কর্মক্ষেত্রে ফিরতে নারীদের জন্য ব্র্যাকের ‘ব্রিজ রিটার্নশিপ’
- সর্বশেষ আপডেট ০৩:৫৫:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬
- / 128
পারিবারিক দায়িত্ব ও মাতৃত্বকালীন সময়ের কারণে বিপুলসংখ্যক পেশাজীবী নারী চাকরি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। বিভিন্ন গবেষণা ও আবেদনকারীদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭৫ শতাংশ নারী এই দুটি কারণে স্বেচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে কর্মজীবন থেকে বিরতি নিচ্ছেন। এছাড়া বিরূপ কর্মপরিবেশ, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং সামাজিক চাপও অনেক নারীর চাকরি ছাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। কর্মজীবন থেকে বিরতি নেওয়া এসব নারীদের আবার কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনতে ব্র্যাক পুনরায় শুরু করেছে তাদের ‘ব্রিজ রিটার্নশিপ’ কর্মসূচি।
এই উদ্যোগকে সামনে রেখে গত ৫ মার্চ বৃহস্পতিবার মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে ব্র্যাকের চিফ পিপল অ্যান্ড কালচার অফিসার মৌটুসী কবীর স্বাগত বক্তব্য দেন এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। এ সময় ব্র্যাকের আর্লি ক্যারিয়ার অ্যান্ড এমপ্লয়ার ব্র্যান্ড বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার নাজিবুল ইসলাম প্রিয়মসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আয়োজকরা জানান, এ বছরের ব্রিজ রিটার্নশিপ কর্মসূচিতে ১ হাজার ২০০ জনেরও বেশি নারী আবেদন করেন। সেখান থেকে কয়েক ধাপের বাছাই প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্তভাবে ২৪ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছে। নির্বাচিত অংশগ্রহণকারীরা আগামী ছয় মাস ব্র্যাকের বিভিন্ন কর্মসূচিতে কাজ করার সুযোগ পাবেন।

কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত নারীদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, নেতৃত্ব বিকাশ কর্মশালা এবং মেন্টরিংসহ বিভিন্ন পেশাগত প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং শীর্ষস্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে সহায়তা করা হবে, যাতে তারা নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজে নিতে পারেন।
অনুষ্ঠানে মৌটুসী কবীর বলেন, ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ একবার বলেছিলেন, “আমি আমার জীবনে কখনোই কোনো পরাজিত নারীকে দেখিনি।” এই বিশ্বাস থেকেই ব্র্যাক ব্রিজ রিটার্নশিপ কর্মসূচির সূচনা করেছে। তিনি বলেন, কর্মজীবন থেকে বিরতি নেওয়া কোনো দুর্বলতার বিষয় নয়। বরং একটি প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার থেকে সরে দাঁড়ানো অনেক বড় সিদ্ধান্ত এবং ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ। তাই প্রতিভাবান নারীদের আবারও কর্মজীবনে ফিরে এসে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করাই এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য।
অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, ব্রিজ রিটার্নশিপের লক্ষ্য হলো এমন নারীদের কর্মক্ষেত্রে পুনঃপ্রবেশে সহায়তা করা, যারা বিভিন্ন কারণে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা ব্র্যাকের বিভিন্ন প্রকল্পে তত্ত্বাবধান, গবেষণা এবং অন্যান্য কার্যক্রমে যুক্ত থাকবেন এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কাজ এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।
আবেদনকারীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চাকরি ছাড়ার ক্ষেত্রে ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ নারী পারিবারিক দায়িত্বকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে ৩৬ শতাংশ নারী মাতৃত্বকালীন সময়কে কর্মজীবন থেকে সরে যাওয়ার কারণ হিসেবে জানিয়েছেন। এছাড়া ব্যক্তিগত কারণ (১৮ দশমিক ৮ শতাংশ), উচ্চশিক্ষা গ্রহণ (১৪ দশমিক ৪ শতাংশ), বিরূপ কর্মপরিবেশ (৮ দশমিক ৫ শতাংশ) এবং সামাজিক চাপ (৪ দশমিক ৭ শতাংশ) উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
কর্মক্ষেত্রে ফেরার ক্ষেত্রে নারীদের প্রধান অনুপ্রেরণার মধ্যে রয়েছে ক্যারিয়ারে উন্নতি (৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ), আর্থিক স্বাধীনতা (৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ), নিজস্ব পরিচয় তৈরি (৬২ দশমিক ২ শতাংশ), আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি (৫৭ দশমিক ৭ শতাংশ) এবং পরিবারের জন্য অবদান রাখার ইচ্ছা (৪২ দশমিক ৭ শতাংশ)।
আবেদনকারীদের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ নারীর কর্মজীবনে বিরতির সময়কাল ছিল ১ থেকে ২ বছর, যা মোট আবেদনকারীর ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ। এছাড়া ৬ বছরের বেশি সময় কর্মক্ষেত্রের বাইরে ছিলেন ৬ দশমিক ৬ শতাংশ নারী। অন্যদিকে প্রায় ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ আবেদনকারীর পেশাগত অভিজ্ঞতা ছিল ৭ বছরের বেশি এবং ৫৮ শতাংশের অভিজ্ঞতা ছিল ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে।
অনুষ্ঠানে একটি প্যানেল আলোচনার আয়োজন করা হয়, যা সঞ্চালনা করেন জেন্ডার ইকুয়ালিটি কোয়ালিশনের কমিউনিকেশন ম্যানেজার সেমন্তী মঞ্জরী। এতে ব্রিজ রিটার্নশিপ কর্মসূচির মাধ্যমে ব্র্যাকে যোগ দেওয়া এলিজাবেথ মারান্ডী ও ফারাহ মাহবুব তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এছাড়া একাত্তর টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি শাহনাজ শারমিনও কর্মসূচি সম্পর্কে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন।
উল্লেখ্য, কর্মক্ষেত্র থেকে বিরতি নেওয়া নারীদের পুনরায় কর্মজীবনে ফিরিয়ে আনতে ব্র্যাক গত বছর প্রথমবারের মতো ব্রিজ রিটার্নশিপ কর্মসূচি চালু করে। তখন প্রায় ১ হাজার ১০০ আবেদনকারীর মধ্য থেকে ১৫ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছিল।
































