তরুণ নারী সম্মেলনে বক্তারা
মিছিলে সামনে, সিদ্ধান্তে পেছনে নারীরা
- সর্বশেষ আপডেট ০৮:৪১:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 24
রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মিছিলের সামনে ব্যানার ধরিয়ে নারীদের দৃশ্যমান করা হলেও দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয় না। এমনকি নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রেও নারীরা বৈষম্যের শিকার হন বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) মানিকগঞ্জের কৈট্টায় প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী তরুণ নারী সম্মেলনের প্রথম দিনে বক্তারা এসব কথা বলেন। নারীপক্ষ আয়োজিত এ সম্মেলনে সহযোগিতা করছে নরওয়ে দূতাবাস ও ইউএন উইমেন।
জাতীয় সংগীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সম্মেলন শুরু হয়। উদ্বোধন করেন ইউএন উইমেনের প্রতিনিধি গীতাঞ্জলী সিং। স্বাগত বক্তব্য দেন নারীপক্ষের সভাপতি কে এ জাহান রুমী। সম্মেলনের উদ্দেশ্য, প্রকল্প পরিচিতি এবং নেতৃত্ব ও নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নারীপক্ষের অবস্থান তুলে ধরেন সংগঠনটির সদস্য মাহীন খান।
গীতাঞ্জলী সিং বলেন, বাংলাদেশে শক্তিশালী নারী আন্দোলন রয়েছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানেও নারীর নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ দেখা গেছে। তবে পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীদের উপস্থিতি কমে গেছে। সরকার ও নির্বাচনী ইশতেহারে নারীদের এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকে সমতার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে।
তরুণ নারীদের ওপর বিনিয়োগকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রে বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি তরুণ নারী নেতৃত্বকে এগিয়ে নিতে আন্তঃদলীয় ও আন্তঃপ্রজন্ম নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
নারীপক্ষের সভাপতি কে এ জাহান রুমী বলেন, বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণে তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে তরুণ নারীদের কণ্ঠ, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নারীরা যেন অন্য নারীর অধিকার নিয়ে নেতৃত্বে আসতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারেন, সেই সুযোগ তৈরি করতে হবে।
বিএনপি নেত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, বছরের পর বছর রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পরও নারীদের প্রথম সারির নাগরিক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে লড়াই করতে হচ্ছে। ২০২৬ সালেও একজন নারীকে তাঁর যোগ্যতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা প্রমাণ করতে হচ্ছে।
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে শুধু নারীদের প্রস্তুত করলেই হবে না, পুরুষদের মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। মনোনয়নের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে নিলুফার মনি বলেন, অভিজ্ঞতার অজুহাতে নারীদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। একজন পুরুষ অভিজ্ঞতা ছাড়াই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলে একজন নারীর ক্ষেত্রেও একই সুযোগ থাকা উচিত।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেক সময় নারীর নিজস্ব যোগ্যতার চেয়ে পারিবারিক পরিচয় বেশি গুরুত্ব পায়। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের নারীরা তুলনামূলক সহজে রাজনৈতিক সুযোগ পেলেও মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীদের একই জায়গায় পৌঁছাতে বেশি সংগ্রাম করতে হয়।
নিজের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নিলুফার মনি বলেন, ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাশাপাশি তিনি আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন। তখন মিছিল ও আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। কিন্তু নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিযোগিতায় আসতে চাওয়ার পর তাঁকে ভিন্নভাবে দেখা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, মিছিলে সামনে থাকা ও আন্দোলন করা নারীর জন্য গ্রহণযোগ্য হলেও নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় যেতে চাওয়াকে অনেক সময় অপরাধ হিসেবে দেখা হয়।
এনসিপির নেত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম বলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে নারীর বসা কোনো বিশেষ লক্ষ্য নয়, এটি স্বাভাবিক ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হওয়া উচিত। তবে সমাজে নারীদের সবসময় নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয় বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে পৌঁছানো তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নারীদের উপস্থিতি ও প্রকৃত ক্ষমতায়নের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে নুসরাত তাবাসসুম বলেন, একটি বড় ব্যানার ধরতে কয়েকজন নারীকে সামনে রাখা হলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় তাঁদের আর দেখা যায় না। মিছিলের সামনে থাকা বা ছবিতে দৃশ্যমান থাকাকে রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখানো হলেও মনোনয়ন, নেতৃত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত থাকে।
নারীদের সমান সুযোগের দাবিকে অতিরিক্ত সুবিধা চাওয়ার সঙ্গে তুলনা করারও সমালোচনা করেন তিনি। পুরুষেরা জন্মের পর থেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের তুলনায় বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছেন উল্লেখ করে শিক্ষা, পুষ্টি, বিশ্রাম ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ক্ষেত্রেও বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সংসদ ও রাজনৈতিক দলগুলোতে এখনো পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো বিদ্যমান বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ গ্রহণ না করারও সমালোচনা করেন তিনি।
মাহীন সুলতানা বলেন, জনজীবনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব এখনও কম। জুলাইয়ের আন্দোলনে তরুণ নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকলেও পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাঁদের ধরে রাখা যায়নি।
সামিয়া আফরীন বলেন, নারীদের কীভাবে ক্ষমতায়ন ও রূপান্তরের সুযোগ দেওয়া যায়, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিজেদের কাজ ও চর্চার মধ্য দিয়েই অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার উদ্যোগ শুরু করা প্রয়োজন।
সম্মেলনের বিভিন্ন পর্ব সঞ্চালনা করেন কামরুন নাহার, সামিয়া আফরীনসহ নারীপক্ষের সদস্যরা। বক্তব্য দেন লেখক ও মানবাধিকারকর্মী ইলিরা দেওয়ান, ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক তপতী সাহা, সাংস্কৃতিক কর্মী বীথি ঘোষসহ অনেকে।
দুই দিনের এ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিভিন্ন পেশার শতাধিক নারী অংশ নিচ্ছেন। জনজীবনে তরুণ নারীদের প্রতিবন্ধকতা, সম্ভাবনা ও অবদান নিয়ে তাঁরা মতামত তুলে ধরছেন। শুক্রবার বিকেলে সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি ও কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে সম্মেলন শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।





























