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ন্যায্য বন্টন, রাস্তার ডিজাইনে এবং পরিবহন পরিকল্পনায় আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা।

শনিবার ( ২৫ এপ্রিল ) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) উদ্যোগে “জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই পরিবহন ও যোগাযোগ” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন।

বিআইপি’র যুগ্ম সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ কাজী সালমান হোসেন এর সঞ্চালনায় রাজধানীর কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউয়ে প্ল্যানার্স টাওয়ারের বিআইপি কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান, পিএইচডি। সভাপতিত্ব করেন বিআইপি’র সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ইনস্টিটিউটের কোষাধ্যক্ষ পরিকল্পনাবিদ আবু ছালেহ মোঃ শহীদুল্লাহ, বোর্ড সদস্য পরিকল্পনাবিদ শুভ কান্তি পোদ্দারসহ অন্যান্য সদস্যবৃন্দ।

মূল প্রবন্ধে সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান, পিএইচডি তার মূল বক্তব্যে বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন, রেল এবং নৌপথকে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

তিনি বলেন, দেশের মোট কার্বন নিঃসরণের মধ্যে সর্বোচ্চ অংশ আসে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত থেকে, যার পরেই পরিবহন খাতের অবস্থান।

তিনি আরও উল্লেখ করে বলেন, “একটি মোটরগাড়ি উৎপাদনে যে পরিমাণ ধাতু ব্যবহৃত হয়, সেই একই পরিমাণ ধাতু দিয়ে প্রায় ১৫০টি সাইকেল তৈরি করা সম্ভব” যা পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে।

তিনি দেশের পরিবহন খাতে জ্বালানি ব্যবহারের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করার উপর গুরুত্বারোপ করেন এবং জরুরি ভিত্তিতে বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) চালু, সাইকেল শেয়ারিং প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং একটি জাতীয় নগর পরিবহন ফান্ড গঠনের প্রস্তাব দেন।

এছাড়াও তিনি ক্রমবর্ধমান মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, হাঁটা, অযান্ত্রিক যানবাহন এবং বৈদ্যুতিক বাসের জন্য উপযোগী অবকাঠামো উন্নয়ন ও নীতিমালার সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে বিআইপি পরিবেশবান্ধব, টেকসই জ্বালানি নির্ভর এবং গণপরিবহনমুখী পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিগত বছরগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরবাইকসহ মালামাল পরিবহনে সড়কপথের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে আমাদের পরিবহন ব্যবস্থা ক্রমেই জীবাশ্ম জ্বালানি তথা আমদানি নির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার যেমন সৌর বিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোতে দ্রুত নজর দেওয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে টেকসই এবং আমদানি নির্ভর জ্বালানির সংকট থেকে মুক্ত রাখতে সড়ক, রেল ও নৌপথের সমন্বয়ে একটি গণপরিবহনমুখী ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি পথচারী ও সাইকেলবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের টেকসই পরিবহন, দক্ষ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনার দিকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে হবে। এটাই একটি পরিকল্পিত, স্মার্ট এবং জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশের পথ।

বিআইপির জ্যেষ্ঠ পরিকল্পনাবিদ ও ফেলো সদস্য সৈয়দা মনিরা আক্তার খাতুন তার বক্তব্যে বলেন, ১৯৯২ সালে ঢাকার স্ট্রাকচার প্ল্যান প্রণয়নের সময় ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড ট্রান্সপোর্ট স্টাডি বা ডিআইটিএস শীর্ষক একটি গবেষণায় রাজধানীর ভবিষ্যৎ পরিবহন কাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে দুঃখজনকভাবে নব্বইয়ের দশকে প্রণীত ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যানের সঙ্গে উক্ত গবেষণার কোনো সমন্বয় করা হয়নি। এর ফলশ্রুতিতে বৈশ্বিক তেলের সংকট দেখা দিলেই দেশের পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।

বিআইপি বিভিন্ন মেয়াদভিত্তিক ৩০ টি যৌক্তিক প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছে।

