সম মজুরি নিশ্চিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার তাগিদ
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:১৯:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
- / 37
নারীর ক্ষমতায়ন, ভূমি ও কৃষিতে প্রবেশাধিকার এবং সমকাজে সম মজুরি নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, কৃষিতে নারীর উল্লেখযোগ্য অবদান থাকলেও জমির মালিকানা, কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি, ঋণ, প্রশিক্ষণ ও সরকারি প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
রোববার (১১ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস ও বিশ্ব খাদ্য দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ‘ভূমি ও কৃষিতে নারী কৃষকের অধিকার এবং খাদ্য নিরাপত্তা: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারটির আয়োজন করে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি)।
এএলআরডির চেয়ারপারসন ও নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদ সদস্য ও নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সদস্য আন্না মিনজ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এএলআরডির উপনির্বাহী পরিচালক রওশন জাহান মনি।
মূল প্রবন্ধে রওশন জাহান মনি বলেন, খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও সবার কাছে তা পৌঁছাচ্ছে না। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থাসহ পাঁচটি সহযোগী সংস্থার যৌথভাবে প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬’ প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। খাদ্যনিরাপত্তা শুধু উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না; বরং খাদ্যের প্রাপ্যতা, মূল্য ও সুষম বণ্টনের ওপরও নির্ভরশীল।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ কৃষিশ্রমের প্রায় ৫৮ শতাংশে নারীদের অংশগ্রহণ রয়েছে। অথচ কার্যকর ভূমির মালিকানায় নারীর অংশ মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ। উত্তরাধিকারে বঞ্চনা, জমির মালিকানা না থাকা এবং কৃষক হিসেবে স্বীকৃতির অভাবে অনেক নারী কৃষিঋণ, প্রশিক্ষণ, কৃষি সম্প্রসারণ সেবা, কৃষি কার্ড, ভর্তুকি ও সরকারি প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
আলোচনায় রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশের (রিইব) পরিচালক সুরাইয়া বেগম বলেন, নারীর কৃষিতে অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের পথে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বড় বাধা। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত। অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্যোগ বাড়ায় নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং পুষ্টিকর খাবার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএআরআই) জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নাজিম উদ্দীন বলেন, কৃষিতে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকলেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁদের কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। কৃষকের সংজ্ঞায় প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতে কাজ করা ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) বিভাগীয় প্রধান ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. রেজিয়া খাতুন বলেন, দেশের প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নারীদের বড় অবদান থাকলেও তাঁদের অনেকের শ্রমের কোনো আর্থিক মূল্যায়ন হয় না। জলবায়ু সহনশীল কৃষি গড়ে তুলতে নারীবান্ধব প্রযুক্তি ও কৃষিব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন।
এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, দারিদ্র্য কমাতে খাসজমি বিতরণ কার্যক্রম চালু করা জরুরি। খাসজমি বন্দোবস্তে নারী কৃষকদের অগ্রাধিকার দিতে প্রয়োজনে সরকারি নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে হবে। পাশাপাশি কৃষকদের কাছে উন্নত বীজ ও প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহারে যেন কৃষিশ্রমিকেরা কাজ হারিয়ে না ফেলেন, সেদিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য আন্না মিনজ বলেন, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও সমান অধিকার এবং কৃষিতে স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। ভূমি ও কৃষিতে নারীর প্রবেশাধিকার এবং সমমজুরি নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত জরুরি। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগ এগিয়ে নিতে সবার সম্মিলিত ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে খুশী কবির বলেন, নারীরা শুধু ঘরের কাজেই সীমাবদ্ধ নন; বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ থেকে শুরু করে মাঠে ফসল উৎপাদন ও বিপণনেও তাঁরা যুক্ত। কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের বাইরে রেখে দেশের অগ্রগতি নিশ্চিত করা যাবে না। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সেমিনারে তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিনিধি সাবিনা হেমব্রম, চিতকনা বেগম, নিপা আক্তার, শাহানাজ বেগম ও মিতা রানীসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন। তাঁরা সরকারি সংজ্ঞায় নারী কৃষকদের অন্তর্ভুক্ত করা, কৃষক তালিকা ও কৃষি কার্ডে তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়া, কৃষিজমির মালিকানা নিশ্চিত করা এবং খাসজমি বন্দোবস্তে নারী কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান।
এ ছাড়া ন্যায্য মূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রি, কৃষিবিমা, জামানতমুক্ত ঋণ, নারীবান্ধব কৃষিপ্রযুক্তি ও জলবায়ু সহনশীল দেশীয় বীজে সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। স্থানীয় বাজারে নারী কৃষকদের জন্য সংগ্রহ ও বিপণনকেন্দ্র স্থাপন, সমকাজে সমমজুরি এবং পারিবারিক কৃষিতে নারীর অবৈতনিক শ্রমের স্বীকৃতির দাবিও তোলেন তাঁরা।
বক্তারা স্থানীয় কৃষি কমিটি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পর্যায়ে নারী কৃষকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং তাঁদের সংখ্যা, আয় ও অবদান নিয়ে নিয়মিত লিঙ্গভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের ওপরও গুরুত্ব দেন।

































