ঢাকা ০১:১০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যে কারণে বিশ্ববাজারে কমছে সোনার দাম

অন্তার্জাতিক ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ১২:১০:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
  • / 9

বিশ্ববাজারে সোনার দাম কমছে কেন

সাধারণত বিশ্বে যখনই কোনো যুদ্ধবিগ্রহ, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা বড় কোনো সংকট দেখা দেয়, তখনই আন্তর্জাতিক বাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে সোনার দাম। এর মূল কারণ হলো, যেকোনো অর্থনৈতিক মন্দা বা মুদ্রাস্ফীতির বিপরীতে বিশ্বজুড়ে বড় বড় বিনিয়োগকারীরা সোনাকেই সবচেয়ে নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। তবে বর্তমান সময়ে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে তীব্র যুদ্ধাবস্থা বজায় থাকলেও বিশ্ববাজারে সোনা ক্রয়ের ক্ষেত্রে সেই চেনা চিত্র দেখা যাচ্ছে না। চলমান এই ভূরাজনৈতিক সংকটের মাঝেই আন্তর্জাতিক বাজারে হু হু করে কমছে মূল্যবান এই ধাতুর দাম।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেও বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল ৫ হাজার ৩০৩ ডলার। কিন্তু গত শুক্রবার (১২ জুন) সেই দাম এক ধাক্কায় ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়ে ৪ হাজার ২৩াস ডলারে নেমে এসেছে।

বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই দরপতনের মূল কারণগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সংকট হলো লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি। আর এই মুদ্রাস্ফীতির কারণে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মনে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো হয়তো নিকট ভবিষ্যতে সুদের হার কমাবে না। উল্টো বাজারের সামগ্রিক দাম ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যাংকগুলো সুদের হার আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এমন কঠোর অবস্থানের আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা এখন আর সোনার প্রতি খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেওয়ার পেছনে ভূরাজনৈতিক একটি বড় কারণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানাতে যুদ্ধের শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ পুরোপুরি অবরোধ করে রেখেছে ইরান। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি গ্যাস ও খনিজ তেলের আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গত তিন বছরের মধ্যে বর্তমানে সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতি বিরাজ করছে। এর পাশাপাশি দেশটির অভ্যন্তরীণ চাকরির বাজারও স্থবির হয়ে আছে। সার্বিক এই পরিস্থিতির কারণে আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমাবে— এমন কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখছেন না অর্থনীতিবিদেরা।

সাধারণত বিনিয়োগকারীদের কাছে সোনা মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলার একটি বড় হাতিয়ার বা ‘হেজ’ হিসেবে কাজ করলেও, উচ্চ সুদের হার এই মূল্যবান ধাতুর ওপর সবসময় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সোনাকে মূলত একটি ‘মুনাফাহীন সম্পদ’ হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ নিজস্ব বাজারমূল্য বৃদ্ধি ছাড়া এটি থেকে নিয়মিত কোনো লভ্যাংশ বা বাড়তি আয় আসে না। অন্য কথায়, সোনা থেকে লাভ করতে হলে বিনিয়োগকারীদের কেবল এর বাজারদর বাড়ার ওপরই পুরোপুরি নির্ভর করতে হয়।

আর্থিক খাতের জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ‘অপশনস্প্রেডার্স ডটকমের’ প্রধান অপশন অ্যানালিস্ট জাস্টিন কার্ডওয়েল আলজাজিরাকে বলেন, “যেকোনো সম্পদের তুলনায় সোনা প্রকৃত অর্থের সবচেয়ে কাছাকাছি একটি রূপ। এখান থেকে সরাসরি কোনো লভ্যাংশ পাওয়া যায় না এবং বাজারমূল্য না বাড়া পর্যন্ত এর বাড়তি কোনো মূল্যও তৈরি হয় না। মানুষ মূলত ভবিষ্যতে দাম বাড়বে— এমন ভরসা থেকেই সোনা কিনে থাকে।” তিনি আরও যোগ করেন, ব্যাংকগুলোর উচ্চ সুদের হার সোনাকে সরাসরি একটি কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলে দেয়। সুদের হার বেশি থাকলে সোনা বিনিয়োগ হিসেবে তার আকর্ষণ ও ক্ষমতা হারায় এবং মানুষ তখন সোনা ছেড়ে ডলারের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে।

একই বিষয়ে ‘নোবেল গোল্ড ইনভেস্টমেন্টের’ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কলিন প্লাম বলেন, “যখন আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলার শক্তিশালী হয়, তখন সোনার দামের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়। আবার যখন ডলার দুর্বল থাকে, তখন সোনার দাম বাড়ে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে ডলারের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী, যার সরাসরি নেতিবাচক চাপটি টের পাচ্ছে সোনা।” তবে আন্তর্জাতিক এই বাজারে আগামী দিনগুলোতে কী ধরণের পরিবর্তন আসবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলে মনে করেন কলিন প্লাম।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