পরিবহন পরিকল্পনা সংক্রান্ত-
১. মোটরসাইকেলের বৃদ্ধি রোধে এবং যাতায়াতে এর উপর নির্ভরতা কমাতে কঠোরতম পদক্ষেপ গ্রহণ।
২. ব্যাটারিচালিত বা ইলেকট্রিক ত্রিচক্রযানের চলাচল নিয়ন্ত্রণ।
৩. ব্যাটারিচালিত বা ইলেকট্রিক বাস বা মিনিবাস চালুর তড়িৎ পদক্ষেপ গ্রহণ।
৪. আমাদের সাইকেল ও বাসের ব্যবহার বাড়াতে বিপ্লবী পদক্ষেপ গ্রহণ।
৫. ক্ষেত্রবিশেষে অযান্ত্রিক রিকশার পরিকল্পিত ও সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বৃদ্ধি।
৬. অবিলম্বে ঢাকাসহ অন্যান্য প্রযোজ্য শহরে বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট ( বিআরটি) চালু করার ব্যবস্থা গ্রহণ।
৭. অন্যান্য প্রযোজ্য শহরে বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট ( বিআরটি) চালু করার ব্যবস্থা গ্রহণ।
৮. আন্তঃজেলা ও আন্তঃনগর যোগাযোগ এবং মালামাল পরিবহনে রেল ও নৌপথের ব্যবহার বৃদ্ধিতে বিপ্লবী পদক্ষেপ গ্রহণ।
৯. ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৯০টি অভ্যন্তরীণ ওয়ার্ডে মোট ১ লাখ সাইকেল অর্থাৎ প্রতিটি ওয়ার্ডে গড়ে ১ হাজার সাইকেল নিয়ে সাইকেল শেয়ারিং প্রকল্প চালুকরণ।
১০. এক বছরের মধ্যে অন্যান্য সিটি কর্পোরেশনগুলোতে সাইকেল শেয়ারিং স্কিমটি সম্প্রসারণ করা।
১১. BRTC এর মাধ্যমে অনতিবিলম্বে বাস আমদানি করে বড় শহর বা সিটি কর্পোরেশনে সরকারের নিয়ন্ত্রণে এবং স্থানীয় পরিবহন ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণে সিটি বাস চালুকরণ।
১২. জাতীয় নগর পরিবহন ফান্ড গঠন।
১৩. নগরে বাস পরিবহনে জাতীয় নগর পরিবহন ফান্ড হতে সরকারি বিনিয়োগ ও ভর্তুকি প্রদান।
১৪. জাতীয় নগর পরিবহন ফান্ড হতে স্কুল বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে ঋণ বা সহায়তা প্রদান করা, যাতে তারা বিআরটিসির মাধ্যমে আমদানি করা বাস বা মিনিবাস ভাড়া নিতে বা ব্যবহার করতে পারে।
১৫. বাস, মিনিবাস, ইলেকট্রিক বাস এবং গণপরিবহনের যন্ত্রাংশে ট্যাক্স হ্রাস এবং কার, মোটরসাইকেল ও এসবের যন্ত্রাংশে ট্যাক্স বৃদ্ধি করে প্রাপ্ত অতিরিক্ত অর্থ নগর পরিবহন ফান্ডে জমাকরণ।
১৬. যে কোনো স্কুলের গেটের ৫০ মিটারের মধ্যে গাড়ি পার্কিং নিষিদ্ধকরণ এবং সেখান থেকে বাচ্চাদের স্কুলে নেওয়ার জন্য স্কুল কর্তৃক বিশেষ ব্যক্তি নিয়োগ।
১৭. হাতিরঝিলের ন্যায় সম্ভাব্য প্রতিটি শহরের ভেতরে বা চারদিকে নৌ-ট্যাক্সি সার্ভিস চালুকরণ।
১৮. রেল ও নৌ পরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং তদারকির সক্ষমতা বৃদ্ধি।
১৯. শিল্প, কৃষি যেমন ফলমূল, কোরবানির গরু, ছাগলসহ এবং অন্যান্য মালামাল আমদানি, রপ্তানি ও বিপণনকারীদের এবং ট্রাক বা পরিবহন সার্ভিস প্রদানকারীদের দেশে তৈরি সহজবোধ্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সংযুক্ত করে খালি ট্রাকের যাত্রা এবং জ্বালানি তেল ব্যবহার কমানো এবং সেই সঙ্গে বিপণনকারীদের পরিবহন ব্যয় কমানোর ব্যবস্থা গ্রহণ।
২০. ন্যাশনাল ল্যান্ড ট্রান্সপোর্ট পলিসি ২০০৪ সহ অন্যান্য নীতি ও কৌশলের ভুল সংশোধন।
২১. জাতীয় ও স্থানিক পরিকল্পনাকে আমলে নিয়ে ন্যাশনাল মাল্টি মডেল ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান প্রণয়ন এবং এতে রোড সেক্টরের প্রাধান্য বা হিস্যা যৌক্তিকীকরণে পদক্ষেপ গ্রহণ।
২২. নগরে পরিবহন পরিকল্পনাকে অবকাঠামো নির্মাণ পরিকল্পনা না বানিয়ে মোবিলিটি মানেজমেন্ট এন্ড এক্সেসিবিলিটি ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান হিসেবে প্রণয়ন।
২৩. সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার প্রত্যেক ওয়ার্ডের নিজস্ব সাকুলেশন প্ল্যান প্রণয়ন।
২৪. নন মোটোরাইজড ট্রান্সপোট পলিসি, পেডেসট্রেইন অ্যাক্ট বাস ট্রান্সপোট রিফম অ্যাক্ট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।

