ঢাকা ০১:১৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অবহেলা পেরিয়ে সাফল্যের গল্প লিখছেন হিজড়া জনগোষ্ঠী

রীতা ভৌমিক, সিনিয়র প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৮:১৯:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
  • / 35

আনিকা (বামে) রামিসা (ডানে)। ছবি: বাংলা অ্যাফেয়ার্স

একসময় সমাজের অবহেলা, বৈষম্য আর উপহাসই ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। শিক্ষা, চাকরি কিংবা স্বাভাবিক জীবন- সব ক্ষেত্রেই ছিল অদৃশ্য দেয়াল। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। দক্ষতা উন্নয়ন, আত্মবিশ্বাস আর কিছু মানুষের সহযোগিতায় হিজড়া জনগোষ্ঠীর অনেকেই এখন গড়ে তুলছেন নতুন পরিচয়। কেউ উদ্যোক্তা, কেউ করপোরেট কর্মী, কেউ আবার মডেল, লেখক কিংবা সংগীতশিল্পী।

রাজধানীর বাসিন্দা আনিকা সেই পরিবর্তনেরই এক অনুপ্রেরণার নাম। যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠা আনিকার শারীরিক ও আচরণগত পরিবর্তন পরিবারে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাবা-মা পাশে থাকলেও আত্মীয়দের বিরূপ আচরণে একসময় তাকে বাড়ি ছাড়তে হয়।

এইচএসসি শেষ করে একটি কল সেন্টারে চাকরি পেলেও টিকে থাকতে পারেননি। নারী বা পুরুষ- কোনো ওয়াশরুমই তার জন্য স্বাভাবিক ছিল না। কর্মক্ষেত্রের সেই অস্বস্তি শেষ পর্যন্ত চাকরিটাই কেড়ে নেয়। পরে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কাজের চেষ্টা করেও হতাশ হন। অল্প বেতনে জীবন চালানো সম্ভব না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত নিজেই বেছে নেন উদ্যোক্তার পথ।

মায়ের সহযোগিতায় শুরু করেন হোমমেড খাবার সরবরাহের ব্যবসা। শুরুটা ছিল মাত্র ১০-১২টি অর্ডার দিয়ে। এখন বিভিন্ন অফিস, ছাত্রাবাস ও প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত খাবার পৌঁছে দেন তিনি। খাবারের মান ও গ্রাহকের ইতিবাচক প্রচারণায় ব্যবসার পরিধিও বেড়েছে।

আনিকা বলেন, “চাকরি যখন মনমতো পাচ্ছিলাম না, তখন সিদ্ধান্ত নিই নিজের কিছু করব। রান্না ভালো পারতাম, তাই অফিস ক্যাটারিং শুরু করি। এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি।”

তবে সফলতার পাশাপাশি রয়েছে তিক্ত অভিজ্ঞতাও। অনেক গ্রাহক খাবার খেয়ে বিল পরিশোধ না করায় আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়তে হয়েছে তাকে।

অন্যদিকে রামিসা গড়ে তুলেছেন নিজের পরিচয় একজন সংগীতশিল্পী হিসেবে। জামালপুরের মেয়ে হলেও বেড়ে উঠেছেন ঢাকায়। পরিবার পাশে থাকলেও স্কুলজীবনে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বারবার।

রামিসা বলেন, “আমরা আলাদা থাকতে চাই না। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল স্রোতেই সবার সঙ্গে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই।”

নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই লেখাপড়াকে গুরুত্ব দেন তিনি। বর্তমানে সংগীতে স্নাতকোত্তর করছেন এবং একই সঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করছেন।

তার ভাষায়, “জীবনদক্ষতা প্রশিক্ষণ আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। সুযোগ পেলে আমরাও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি।”

বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক সালেহ আহম্মেদ বলেন, হিজড়া জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা গেলে তাদের জীবনে বড় পরিবর্তন আসবে।

আর প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস বলেন, সামাজিক বৈষম্য দূর করে কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতা তৈরির মাধ্যমে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনতেই তাদের কাজ চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো গেলে হিজড়া জনগোষ্ঠীও দেশের অর্থনীতি ও সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। একটু সম্মান, একটু সহযোগিতা- এই দুটিই বদলে দিতে পারে তাদের পুরো জীবন।

