মন্ত্রীর আশ্বাসের এক মাস, বান্দরবানে পুনর্বাসনে নেই অগ্রগতি
- সর্বশেষ আপডেট ০৩:২৫:৪৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
- / 19
বন্যার পানি নেমে গেছে প্রায় এক মাস আগে। সড়কে ফিরেছে যান চলাচল, খুলেছে দোকানপাট, স্বাভাবিক হয়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন। কিন্তু বান্দরবানে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ১২ হাজার ৫০০ পরিবারের কাছে সেই স্বাভাবিকতা এখনও অধরা। পানি নেমে গেলেও তাদের ঘরবাড়ি, বসতভিটা ও জীবিকার ক্ষত শুকায়নি। এক মাস পেরিয়ে গেলেও থমকে আছে পুনর্বাসন কার্যক্রম।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনও বন্যার ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট। কোথাও ভেঙে পড়েছে ঘর, কোথাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বসতভিটা। আবার কোথাও বন্যার স্রোতে ভেসে গেছে ঘরের আসবাব, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও জীবিকার উপকরণ। অনেক পরিবার এখনও বিধ্বস্ত ঘরেই ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে।
বান্দরবান শহরের বালাঘাটা আমবাগান পাড়ার বাসিন্দা অঞ্জনা তংচঙ্গ্যার ঘরও এবারের বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যার পানিতে তার তিনটি ছাগল ও মুরগি মারা যায়। ভেসে যায় ঘরের আসবাবপত্রসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী। বসতঘরটি হয়ে পড়ে বসবাসের অনুপযোগী।
পরে ঋণ করে কোনোভাবে ঘরটি মেরামত করে সেখানে উঠেছেন অঞ্জনা। তিনি বলেন, বন্যায় তার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শনের সময় পুনর্বাসনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু এক মাস পেরিয়ে গেলেও সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন হয়নি, এমনকি পরে কেউ খোঁজও নেয়নি।
শুধু অঞ্জনা নন, জেলার বিভিন্ন এলাকার অসংখ্য পরিবারের একই অবস্থা। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ অন্যের জায়গায় কোনোমতে দিন কাটাচ্ছেন। নিজেদের ঘরে ফেরার অপেক্ষায় থাকা এসব পরিবার এখন নতুন ঘর ও পুনর্বাসন সহায়তার আশায় দিন গুনছে।
বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। পরিদর্শনকালে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের আওতায় আনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। এতে আশায় বুক বাঁধেন বানভাসি মানুষ। তবে এক মাস পরও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় হতাশ তারা।
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের বন্যায় বান্দরবানে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে টিন ও নগদ তিন হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রশাসন। তবে অনেক পরিবারের অভিযোগ, তারা এখনও এ সহায়তা পাননি।
ক্ষতিগ্রস্তদের ভাষ্য, বন্যার সময় ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পাশে দাঁড়ালেও পানি নেমে যাওয়ার পর তাদের খোঁজ নেওয়ার তৎপরতা কমে গেছে। যাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে কিংবা জীবিকার উপকরণ নষ্ট হয়েছে, তারা এখন নিজেদের সামর্থ্য ও ঋণের ওপর ভরসা করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।
বান্দরবানের আমবাগান, ভরাখালী, কুহালং, দুংখি পাড়া, রোয়াজা পাড়াসহ সাত উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হয়েছিল। পানিতে তলিয়ে যায় ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি। ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুকুরের মাছ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি। বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করা হলেও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেকের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আমবাগান এলাকার বাসিন্দা হ্লামেপ্রু ও সৌমিতা বড়ুয়া বলেন, বন্যার পানিতে সন্তানদের খাতা-বইসহ প্রয়োজনীয় অনেক জিনিস নষ্ট হয়েছে। বাড়ির চারপাশে এখনও ভাঙনের চিহ্ন। মন্ত্রী পরিদর্শনে এসে পুনর্বাসনের আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। বাধ্য হয়ে ভাঙা ঘরেই জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
দুংখি পাড়া, রোয়াজা পাড়া ও আমতলী পাড়ার বাসিন্দা নুমংউ, উহ্লাপ্রু ও অবৈর অভিযোগ, তারা বন্যার পর পর্যাপ্ত ত্রাণ পাননি। কেউ তাদের খোঁজ নিতেও আসেনি। বর্তমানে ঋণ করে ঘর মেরামত ও নষ্ট হয়ে যাওয়া জিনিসপত্র পুনরায় সংগ্রহের চেষ্টা করছেন তারা।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, সরকারি উদ্যোগ বা বরাদ্দ না থাকায় পুনর্বাসন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্তদের প্রশাসন, জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে টিন ও নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্ত ও বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল। সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে প্রশাসনের পক্ষে বড় পরিসরে পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়। পরবর্তীতে সরকারের কাছ থেকে কী নির্দেশনা আসে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পানি নেমে গেলেও বান্দরবানের বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগ এখনও কাটেনি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রত্যাশা, মন্ত্রীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবে রূপ নেবে এবং পুনর্বাসনের মাধ্যমে তারা আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।




























