একুশে বইমেলা নিয়ে প্রকাশকদের দ্বন্ধ প্রকাশ্যে
- সর্বশেষ আপডেট ০৪:২১:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 283
অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর স্টল ভাড়ার ৫৫ শতাংশ মওকুফ ও আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা বাংলা একাডেমি ঘোষণা দিয়েছে। চলছে উদ্বোধনের প্রস্তুতি।
রবিবার এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি (বাপুস)-এর প্রতিনিধিরা ২০ ফেব্রুয়ারি বইমেলা উদ্বোধনে বাংলা একাডেমির সাথে সম্মতি জানিয়েছেন। অন্যদিকে তিন শতাধিক প্রকাশকদের নতুন প্লাটফর্ম ‘প্রকাশক ঐক্য’ চাইছে বইমেলা ঈদের পর আয়োজন করা হোক। এ বিষয়ে হবু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘হস্তক্ষেপ’ চেয়েছে প্রকাশক ঐক্য।
বিবৃতিতে সমিতির বইমেলা স্ট্যান্ডিং কমিটির আহবায়ক মো. আবুল বাশার ফিরোজ শেখ বলেন, আবারো বইমেলা পেছানো নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে। যদিও বাংলা একাডেমি থেকে প্রথিতযশা প্রকাশক ও রাজনৈতিকভাবে আচ্ছন্ন প্রকাশকদের বইমেলা কমিটিতে রাখা হয়েছে। এর ফলে এই মেলা নিয়ে পূর্বের মতভেদ পুনরায় চাঙ্গা হয়ে ওঠে। যেহেতু ইতোপূর্বে বাংলা একাডেমি একবার বইমেলা স্থগিত করেছিল, সেই আত্মবিশ্বাস থেকেই তারা এবার আওয়াজ তোলে মাহে রামজানের। পূর্বে যারা একুশের চেতনার কথা বলে প্রথম ঘোষিত সময়ের বিরোধিতা করেছিল সেইসব ব্যক্তিবর্গরাই এবার পবিত্র রমজানের গুরুত্ব ও সিয়াম সাধনার কারণ দেখিয়ে ঈদের পর বইমেলা করার জন্য চাপ দিচ্ছে। অবশ্য এবার তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে ২৫/৩০ জন প্যাভিলিয়ন প্রকাশক।
তিনি বলেন, সরকার অনুমোদিত ও নিয়ন্ত্রিত যে কোন ব্যবসায়ী সংগঠনের কাজ সরকারকে সহযোগিতা করা। সমিতির ব্যবসায়ীদের যেকোনো নায্য দাবি আলোচনার মাধ্যমে আদায় করা। সরকারের সাথে সাংঘর্ষিক অবস্থায় উপনীত হওয়া কোনো ব্যবসায়ী সংগঠনেরই উচিত নয় বলেই আমাদের বিশ্বাস।
আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি বলছে, আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি অমরআএকুশে বইমেলা উদ্বোধনের জন্য ৯০ শতাংশ প্রস্তুতি নেওয়া হয়ে গেছে।
বাপুস জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে পবিত্র রমজানকে কেন্দ্র করে ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’-কে এগিয়ে আনা বা পেছানো নিয়ে বাংলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি (বাপুস)-এর প্রতিনিধি, লেখক, সাংবাদিক, গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশকসহ রাষ্ট্রের বিশিষ্টজনদের নিয়ে গত বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে থেকে চলছে আলোচনা।
এদিকে গতবছরের ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি ২০২৬ এ বইমেলার সময় ঘোষণায় গুটিকয়েক প্রকাশক এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনসহ বিভিন্ন রেস্তোরায় মতবিনিমিয় সভা করেছেন। বইমেলা পেছানোর দাবিদার অংশের মেছবাউদ্দীন আহমদ (আহমদ পাবলিশিং হাউস), মো. মনিরুল হক (অন্যন্যা), হেলাল উদ্দিন (হাসি প্রকাশনী) ও মো. গফুর হোসেন (রিদম প্রকাশনা সংস্থা) একটি প্রতিনিধি দল ১৯ জানুয়ারি সমিতির বইমেলা স্ট্যান্ডিং কমিটির সাথে তাদের দাবির পক্ষে বাংলা একাডেমির মাধ্যমে সরকারকে মেলা পেছানোর আবেদন করে।
অথচ এর আগে তাদের সকলের একটাই দাবি ছিল, ‘অমর একুশে বইমেলা তার চেতনার মাস অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসেই হতে হবে। প্রয়োজনে ফেব্রুয়ারি মাসে তারিখ হেরফের হতে পারে কিন্তু ফেব্রুয়ারি স্পর্শ ব্যতীত একুশের বইমেলা হতে পারে না।’একারণে লেখক, সাংবাদিকসহ সমাজের অন্যান্য গুণীজনরাও ফেব্রুয়ারির মূল চেতনার বিবেচনায় তাদের সাথে একমত পোষণ করেন। ফেব্রুয়ারির চেতনা বিষয়টি নিয়ে পত্র-পত্রিকায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখা-লেখি ও আলোচিত হয়। প্রথিত যশা একজন প্রকাশক ‘চারদশকের বইমেলা’ শিরোনামে একটি নাতিদীর্ঘ স্মৃতিকথা লেখেন ‘ফেসবুকে’। এরপর সকলেই রমজানের মধ্যে বইমেলা অনুষ্ঠানে কোনো বাধা নেই মর্মে লেখালেখি করেন ফেসবুকে, যা দৈনিক পত্রিকাগুলোতেও আলোচিত হয়। কিন্তু এখন তারা অন্য সুর গাইছেন।
