ঢাকা ১০:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অবসরের সঞ্চয়েও প্রতারণার থাবা

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৮:৪২:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 17

অবসরের সঞ্চয়েও প্রতারণার থাবা

চাকরিজীবনের দীর্ঘ সময় পার করে অবসরে গিয়ে পাওয়া সঞ্চয়ের টাকা নিরাপদে বিনিয়োগ করে বাকি জীবনটা একটু স্বস্তিতে কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। কেউ চেয়েছিলেন অবসরের থোক টাকা থেকে নিয়মিত আয় করতে, কেউ আবার বাড়তি মুনাফার আশায় পরিচিতজনের কথায় বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে।

ফেসবুকে পরিচয়ের পর অনলাইন বিনিয়োগের প্রলোভন, পরিচিতজনের মাধ্যমে ব্যবসায়িক মুনাফার আশ্বাস কিংবা কৃষি প্রকল্পে মাসিক লাভের প্রতিশ্রুতি; প্রতারণার কৌশল ভিন্ন হলেও লক্ষ্য একটাই, মানুষের সঞ্চিত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।

সাম্প্রতিক তিনটি ঘটনায় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ও মামলার তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।

এর মধ্যে একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি অনলাইন বিনিয়োগের ফাঁদে পড়ে হারিয়েছেন ৫০ লাখ ৬৭ হাজার ৩১০ টাকা।

আরেক ঘটনায় ৮৩ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত এক সেনাকর্মকর্তার অভিযোগ, ব্যবসায়িক মুনাফার আশ্বাসে তাঁর কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ১০ কোটি ৪১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে, ‘নাজরান ফিশারীজ অ্যান্ড এগ্রো প্রজেক্ট’-এর নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সংস্থাটির তদন্তে প্রকল্পটির চারটি ব্যাংক হিসাবে বিভিন্ন ভুক্তভোগীর প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতারণার পরিমাণ আরও বেশি।

ফেসবুকে পরিচয়, এরপর বিনিয়োগের প্রলোভন

২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর ফেসবুকের মাধ্যমে আনিশা রহমান নামে এক নারীর সঙ্গে পরিচয় হয় অবসরপ্রাপ্ত মো. আমিনুর রহমানের (৬০)। অবসরের পর পাওয়া থোক টাকা কোথাও বিনিয়োগ করে লাভবান হওয়ার কথা ভাবছিলেন তিনি। এই সুযোগেই আনিশা তাঁকে bgecapitase.com নামের একটি ওয়েবসাইটে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন। ওই নারী নিজেও সেখানে বিনিয়োগ করে লাভবান হয়েছেন বলে আমিনুরকে জানান।

প্রথমে রাজি না হলেও বারবার লাভের কথা বলে তাঁকে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করা হয়। একপর্যায়ে তিনি বিনিয়োগে রাজি হন।

২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে রাজধানীর রমনা মডেল থানাধীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সোনালী ব্যাংক শাখায় অবস্থানকালে ওই ওয়েবসাইটে একটি অ্যাকাউন্ট খোলেন আমিনুর।

প্রথমে বিকাশের মাধ্যমে ৩৬ হাজার ৬২০ টাকা জমা দেন তিনি। এরপর তাঁর অনলাইন অ্যাকাউন্টে ৫ হাজার ৪০০ টাকা লাভ দেখানো হয়। অর্থাৎ, বিনিয়োগের বিপরীতে মোট ৪২ হাজার ২০ টাকা স্থিতি দেখানো হয়। শুরুতেই লাভ দেখিয়ে আস্থা অর্জন করাই যেন ছিল প্রতারকদের কৌশল।

এরপর ওয়েবসাইটের কাস্টমার সার্ভিসের নির্দেশনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠাতে থাকেন আমিনুর। পরবর্তী প্রায় তিন মাসে তিনি মোট ৫০ লাখ ৬৭ হাজার ৩১০ টাকা বিনিয়োগ করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করেছেন।

পরে তিনি বুঝতে পারেন, অনলাইনে যে লাভের হিসাব দেখানো হচ্ছিল, তা ছিল তাঁকে আরও বেশি টাকা বিনিয়োগে উৎসাহিত করার কৌশল।

এ ঘটনায় আনিশা রহমান, তাঁর ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর এবং ওয়েবসাইট পরিচালনাকারী ও তাঁদের সহযোগী দেশি-বিদেশি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থানায় এজাহার দিয়েছেন আমিনুর রহমান।