স্থানিক/ নগর পরিকল্পনা সংক্রান্ত
২৫. রাস্তার ডিজাইনে পরিবর্তন করে পথচারী, অযান্ত্রিক বাহন (সাইকেল ও ক্ষেত্রবিশেষে অযান্ত্রিক রিকশা) এবং গণপরিবহনের জন্য আনুপাতিক হারে স্থান বা স্পেস বিন্যাস করে ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য কমিয়ে দিতে হবে।
২৬. এখনই এমআরটি ও বিআরটি স্টেশনের চতুর্পাশে ট্রান্সিট ওরিয়েন্টাল ডেভেলপমেন্ট (টিওডি) এর প্রকল্প নিতে হবে।
২৭. বড় রাস্তায় সিঙ্গাপুরের ন্যায় কংক্রিটের পরিবর্তে বড় এবং স্থানান্তরযোগ্য ড্রাম টব দিয়ে সহজে মিডিয়ান বা আইল্যান্ড বানিয়ে তাতে রাজশাহী শহরের ন্যায় বৃক্ষরোপণ।
২৮. খেলার মাঠসহ পর্যাপ্ত ভালো স্কুলের ব্যবস্থা করা, স্কুল ডিস্ট্রিক্টভিত্তিক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।
২৯. প্লটভিত্তিক নয়, ব্লকভিত্তিক পাড়া বা মহল্লা নির্মাণে ভবন নির্মাণ বিধিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন।
৩০. নগরে হাঁটার জন্য ফুটপাত নির্মাণসহ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

জ্বালানি নির্ভর পরিবহন কমানোর আহ্বান

সর্বশেষ আপডেট ০৬:৩০:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬

জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিতে জ্বালানি নির্ভর যানের ব্যবহার কমানো, জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ন্যায্য বন্টন, রাস্তার ডিজাইনে এবং পরিবহন পরিকল্পনায় আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা।

শনিবার ( ২৫ এপ্রিল ) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) উদ্যোগে “জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই পরিবহন ও যোগাযোগ” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন।

বিআইপি’র যুগ্ম সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ কাজী সালমান হোসেন এর সঞ্চালনায় রাজধানীর কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউয়ে প্ল্যানার্স টাওয়ারের বিআইপি কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান, পিএইচডি। সভাপতিত্ব করেন বিআইপি’র সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ইনস্টিটিউটের কোষাধ্যক্ষ পরিকল্পনাবিদ আবু ছালেহ মোঃ শহীদুল্লাহ, বোর্ড সদস্য পরিকল্পনাবিদ শুভ কান্তি পোদ্দারসহ অন্যান্য সদস্যবৃন্দ।

মূল প্রবন্ধে সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান, পিএইচডি তার মূল বক্তব্যে বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন, রেল এবং নৌপথকে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

তিনি বলেন, দেশের মোট কার্বন নিঃসরণের মধ্যে সর্বোচ্চ অংশ আসে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত থেকে, যার পরেই পরিবহন খাতের অবস্থান।

তিনি আরও উল্লেখ করে বলেন, “একটি মোটরগাড়ি উৎপাদনে যে পরিমাণ ধাতু ব্যবহৃত হয়, সেই একই পরিমাণ ধাতু দিয়ে প্রায় ১৫০টি সাইকেল তৈরি করা সম্ভব” যা পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে।

তিনি দেশের পরিবহন খাতে জ্বালানি ব্যবহারের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করার উপর গুরুত্বারোপ করেন এবং জরুরি ভিত্তিতে বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) চালু, সাইকেল শেয়ারিং প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং একটি জাতীয় নগর পরিবহন ফান্ড গঠনের প্রস্তাব দেন।

