ঢাকা ০১:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২৬ বছরের মধ্যে ডেঙ্গু সংক্রমণ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ১২:১৫:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
  • / 21

২৬ বছরের মধ্যে ডেঙ্গু সংক্রমণ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি বছরের প্রথম সাড়ে ৯ মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা এক লাখ ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে। ২০০০ সালে রোগটির তথ্য সংরক্ষণ শুরুর পর সংক্রমণের হিসাবে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫৭ জন। মৃত্যুর হিসাবে গত ২৬ বছরের মধ্যে এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই পরিসংখ্যানে কেবল হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া, পরীক্ষা না করানো কিংবা হাসপাতালের বাইরে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের হিসাব এতে নেই। ফলে দেশে ডেঙ্গুর প্রকৃত সংক্রমণ আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এর আগে ২০২৩ সালে দেশে সর্বোচ্চ তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই বছর মৃত্যু হয় এক হাজার ৭০৫ জনের। মৃত্যুর হিসাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছিল ২০২৪ সাল, যখন ডেঙ্গুতে প্রাণ হারান ৫৭৫ জন। ওই বছর হাসপাতালে ভর্তি হন এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন। ২০২৫ সালে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল এক লাখ দুই হাজার ৮৬১, আর মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোনো ঘাটতি রাখা হচ্ছে না। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর উদ্যোগের অভাব এবং মশক নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দুর্বলতার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৩৬৬ জন।

মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন

দীর্ঘদিন ধরে মশার ওষুধ ছিটানো ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো হলেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় প্রচলিত কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ডেঙ্গু প্রিভেনশন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের (ডিপিএফবি) সাধারণ সম্পাদক ও জাপানের ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স টোকিওর গবেষক ডা. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ খান বলেন, মশা নিধনের কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে লোকদেখানো কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। শুধু ওষুধ ছিটিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে সেখানে কার্যকরভাবে লার্ভা ধ্বংস করতে হবে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। সরকার কাজ করলেও জনগণকে সচেতন করে প্রতিরোধ কার্যক্রমে যুক্ত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।

ডা. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ খান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও ‘স্কুল অ্যাম্বাসাডর’ কার্যক্রম চালুর পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজে ডেঙ্গু প্রতিরোধের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, মশক নিধন আর এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ এক বিষয় নয়। প্রচলিত কর্মসূচিতে পরিবর্তন এনে প্রজননস্থল শনাক্তকরণ, লার্ভা ধ্বংস এবং নিয়মিত তদারকির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। উড়ন্ত মশা মারার পাশাপাশি বংশবিস্তার বন্ধ করতে পারলেই কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো এলাকায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়লে তা পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন। তবে পরিকল্পিত মশক নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, প্রজননস্থল ধ্বংস এবং কার্যকর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

জলবায়ু পরিবর্তনে বদলাচ্ছে সংক্রমণের ধরন

একসময় বর্ষাকালকে ডেঙ্গুর প্রধান মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সাধারণত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সংক্রমণ বেশি দেখা যেত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বছরের অন্যান্য সময়েও ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। ফলে শুধু বর্ষাকাল সামনে রেখে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা, বৃষ্টি ও আর্দ্রতার ধরন বদলে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। ফলে এডিস মশার বিস্তার ও ডেঙ্গু সংক্রমণের ধরনে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের কৌশল নতুন করে সাজাতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রশমন ও অভিযোজন; দুটি পদ্ধতি রয়েছে। মশক নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষে বড় পরিসরে প্রশমন কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হলেও অভিযোজনের মাধ্যমে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।

কবিরুল বাশারের মতে, পরিবেশ ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে এডিস মশার আচরণে যেসব পরিবর্তন ঘটছে, তা শনাক্ত করে সেই অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

রাজধানীর বাইরেও বাড়ছে রোগীর চাপ

ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখন শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে দুজন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালের রোগী। বরিশাল সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় দুজন এবং রংপুর সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় একজনের মৃত্যু হয়েছে।

একই সময়ে নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ১১০ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ১১৩ জন ভর্তি হয়েছেন। ঢাকার দুই সিটির বাইরে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪১৫ জন।

এ ছাড়া বরিশালে ১৯১, চট্টগ্রামে ১০৫, খুলনায় ১৪১, ময়মনসিংহে ৮০, রাজশাহীতে ১২৮, রংপুরে ৭২ এবং সিলেটে ১১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

রোগীর এই বিস্তৃত ভৌগোলিক উপস্থিতি বলছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নজরদারি জোরদার এবং চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

হটস্পট চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি সরকারের

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, অধিকাংশ রোগী অসুস্থ হওয়ার তিন দিন বা তারও পরে হাসপাতালে এসেছেন।

তিনি বলেন, ডেঙ্গুর হটস্পট চিহ্নিত করে মশার লার্ভা ধ্বংস ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এ কাজে সিটি করপোরেশনগুলোও যুক্ত রয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ঠিকানা যাচাই করে যেসব এলাকা থেকে বেশি রোগী আসছেন, সেসব এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও লার্ভিসাইড প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের চেষ্টায় কোনো ঘাটতি নেই। এ বিষয়ে প্রতি সপ্তাহে মেয়র ও প্রশাসকদের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বৈঠক করছেন। সবাই মিলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছেন।

তবে সংক্রমণ ও মৃত্যুর উচ্চ হার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি প্রজননস্থল ধ্বংস, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বছরজুড়ে পরিকল্পিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন না করলে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমানো কঠিন হবে।