অবসর জীবনের নিরাপত্তার জন্য সঞ্চয় করে রাখা অর্থ হারিয়ে এখন প্রতিকার চাইছেন তিনি।

পূর্বপরিচিত হওয়ার সুযোগ

আরেক ঘটনায় পূর্বপরিচিতির বিশ্বাসকে পুঁজি করে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে তানভীর রায়হান রিজভী ও তাঁর ভাই জহির রায়হানের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ অনুযায়ী, পারিবারিকভাবে পূর্বপরিচিত হওয়ার সুযোগ নিয়ে ২০২০ সালে অবসরপ্রাপ্ত মেজর এম আনিসুর রহমানের (৮৩) কাছ থেকে চুক্তির ভিত্তিতে বার্ষিক মুনাফার আশ্বাসে ৭ কোটি ৮১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা বিনিয়োগ হিসেবে নেন তানভীর রায়হান রিজভী।

পরবর্তীতে ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পণ্য আমদানির কথা বলেও আরও কয়েক কোটি টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রাথমিক মূলধনের কিছু অংশ বা স্বল্পমেয়াদি লেনদেনের অর্থ ফেরত দেওয়া হলেও চুক্তি অনুযায়ী মুনাফা পরিশোধ করা হয়নি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীর।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে রিজভী তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। পরে টাকা ফেরতের জন্য চাপ দিলে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে দফায় দফায় টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি। তবে সেই অঙ্গীকারও বাস্তবায়ন হয়নি।

শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ৭ মে উত্তরা পূর্ব থানায় দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় মামলা করেন এম আনিসুর রহমান।

তাঁর হিসাব অনুযায়ী, মূলধনের ৭ কোটি ৮১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা এবং ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অপরিশোধিত লভ্যাংশ ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা মিলিয়ে মোট ১০ কোটি ৪১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে।

মামলাটিতে আদালত অভিযুক্ত রিজভীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পরে ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই রিভিশন আবেদনের পর বিদেশযাত্রার ওপর থাকা সাময়িক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় বলে জানা যায়।

শুধু আনিসুর রহমান নন, আরও কয়েকজনের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে রিজভী ও তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় চারটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

জীবনের ৮৩টি বছর পার করে অবসরের পর সঞ্চিত অর্থ হারিয়ে এখন বিচারপ্রত্যাশী আনিসুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, এই বয়সে প্রতারণার শিকার হয়ে তিনি চরম শারীরিক ও মানসিক সমস্যার মধ্যে পড়েছেন।

প্রতিশ্রুতিতে আকৃষ্ট

প্রতারণার আরেকটি বড় উদাহরণ ‘নাজরান ফিশারীজ অ্যান্ড এগ্রো প্রজেক্ট’। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর তদন্তে উঠে এসেছে, কৃষি প্রকল্পে বিনিয়োগের নামে সাধারণ মানুষকে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখাত একটি সংঘবদ্ধ চক্র।

চক্রটি প্রচার করত, ১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা লাভের পাশাপাশি মূলধনের সমপরিমাণ অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। অর্থাৎ, ৩৩ মাসে বিনিয়োগ দ্বিগুণ হবে।

এই প্রতিশ্রুতিতে আকৃষ্ট হয়ে ২০২৩ সালের মে মাসে ভুক্তভোগী এক নারী ও তাঁর কয়েকজন বান্ধবী রাজধানীর ভাটারা এলাকার কুড়িল চৌরাস্তা-সংলগ্ন প্রকল্পটির কার্যালয়ে গিয়ে বিনিয়োগ করেন।

শুরুতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য তাঁদের মোট ৪২ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হয়। এরপর আস্থা আরও বাড়লে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে আরও ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়।

পরবর্তীতে প্রকল্পের প্লট কেনার কথা বলে তাঁদের কাছ থেকে আরও ১ কোটি ৬৩ লাখ ৯৮ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বিপরীতে ১৮ লাখ ৭২ হাজার টাকা লভ্যাংশ হিসেবে ফেরত দেওয়ার পর একপর্যায়ে লেনদেন বন্ধ করে দেয় চক্রটি। বন্ধ হয়ে যায় কার্যালয়ও। আত্মগোপনে চলে যান সংশ্লিষ্টরা।

মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে সিআইডি জানতে পারে, একই কৌশলে অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির নামে পরিচালিত চারটি ব্যাংক হিসাব, মানি রিসিট ও কার্যালয়ের সার্ভারে থাকা তথ্য পর্যালোচনা করে বিভিন্ন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে আনুমানিক ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি। গ্রেপ্তার হওয়া মো. ওবায়েদুল্লাহর ব্যক্তিগত ১৪টি ব্যাংক হিসাবেও প্রায় আড়াই কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ঘটনায় ২০২৫ সালের মে মাসে প্রায় ১৫ হাজার ভুক্তভোগী ৮০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করেছিলেন বলেও তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে ওই দাবির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই চলছে।

মামলার পর আত্মগোপনে চলে যাওয়া মো. ওবায়েদুল্লাহকে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে রাজধানীর সবুজবাগ থানাধীন বাসাবো এলাকা থেকে পরে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।

কেন বারবার প্রতারণার শিকার হচ্ছেন মানুষ?

এই তিন ঘটনায় প্রতারণার ধরন আলাদা হলেও কৌশলের মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু মিল। প্রথমে ভুক্তভোগীর বিশ্বাস অর্জন, এরপর অস্বাভাবিক মুনাফার প্রতিশ্রুতি, সামান্য অর্থ ফেরত দিয়ে আস্থা তৈরি, তারপর বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা এবং শেষ পর্যায়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া কিংবা কার্যালয় গুটিয়ে আত্মগোপন করা; প্রতারণার চক্রগুলো অনেক ক্ষেত্রে এমন কৌশলই অনুসরণ করে।

অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। চাকরিজীবনের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় কিংবা অবসরের পর পাওয়া থোক অর্থই অনেক সময় তাঁদের জীবনের শেষ বড় আর্থিক নিরাপত্তা। সেই অর্থ হারালে নতুন করে আয় করার সুযোগও থাকে সীমিত।

এসব বিষয়ে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান বলেন, এ ধরনের সুসংগঠিত প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি সচেতন ও সতর্ক হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, কোনো অচেনা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রলোভনে পড়ে হুট করে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন বা বিনিয়োগ করা যাবে না। লেনদেনের আগে অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করতে হবে।

আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, এ ধরনের প্রতারণা বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে যেকোনো বিনিয়োগের আগে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

তাঁর মতে, প্রতারণা করে কেউ যেন পার না পায়, তা নিশ্চিত করতে আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং মানুষের আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগও জরুরি।
সূত্র: বাংলানিউজ

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

অবসরের সঞ্চয়েও প্রতারণার থাবা

সর্বশেষ আপডেট ০৮:৪২:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চাকরিজীবনের দীর্ঘ সময় পার করে অবসরে গিয়ে পাওয়া সঞ্চয়ের টাকা নিরাপদে বিনিয়োগ করে বাকি জীবনটা একটু স্বস্তিতে কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। কেউ চেয়েছিলেন অবসরের থোক টাকা থেকে নিয়মিত আয় করতে, কেউ আবার বাড়তি মুনাফার আশায় পরিচিতজনের কথায় বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে।

ফেসবুকে পরিচয়ের পর অনলাইন বিনিয়োগের প্রলোভন, পরিচিতজনের মাধ্যমে ব্যবসায়িক মুনাফার আশ্বাস কিংবা কৃষি প্রকল্পে মাসিক লাভের প্রতিশ্রুতি; প্রতারণার কৌশল ভিন্ন হলেও লক্ষ্য একটাই, মানুষের সঞ্চিত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।

সাম্প্রতিক তিনটি ঘটনায় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ও মামলার তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।

এর মধ্যে একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি অনলাইন বিনিয়োগের ফাঁদে পড়ে হারিয়েছেন ৫০ লাখ ৬৭ হাজার ৩১০ টাকা।

আরেক ঘটনায় ৮৩ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত এক সেনাকর্মকর্তার অভিযোগ, ব্যবসায়িক মুনাফার আশ্বাসে তাঁর কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ১০ কোটি ৪১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। অন্যদিকে, ‘নাজরান ফিশারীজ অ্যান্ড এগ্রো প্রজেক্ট’-এর নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সংস্থাটির তদন্তে প্রকল্পটির চারটি ব্যাংক হিসাবে বিভিন্ন ভুক্তভোগীর প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতারণার পরিমাণ আরও বেশি।

ফেসবুকে পরিচয়, এরপর বিনিয়োগের প্রলোভন

২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর ফেসবুকের মাধ্যমে আনিশা রহমান নামে এক নারীর সঙ্গে পরিচয় হয় অবসরপ্রাপ্ত মো. আমিনুর রহমানের (৬০)। অবসরের পর পাওয়া থোক টাকা কোথাও বিনিয়োগ করে লাভবান হওয়ার কথা ভাবছিলেন তিনি। এই সুযোগেই আনিশা তাঁকে bgecapitase.com নামের একটি ওয়েবসাইটে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেন। ওই নারী নিজেও সেখানে বিনিয়োগ করে লাভবান হয়েছেন বলে আমিনুরকে জানান।

প্রথমে রাজি না হলেও বারবার লাভের কথা বলে তাঁকে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করা হয়। একপর্যায়ে তিনি বিনিয়োগে রাজি হন।

২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে রাজধানীর রমনা মডেল থানাধীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সোনালী ব্যাংক শাখায় অবস্থানকালে ওই ওয়েবসাইটে একটি অ্যাকাউন্ট খোলেন আমিনুর।

প্রথমে বিকাশের মাধ্যমে ৩৬ হাজার ৬২০ টাকা জমা দেন তিনি। এরপর তাঁর অনলাইন অ্যাকাউন্টে ৫ হাজার ৪০০ টাকা লাভ দেখানো হয়। অর্থাৎ, বিনিয়োগের বিপরীতে মোট ৪২ হাজার ২০ টাকা স্থিতি দেখানো হয়। শুরুতেই লাভ দেখিয়ে আস্থা অর্জন করাই যেন ছিল প্রতারকদের কৌশল।

এরপর ওয়েবসাইটের কাস্টমার সার্ভিসের নির্দেশনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠাতে থাকেন আমিনুর। পরবর্তী প্রায় তিন মাসে তিনি মোট ৫০ লাখ ৬৭ হাজার ৩১০ টাকা বিনিয়োগ করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করেছেন।

পরে তিনি বুঝতে পারেন, অনলাইনে যে লাভের হিসাব দেখানো হচ্ছিল, তা ছিল তাঁকে আরও বেশি টাকা বিনিয়োগে উৎসাহিত করার কৌশল।

এ ঘটনায় আনিশা রহমান, তাঁর ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর এবং ওয়েবসাইট পরিচালনাকারী ও তাঁদের সহযোগী দেশি-বিদেশি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থানায় এজাহার দিয়েছেন আমিনুর রহমান।

অবসর জীবনের নিরাপত্তার জন্য সঞ্চয় করে রাখা অর্থ হারিয়ে এখন প্রতিকার চাইছেন তিনি।

পূর্বপরিচিত হওয়ার সুযোগ

আরেক ঘটনায় পূর্বপরিচিতির বিশ্বাসকে পুঁজি করে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে তানভীর রায়হান রিজভী ও তাঁর ভাই জহির রায়হানের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ অনুযায়ী, পারিবারিকভাবে পূর্বপরিচিত হওয়ার সুযোগ নিয়ে ২০২০ সালে অবসরপ্রাপ্ত মেজর এম আনিসুর রহমানের (৮৩) কাছ থেকে চুক্তির ভিত্তিতে বার্ষিক মুনাফার আশ্বাসে ৭ কোটি ৮১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা বিনিয়োগ হিসেবে নেন তানভীর রায়হান রিজভী।

পরবর্তীতে ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পণ্য আমদানির কথা বলেও আরও কয়েক কোটি টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রাথমিক মূলধনের কিছু অংশ বা স্বল্পমেয়াদি লেনদেনের অর্থ ফেরত দেওয়া হলেও চুক্তি অনুযায়ী মুনাফা পরিশোধ করা হয়নি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীর।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে রিজভী তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। পরে টাকা ফেরতের জন্য চাপ দিলে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে দফায় দফায় টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি। তবে সেই অঙ্গীকারও বাস্তবায়ন হয়নি।

শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ৭ মে উত্তরা পূর্ব থানায় দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় মামলা করেন এম আনিসুর রহমান।

তাঁর হিসাব অনুযায়ী, মূলধনের ৭ কোটি ৮১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা এবং ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অপরিশোধিত লভ্যাংশ ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা মিলিয়ে মোট ১০ কোটি ৪১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে।

মামলাটিতে আদালত অভিযুক্ত রিজভীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পরে ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই রিভিশন আবেদনের পর বিদেশযাত্রার ওপর থাকা সাময়িক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় বলে জানা যায়।

শুধু আনিসুর রহমান নন, আরও কয়েকজনের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে রিজভী ও তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় চারটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