এর আগে বইমেলার পরবর্তী তারিখ ঘোষণা ছাড়াই বাংলা একাডেমি বইমেলা স্থগিত করেন। যদিও বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির প্রতিনিধি ও অন্যান্য প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করে বইমেলার তারিখ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু কারো সাথে আলোচনা ছাড়াই স্থগিত করা হয়।
একটি মহল যেকোনো ছুঁতোয় বইমেলা আয়োজনকে ব্যহত করে বর্তমান সরকার ও অর্ন্তগত সরকারকে ব্যর্থ ও বিব্রত করতে চায়। এই শংকা থেকেই উদীচীসহ অন্যান্য বেশ কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠনকে সমিতির কার্যালয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয় বইমেলা বিষয়ে আলোচনা করতে। এরপর গঠন করা হয় ‘একুশে বইমেলা সংগ্রাম পরিষদ’। এই পরিষদের যুগ্ম-আহবায়ক হন গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য-র আহবায়ক মফিজুর রহমান লাল্টু ও সমিতির বইমেলা স্ট্যান্ডিং কমিটির আহবায়ক মো. আবুল বাশার ফিরোজ শেখ।
‘একুশে বইমেলা সংগ্রাম পরিষদ’-এর ব্যানারে বেশ কিছু কার্যক্রমের কারণে দেশব্যপী একুশে বইমেলার পক্ষে জনমত তৈরি হয়। ফলে বাংলা একাডেমি, বাপুসের প্রতিনিধি, প্রকাশক, সাংবাদিক, লেখক ও অন্যান্য ব্যক্তিবর্গের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন- নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বইমেলার সময় ঘোষণা করা হবে। নির্বাচনে তফসিল ঘোষণার পর বাংলা একাডেমি বইমেলা কমিটি গঠন করে।
বাপুসের বইমেলা আহবায়ক ও সদস্য সচিব মৌখিকভাবে দুটি দাবি করেন (এক) প্রকাশক প্রতিনিধি বাড়িয়ে ১৫ জন করা। (দুই) বাপুসের মাধ্যমে প্রকাশক প্রতিনিধি নিতে হবে। কিন্তু বাংলা একাডেমি তা না করে সমিতির সমান্তরালে কতিপয় সম্মানিত প্রকাশককে মেলা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে।
গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ বুধবার বিকেল ৫টায় বাংলা একাডেমির শহিদ মুনীর চৌধুরী সভাকক্ষে অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর তারিখ নির্ধারণ সংক্রান্ত এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মফিদুর রহমান, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম, বাংলা একাডেমির পরিচালকবৃন্দ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ, প্রকাশক প্রতিনিধিবৃন্দ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধি। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর উদ্বোধনের সময় আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সকাল ১১টায় নির্ধারণ করা হয়। অমর একুশে বইমেলা চলবে ১৫ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত । প্রকাশক প্রতিনিধি হিসেবে সভায় উপস্থিতি ছিলেন : আরিফুর রহমান নাইম (ঐতিহ্য), সাঈদবারী (সূচীপত্র), মো: জহির দীপ্তি (ইতি প্রকাশন), আহমদ রফিক (সিয়ান পাবলিকেশন লি.), মো. আবুল বাশার ফিরোজ শেখ (ধ্রুবপদ), রাজ্জাক রুবেল (গ্রন্থিক), মাহাবুব রাহমান (আদর্শ), দেওয়ান মাহমুদুল ইসলাম (রাহনুমা প্রকাশনী)।
সমিতির সদস্য-অসদস্য সৃজনশীল প্রকাশক বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশক অংশ না নেওয়া প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিকভাবে আচ্ছন্ন প্রকাশকদের প্রথম দাবি ছিল ঈদের পর বইমেলা অনুষ্ঠান করা বা পবিত্র রমজানে তারা বইমেলা চান না। এমন এক অবস্থায় ১৯ জানুয়ারি আমরা বাংলা একাডেমির মাধ্যমে সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা কে অনুরোধ করি বইমেলার স্টল ও প্যাভিলিয়নের ভাড়া কমাতে । এর ফলে ৫৫ শতাংশ ভাড়া কমানো হয়, যা বাংলা একাডেমির ইতিহাসে প্রথম।






