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

২৬ বছরের মধ্যে ডেঙ্গু সংক্রমণ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ

সর্বশেষ আপডেট ১২:১৫:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি বছরের প্রথম সাড়ে ৯ মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা এক লাখ ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে। ২০০০ সালে রোগটির তথ্য সংরক্ষণ শুরুর পর সংক্রমণের হিসাবে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫৭ জন। মৃত্যুর হিসাবে গত ২৬ বছরের মধ্যে এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই পরিসংখ্যানে কেবল হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া, পরীক্ষা না করানো কিংবা হাসপাতালের বাইরে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের হিসাব এতে নেই। ফলে দেশে ডেঙ্গুর প্রকৃত সংক্রমণ আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এর আগে ২০২৩ সালে দেশে সর্বোচ্চ তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই বছর মৃত্যু হয় এক হাজার ৭০৫ জনের। মৃত্যুর হিসাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছিল ২০২৪ সাল, যখন ডেঙ্গুতে প্রাণ হারান ৫৭৫ জন। ওই বছর হাসপাতালে ভর্তি হন এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন। ২০২৫ সালে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল এক লাখ দুই হাজার ৮৬১, আর মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কোনো ঘাটতি রাখা হচ্ছে না। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর উদ্যোগের অভাব এবং মশক নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দুর্বলতার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৩৬৬ জন।

মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন

দীর্ঘদিন ধরে মশার ওষুধ ছিটানো ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো হলেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় প্রচলিত কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ডেঙ্গু প্রিভেনশন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের (ডিপিএফবি) সাধারণ সম্পাদক ও জাপানের ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স টোকিওর গবেষক ডা. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ খান বলেন, মশা নিধনের কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে লোকদেখানো কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। শুধু ওষুধ ছিটিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে সেখানে কার্যকরভাবে লার্ভা ধ্বংস করতে হবে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, সাধারণ মানুষকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। সরকার কাজ করলেও জনগণকে সচেতন করে প্রতিরোধ কার্যক্রমে যুক্ত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।

ডা. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ খান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও ‘স্কুল অ্যাম্বাসাডর’ কার্যক্রম চালুর পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজে ডেঙ্গু প্রতিরোধের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, মশক নিধন আর এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ এক বিষয় নয়। প্রচলিত কর্মসূচিতে পরিবর্তন এনে প্রজননস্থল শনাক্তকরণ, লার্ভা ধ্বংস এবং নিয়মিত তদারকির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। উড়ন্ত মশা মারার পাশাপাশি বংশবিস্তার বন্ধ করতে পারলেই কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো এলাকায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়লে তা পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন। তবে পরিকল্পিত মশক নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, প্রজননস্থল ধ্বংস এবং কার্যকর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

জলবায়ু পরিবর্তনে বদলাচ্ছে সংক্রমণের ধরন

একসময় বর্ষাকালকে ডেঙ্গুর প্রধান মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সাধারণত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সংক্রমণ বেশি দেখা যেত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বছরের অন্যান্য সময়েও ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। ফলে শুধু বর্ষাকাল সামনে রেখে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা, বৃষ্টি ও আর্দ্রতার ধরন বদলে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। ফলে এডিস মশার বিস্তার ও ডেঙ্গু সংক্রমণের ধরনে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের কৌশল নতুন করে সাজাতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রশমন ও অভিযোজন; দুটি পদ্ধতি রয়েছে। মশক নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষে বড় পরিসরে প্রশমন কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হলেও অভিযোজনের মাধ্যমে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।

কবিরুল বাশারের মতে, পরিবেশ ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে এডিস মশার আচরণে যেসব পরিবর্তন ঘটছে, তা শনাক্ত করে সেই অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

রাজধানীর বাইরেও বাড়ছে রোগীর চাপ

ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখন শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে দুজন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালের রোগী। বরিশাল সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় দুজন এবং রংপুর সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় একজনের মৃত্যু হয়েছে।

একই সময়ে নতুন ভর্তি রোগীদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ১১০ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ১১৩ জন ভর্তি হয়েছেন। ঢাকার দুই সিটির বাইরে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪১৫ জন।

এ ছাড়া বরিশালে ১৯১, চট্টগ্রামে ১০৫, খুলনায় ১৪১, ময়মনসিংহে ৮০, রাজশাহীতে ১২৮, রংপুরে ৭২ এবং সিলেটে ১১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

রোগীর এই বিস্তৃত ভৌগোলিক উপস্থিতি বলছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নজরদারি জোরদার এবং চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

হটস্পট চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি সরকারের

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, অধিকাংশ রোগী অসুস্থ হওয়ার তিন দিন বা তারও পরে হাসপাতালে এসেছেন।

তিনি বলেন, ডেঙ্গুর হটস্পট চিহ্নিত করে মশার লার্ভা ধ্বংস ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এ কাজে সিটি করপোরেশনগুলোও যুক্ত রয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ঠিকানা যাচাই করে যেসব এলাকা থেকে বেশি রোগী আসছেন, সেসব এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও লার্ভিসাইড প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের চেষ্টায় কোনো ঘাটতি নেই। এ বিষয়ে প্রতি সপ্তাহে মেয়র ও প্রশাসকদের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বৈঠক করছেন। সবাই মিলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছেন।

তবে সংক্রমণ ও মৃত্যুর উচ্চ হার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি প্রজননস্থল ধ্বংস, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বছরজুড়ে পরিকল্পিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন না করলে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমানো কঠিন হবে।