এছাড়াও তিনি ক্রমবর্ধমান মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, হাঁটা, অযান্ত্রিক যানবাহন এবং বৈদ্যুতিক বাসের জন্য উপযোগী অবকাঠামো উন্নয়ন ও নীতিমালার সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে বিআইপি পরিবেশবান্ধব, টেকসই জ্বালানি নির্ভর এবং গণপরিবহনমুখী পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিগত বছরগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরবাইকসহ মালামাল পরিবহনে সড়কপথের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে আমাদের পরিবহন ব্যবস্থা ক্রমেই জীবাশ্ম জ্বালানি তথা আমদানি নির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার যেমন সৌর বিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোতে দ্রুত নজর দেওয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে টেকসই এবং আমদানি নির্ভর জ্বালানির সংকট থেকে মুক্ত রাখতে সড়ক, রেল ও নৌপথের সমন্বয়ে একটি গণপরিবহনমুখী ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি পথচারী ও সাইকেলবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের টেকসই পরিবহন, দক্ষ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনার দিকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে হবে। এটাই একটি পরিকল্পিত, স্মার্ট এবং জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশের পথ।

বিআইপির জ্যেষ্ঠ পরিকল্পনাবিদ ও ফেলো সদস্য সৈয়দা মনিরা আক্তার খাতুন তার বক্তব্যে বলেন, ১৯৯২ সালে ঢাকার স্ট্রাকচার প্ল্যান প্রণয়নের সময় ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড ট্রান্সপোর্ট স্টাডি বা ডিআইটিএস শীর্ষক একটি গবেষণায় রাজধানীর ভবিষ্যৎ পরিবহন কাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে দুঃখজনকভাবে নব্বইয়ের দশকে প্রণীত ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যানের সঙ্গে উক্ত গবেষণার কোনো সমন্বয় করা হয়নি। এর ফলশ্রুতিতে বৈশ্বিক তেলের সংকট দেখা দিলেই দেশের পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।

বিআইপি বিভিন্ন মেয়াদভিত্তিক ৩০ টি যৌক্তিক প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছে।