Tag :

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

অবহেলা পেরিয়ে সাফল্যের গল্প লিখছেন হিজড়া জনগোষ্ঠী

সর্বশেষ আপডেট ০৮:১৯:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬

একসময় সমাজের অবহেলা, বৈষম্য আর উপহাসই ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। শিক্ষা, চাকরি কিংবা স্বাভাবিক জীবন- সব ক্ষেত্রেই ছিল অদৃশ্য দেয়াল। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। দক্ষতা উন্নয়ন, আত্মবিশ্বাস আর কিছু মানুষের সহযোগিতায় হিজড়া জনগোষ্ঠীর অনেকেই এখন গড়ে তুলছেন নতুন পরিচয়। কেউ উদ্যোক্তা, কেউ করপোরেট কর্মী, কেউ আবার মডেল, লেখক কিংবা সংগীতশিল্পী।

রাজধানীর বাসিন্দা আনিকা সেই পরিবর্তনেরই এক অনুপ্রেরণার নাম। যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠা আনিকার শারীরিক ও আচরণগত পরিবর্তন পরিবারে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাবা-মা পাশে থাকলেও আত্মীয়দের বিরূপ আচরণে একসময় তাকে বাড়ি ছাড়তে হয়।

এইচএসসি শেষ করে একটি কল সেন্টারে চাকরি পেলেও টিকে থাকতে পারেননি। নারী বা পুরুষ- কোনো ওয়াশরুমই তার জন্য স্বাভাবিক ছিল না। কর্মক্ষেত্রের সেই অস্বস্তি শেষ পর্যন্ত চাকরিটাই কেড়ে নেয়। পরে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কাজের চেষ্টা করেও হতাশ হন। অল্প বেতনে জীবন চালানো সম্ভব না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত নিজেই বেছে নেন উদ্যোক্তার পথ।

মায়ের সহযোগিতায় শুরু করেন হোমমেড খাবার সরবরাহের ব্যবসা। শুরুটা ছিল মাত্র ১০-১২টি অর্ডার দিয়ে। এখন বিভিন্ন অফিস, ছাত্রাবাস ও প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত খাবার পৌঁছে দেন তিনি। খাবারের মান ও গ্রাহকের ইতিবাচক প্রচারণায় ব্যবসার পরিধিও বেড়েছে।

আনিকা বলেন, “চাকরি যখন মনমতো পাচ্ছিলাম না, তখন সিদ্ধান্ত নিই নিজের কিছু করব। রান্না ভালো পারতাম, তাই অফিস ক্যাটারিং শুরু করি। এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি।”

তবে সফলতার পাশাপাশি রয়েছে তিক্ত অভিজ্ঞতাও। অনেক গ্রাহক খাবার খেয়ে বিল পরিশোধ না করায় আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়তে হয়েছে তাকে।

অন্যদিকে রামিসা গড়ে তুলেছেন নিজের পরিচয় একজন সংগীতশিল্পী হিসেবে। জামালপুরের মেয়ে হলেও বেড়ে উঠেছেন ঢাকায়। পরিবার পাশে থাকলেও স্কুলজীবনে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বারবার।

রামিসা বলেন, “আমরা আলাদা থাকতে চাই না। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল স্রোতেই সবার সঙ্গে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই।”

নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই লেখাপড়াকে গুরুত্ব দেন তিনি। বর্তমানে সংগীতে স্নাতকোত্তর করছেন এবং একই সঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করছেন।

তার ভাষায়, “জীবনদক্ষতা প্রশিক্ষণ আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। সুযোগ পেলে আমরাও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি।”

বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক সালেহ আহম্মেদ বলেন, হিজড়া জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা গেলে তাদের জীবনে বড় পরিবর্তন আসবে।

আর প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস বলেন, সামাজিক বৈষম্য দূর করে কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতা তৈরির মাধ্যমে হিজড়া জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনতেই তাদের কাজ চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো গেলে হিজড়া জনগোষ্ঠীও দেশের অর্থনীতি ও সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। একটু সম্মান, একটু সহযোগিতা- এই দুটিই বদলে দিতে পারে তাদের পুরো জীবন।