জীবনের ৮৩টি বছর পার করে অবসরের পর সঞ্চিত অর্থ হারিয়ে এখন বিচারপ্রত্যাশী আনিসুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, এই বয়সে প্রতারণার শিকার হয়ে তিনি চরম শারীরিক ও মানসিক সমস্যার মধ্যে পড়েছেন।

প্রতিশ্রুতিতে আকৃষ্ট

প্রতারণার আরেকটি বড় উদাহরণ ‘নাজরান ফিশারীজ অ্যান্ড এগ্রো প্রজেক্ট’। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর তদন্তে উঠে এসেছে, কৃষি প্রকল্পে বিনিয়োগের নামে সাধারণ মানুষকে অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখাত একটি সংঘবদ্ধ চক্র।

চক্রটি প্রচার করত, ১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা লাভের পাশাপাশি মূলধনের সমপরিমাণ অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। অর্থাৎ, ৩৩ মাসে বিনিয়োগ দ্বিগুণ হবে।

এই প্রতিশ্রুতিতে আকৃষ্ট হয়ে ২০২৩ সালের মে মাসে ভুক্তভোগী এক নারী ও তাঁর কয়েকজন বান্ধবী রাজধানীর ভাটারা এলাকার কুড়িল চৌরাস্তা-সংলগ্ন প্রকল্পটির কার্যালয়ে গিয়ে বিনিয়োগ করেন।

শুরুতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য তাঁদের মোট ৪২ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হয়। এরপর আস্থা আরও বাড়লে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে আরও ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়।

পরবর্তীতে প্রকল্পের প্লট কেনার কথা বলে তাঁদের কাছ থেকে আরও ১ কোটি ৬৩ লাখ ৯৮ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বিপরীতে ১৮ লাখ ৭২ হাজার টাকা লভ্যাংশ হিসেবে ফেরত দেওয়ার পর একপর্যায়ে লেনদেন বন্ধ করে দেয় চক্রটি। বন্ধ হয়ে যায় কার্যালয়ও। আত্মগোপনে চলে যান সংশ্লিষ্টরা।

মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে সিআইডি জানতে পারে, একই কৌশলে অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির নামে পরিচালিত চারটি ব্যাংক হিসাব, মানি রিসিট ও কার্যালয়ের সার্ভারে থাকা তথ্য পর্যালোচনা করে বিভিন্ন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে আনুমানিক ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি। গ্রেপ্তার হওয়া মো. ওবায়েদুল্লাহর ব্যক্তিগত ১৪টি ব্যাংক হিসাবেও প্রায় আড়াই কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ঘটনায় ২০২৫ সালের মে মাসে প্রায় ১৫ হাজার ভুক্তভোগী ৮০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করেছিলেন বলেও তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে ওই দাবির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই চলছে।

মামলার পর আত্মগোপনে চলে যাওয়া মো. ওবায়েদুল্লাহকে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে রাজধানীর সবুজবাগ থানাধীন বাসাবো এলাকা থেকে পরে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।

কেন বারবার প্রতারণার শিকার হচ্ছেন মানুষ?

এই তিন ঘটনায় প্রতারণার ধরন আলাদা হলেও কৌশলের মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু মিল। প্রথমে ভুক্তভোগীর বিশ্বাস অর্জন, এরপর অস্বাভাবিক মুনাফার প্রতিশ্রুতি, সামান্য অর্থ ফেরত দিয়ে আস্থা তৈরি, তারপর বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা এবং শেষ পর্যায়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া কিংবা কার্যালয় গুটিয়ে আত্মগোপন করা; প্রতারণার চক্রগুলো অনেক ক্ষেত্রে এমন কৌশলই অনুসরণ করে।

অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। চাকরিজীবনের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় কিংবা অবসরের পর পাওয়া থোক অর্থই অনেক সময় তাঁদের জীবনের শেষ বড় আর্থিক নিরাপত্তা। সেই অর্থ হারালে নতুন করে আয় করার সুযোগও থাকে সীমিত।

এসব বিষয়ে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান বলেন, এ ধরনের সুসংগঠিত প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি সচেতন ও সতর্ক হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, কোনো অচেনা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রলোভনে পড়ে হুট করে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন বা বিনিয়োগ করা যাবে না। লেনদেনের আগে অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করতে হবে।

আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, এ ধরনের প্রতারণা বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে যেকোনো বিনিয়োগের আগে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

তাঁর মতে, প্রতারণা করে কেউ যেন পার না পায়, তা নিশ্চিত করতে আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং মানুষের আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগও জরুরি।
সূত্র: বাংলানিউজ