২২ বছর পরও একুশ আগস্টের ক্ষত
- সর্বশেষ আপডেট ০২:৪৫:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬
- / 149
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের ২৪ নেতাকর্মী নিহত হন। আহত হন তিন শতাধিক মানুষ। ঘটনার ২২ বছর পরও সেই হামলার বিচার ও প্রকৃত দায়ীদের নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
হামলার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি মামলা করে। এজাহারে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই ওই হামলা চালানো হয়েছিল। হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেড পাকিস্তান থেকে আনা হয়েছিল বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে মামলাটির নতুন করে তদন্ত শুরু হয়। তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ১১ জুন সিআইডির তৎকালীন এএসপি ফজলুল কবীর দুটি মামলায় অভিযোগপত্র দেন। এতে বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই তাজউদ্দিন এবং হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়।
পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। ২০১১ সালের ৩ জুলাই তারেক রহমানসহ আরও ৩০ জনকে আসামি করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এতে মামলার মোট আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২ জনে। পরে বিভিন্ন মামলায় কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় এ মামলায় আসামির সংখ্যা কমে ৪৯ জনে দাঁড়ায়।
২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর এ মামলায় রায় ঘোষণা করেন ঢাকার বিচারিক আদালত। রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন এবং ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রায়ের পর দণ্ডিত আসামিদের মধ্যে কারাগারে থাকা ব্যক্তিরা হাইকোর্টে আপিল করেন। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সাজা অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্সও হাইকোর্টে পাঠানো হয়।
তবে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ আসামিদের আপিল মঞ্জুর করে সবাইকে খালাস দেন এবং মৃত্যুদণ্ডের ডেথ রেফারেন্স খারিজ করেন। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, মামলার বিচারিক আদালতের রায় দুর্বল ও শ্রুত সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছিল। কে গ্রেনেড ছুড়েছেন, সে বিষয়ে সাক্ষীরা সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
হাইকোর্ট আরও বলেন, মামলাটির পুনঃতদন্তের আদেশ আইনগত কর্তৃত্বের বাইরে ছিল এবং সেই তদন্তের ভিত্তিতে দেওয়া সম্পূরক অভিযোগপত্রও আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। আদালতের মতে, কোনো আসামিকে শুধু একটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে দণ্ড দেওয়া যায় না, বিশেষ করে সেই জবানবন্দি পরে প্রত্যাহার করা হলে।
২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাকে দেশের ইতিহাসের একটি জঘন্য ও মর্মান্তিক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন। নিহতদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ঘটনার স্বাধীন ও সঠিক তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়।
তবে পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের ওই অংশ বাদ দেন।
মামলার সর্বশেষ পরিণতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে মামলার আসামিরা নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। কিন্তু হামলার প্রকৃত জড়িতদের শনাক্ত ও বিচারের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা না থাকায় নিহত ও আহতদের পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে আইনজীবী শিশির মনিরের মতে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা পরিচালনা করলে শেষ পর্যন্ত বিচারপ্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার ভাষ্য, ক্ষমতায় থাকা সরকার নিজেদের মতো করে মামলা পরিচালনা করলে পরবর্তী সময়ে প্রকৃত বিচার পাওয়ার পথ কঠিন হয়ে পড়ে।
২০০৪ সালের সেই ভয়াবহ হামলার ২২ বছর পেরিয়ে গেলেও ঘটনার প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা এবং নিহত-আহতদের পরিবারের প্রত্যাশিত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।






