যে কারণে বিশ্ববাজারে কমছে সোনার দাম

সর্বশেষ আপডেট ১২:১০:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

সাধারণত বিশ্বে যখনই কোনো যুদ্ধবিগ্রহ, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা বড় কোনো সংকট দেখা দেয়, তখনই আন্তর্জাতিক বাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে সোনার দাম। এর মূল কারণ হলো, যেকোনো অর্থনৈতিক মন্দা বা মুদ্রাস্ফীতির বিপরীতে বিশ্বজুড়ে বড় বড় বিনিয়োগকারীরা সোনাকেই সবচেয়ে নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। তবে বর্তমান সময়ে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে তীব্র যুদ্ধাবস্থা বজায় থাকলেও বিশ্ববাজারে সোনা ক্রয়ের ক্ষেত্রে সেই চেনা চিত্র দেখা যাচ্ছে না। চলমান এই ভূরাজনৈতিক সংকটের মাঝেই আন্তর্জাতিক বাজারে হু হু করে কমছে মূল্যবান এই ধাতুর দাম।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেও বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল ৫ হাজার ৩০৩ ডলার। কিন্তু গত শুক্রবার (১২ জুন) সেই দাম এক ধাক্কায় ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়ে ৪ হাজার ২৩াস ডলারে নেমে এসেছে।

বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই দরপতনের মূল কারণগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সংকট হলো লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি। আর এই মুদ্রাস্ফীতির কারণে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মনে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো হয়তো নিকট ভবিষ্যতে সুদের হার কমাবে না। উল্টো বাজারের সামগ্রিক দাম ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যাংকগুলো সুদের হার আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এমন কঠোর অবস্থানের আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা এখন আর সোনার প্রতি খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেওয়ার পেছনে ভূরাজনৈতিক একটি বড় কারণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানাতে যুদ্ধের শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ পুরোপুরি অবরোধ করে রেখেছে ইরান। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি গ্যাস ও খনিজ তেলের আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গত তিন বছরের মধ্যে বর্তমানে সর্বোচ্চ মুদ্রাস্ফীতি বিরাজ করছে। এর পাশাপাশি দেশটির অভ্যন্তরীণ চাকরির বাজারও স্থবির হয়ে আছে। সার্বিক এই পরিস্থিতির কারণে আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমাবে— এমন কোনো সম্ভাবনা আপাতত দেখছেন না অর্থনীতিবিদেরা।

সাধারণত বিনিয়োগকারীদের কাছে সোনা মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলার একটি বড় হাতিয়ার বা ‘হেজ’ হিসেবে কাজ করলেও, উচ্চ সুদের হার এই মূল্যবান ধাতুর ওপর সবসময় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সোনাকে মূলত একটি ‘মুনাফাহীন সম্পদ’ হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ নিজস্ব বাজারমূল্য বৃদ্ধি ছাড়া এটি থেকে নিয়মিত কোনো লভ্যাংশ বা বাড়তি আয় আসে না। অন্য কথায়, সোনা থেকে লাভ করতে হলে বিনিয়োগকারীদের কেবল এর বাজারদর বাড়ার ওপরই পুরোপুরি নির্ভর করতে হয়।

আর্থিক খাতের জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ‘অপশনস্প্রেডার্স ডটকমের’ প্রধান অপশন অ্যানালিস্ট জাস্টিন কার্ডওয়েল আলজাজিরাকে বলেন, “যেকোনো সম্পদের তুলনায় সোনা প্রকৃত অর্থের সবচেয়ে কাছাকাছি একটি রূপ। এখান থেকে সরাসরি কোনো লভ্যাংশ পাওয়া যায় না এবং বাজারমূল্য না বাড়া পর্যন্ত এর বাড়তি কোনো মূল্যও তৈরি হয় না। মানুষ মূলত ভবিষ্যতে দাম বাড়বে— এমন ভরসা থেকেই সোনা কিনে থাকে।” তিনি আরও যোগ করেন, ব্যাংকগুলোর উচ্চ সুদের হার সোনাকে সরাসরি একটি কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলে দেয়। সুদের হার বেশি থাকলে সোনা বিনিয়োগ হিসেবে তার আকর্ষণ ও ক্ষমতা হারায় এবং মানুষ তখন সোনা ছেড়ে ডলারের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে।

একই বিষয়ে ‘নোবেল গোল্ড ইনভেস্টমেন্টের’ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কলিন প্লাম বলেন, “যখন আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলার শক্তিশালী হয়, তখন সোনার দামের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়। আবার যখন ডলার দুর্বল থাকে, তখন সোনার দাম বাড়ে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে ডলারের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী, যার সরাসরি নেতিবাচক চাপটি টের পাচ্ছে সোনা।” তবে আন্তর্জাতিক এই বাজারে আগামী দিনগুলোতে কী ধরণের পরিবর্তন আসবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলে মনে করেন কলিন প্লাম।