পরিবহন পরিকল্পনা সংক্রান্ত-
১. মোটরসাইকেলের বৃদ্ধি রোধে এবং যাতায়াতে এর উপর নির্ভরতা কমাতে কঠোরতম পদক্ষেপ গ্রহণ।
২. ব্যাটারিচালিত বা ইলেকট্রিক ত্রিচক্রযানের চলাচল নিয়ন্ত্রণ।
৩. ব্যাটারিচালিত বা ইলেকট্রিক বাস বা মিনিবাস চালুর তড়িৎ পদক্ষেপ গ্রহণ।
৪. আমাদের সাইকেল ও বাসের ব্যবহার বাড়াতে বিপ্লবী পদক্ষেপ গ্রহণ।
৫. ক্ষেত্রবিশেষে অযান্ত্রিক রিকশার পরিকল্পিত ও সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বৃদ্ধি।
৬. অবিলম্বে ঢাকাসহ অন্যান্য প্রযোজ্য শহরে বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট ( বিআরটি) চালু করার ব্যবস্থা গ্রহণ।
৭. অন্যান্য প্রযোজ্য শহরে বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট ( বিআরটি) চালু করার ব্যবস্থা গ্রহণ।
৮. আন্তঃজেলা ও আন্তঃনগর যোগাযোগ এবং মালামাল পরিবহনে রেল ও নৌপথের ব্যবহার বৃদ্ধিতে বিপ্লবী পদক্ষেপ গ্রহণ।
৯. ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৯০টি অভ্যন্তরীণ ওয়ার্ডে মোট ১ লাখ সাইকেল অর্থাৎ প্রতিটি ওয়ার্ডে গড়ে ১ হাজার সাইকেল নিয়ে সাইকেল শেয়ারিং প্রকল্প চালুকরণ।
১০. এক বছরের মধ্যে অন্যান্য সিটি কর্পোরেশনগুলোতে সাইকেল শেয়ারিং স্কিমটি সম্প্রসারণ করা।
১১. BRTC এর মাধ্যমে অনতিবিলম্বে বাস আমদানি করে বড় শহর বা সিটি কর্পোরেশনে সরকারের নিয়ন্ত্রণে এবং স্থানীয় পরিবহন ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণে সিটি বাস চালুকরণ।
১২. জাতীয় নগর পরিবহন ফান্ড গঠন।
১৩. নগরে বাস পরিবহনে জাতীয় নগর পরিবহন ফান্ড হতে সরকারি বিনিয়োগ ও ভর্তুকি প্রদান।
১৪. জাতীয় নগর পরিবহন ফান্ড হতে স্কুল বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে ঋণ বা সহায়তা প্রদান করা, যাতে তারা বিআরটিসির মাধ্যমে আমদানি করা বাস বা মিনিবাস ভাড়া নিতে বা ব্যবহার করতে পারে।
১৫. বাস, মিনিবাস, ইলেকট্রিক বাস এবং গণপরিবহনের যন্ত্রাংশে ট্যাক্স হ্রাস এবং কার, মোটরসাইকেল ও এসবের যন্ত্রাংশে ট্যাক্স বৃদ্ধি করে প্রাপ্ত অতিরিক্ত অর্থ নগর পরিবহন ফান্ডে জমাকরণ।
১৬. যে কোনো স্কুলের গেটের ৫০ মিটারের মধ্যে গাড়ি পার্কিং নিষিদ্ধকরণ এবং সেখান থেকে বাচ্চাদের স্কুলে নেওয়ার জন্য স্কুল কর্তৃক বিশেষ ব্যক্তি নিয়োগ।
১৭. হাতিরঝিলের ন্যায় সম্ভাব্য প্রতিটি শহরের ভেতরে বা চারদিকে নৌ-ট্যাক্সি সার্ভিস চালুকরণ।
১৮. রেল ও নৌ পরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং তদারকির সক্ষমতা বৃদ্ধি।
১৯. শিল্প, কৃষি যেমন ফলমূল, কোরবানির গরু, ছাগলসহ এবং অন্যান্য মালামাল আমদানি, রপ্তানি ও বিপণনকারীদের এবং ট্রাক বা পরিবহন সার্ভিস প্রদানকারীদের দেশে তৈরি সহজবোধ্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সংযুক্ত করে খালি ট্রাকের যাত্রা এবং জ্বালানি তেল ব্যবহার কমানো এবং সেই সঙ্গে বিপণনকারীদের পরিবহন ব্যয় কমানোর ব্যবস্থা গ্রহণ।
২০. ন্যাশনাল ল্যান্ড ট্রান্সপোর্ট পলিসি ২০০৪ সহ অন্যান্য নীতি ও কৌশলের ভুল সংশোধন।
২১. জাতীয় ও স্থানিক পরিকল্পনাকে আমলে নিয়ে ন্যাশনাল মাল্টি মডেল ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান প্রণয়ন এবং এতে রোড সেক্টরের প্রাধান্য বা হিস্যা যৌক্তিকীকরণে পদক্ষেপ গ্রহণ।
২২. নগরে পরিবহন পরিকল্পনাকে অবকাঠামো নির্মাণ পরিকল্পনা না বানিয়ে মোবিলিটি মানেজমেন্ট এন্ড এক্সেসিবিলিটি ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান হিসেবে প্রণয়ন।
২৩. সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার প্রত্যেক ওয়ার্ডের নিজস্ব সাকুলেশন প্ল্যান প্রণয়ন।
২৪. নন মোটোরাইজড ট্রান্সপোট পলিসি, পেডেসট্রেইন অ্যাক্ট বাস ট্রান্সপোট রিফম অ্যাক্ট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।

স্থানিক/ নগর পরিকল্পনা সংক্রান্ত
২৫. রাস্তার ডিজাইনে পরিবর্তন করে পথচারী, অযান্ত্রিক বাহন (সাইকেল ও ক্ষেত্রবিশেষে অযান্ত্রিক রিকশা) এবং গণপরিবহনের জন্য আনুপাতিক হারে স্থান বা স্পেস বিন্যাস করে ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য কমিয়ে দিতে হবে।
২৬. এখনই এমআরটি ও বিআরটি স্টেশনের চতুর্পাশে ট্রান্সিট ওরিয়েন্টাল ডেভেলপমেন্ট (টিওডি) এর প্রকল্প নিতে হবে।
২৭. বড় রাস্তায় সিঙ্গাপুরের ন্যায় কংক্রিটের পরিবর্তে বড় এবং স্থানান্তরযোগ্য ড্রাম টব দিয়ে সহজে মিডিয়ান বা আইল্যান্ড বানিয়ে তাতে রাজশাহী শহরের ন্যায় বৃক্ষরোপণ।
২৮. খেলার মাঠসহ পর্যাপ্ত ভালো স্কুলের ব্যবস্থা করা, স্কুল ডিস্ট্রিক্টভিত্তিক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।
২৯. প্লটভিত্তিক নয়, ব্লকভিত্তিক পাড়া বা মহল্লা নির্মাণে ভবন নির্মাণ বিধিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন।
৩০. নগরে হাঁটার জন্য ফুটপাত নির্মাণসহ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ।