এক প্রকল্পে শ্যালক, ভাতিজাসহ পিডির আত্নীয়ই ১৬জন!
- সর্বশেষ আপডেট ০২:৪২:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
- / 26
পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ সাজেদুল করিম সরকার।
শ্যালক, ভাতিজা, বোনের ভাশুরের ছেলে থেকে শুরু করে নাতনি- পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্পে এমন অন্তত ১৬ জন আত্মীয়কে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ড. মো. সাজেদুল করিম সরকারের বিরুদ্ধে। শুধু নিয়োগই নয়, এসব আত্মীয়-স্বজনের কেউ কেউ নিজ এলাকায় যাতায়াতের খরচও প্রকল্পের ট্যুর বিল থেকে উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রাণি সম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের পাঁচ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল দেশের পোল্ট্রি খাতে গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। কিন্তু প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে এসে গবেষণা বা উন্নয়নের চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে আত্মীয় নিয়োগ, ট্যুর বিল এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের জুনে। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ বর্ধিত সময় অনুযায়ী চলতি মাসেই প্রকল্পটির সমাপ্তি হওয়ার কথা রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের সময়ে প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ড. সাজেদুল করিম সরকার প্রকল্পের নানা সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতা আড়াল করতে রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শনের কৌশল গ্রহণ করেন।
`পোল্ট্রি উন্নয়ন: বঙ্গবন্ধুর ভাবনা’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ লিখে তিনি প্রকল্পের অর্থে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তা প্রকাশ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন জাতীয় দিবসে প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করে তিনি টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারতে যেতেন। এসব সফরের যাতায়াত ও আপ্যায়ন ব্যয় প্রকল্পের ট্যুর বিল থেকে সমন্বয় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

প্রকল্পের আওতায় রাজশাহীর গোদাগাড়ী, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, যশোর সদর, নীলফামারীর সৈয়দপুর এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে পোল্ট্রি গবেষণা, সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের কথা ছিল।
বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রকল্পের অন্যতম বাস্তবায়ন এলাকা হিসেবে নির্বাচিত হয় পিডি ড. সাজেদুল করিম সরকারের নিজ এলাকা সৈয়দপুর।
তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও খামারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিযোগ, বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও মাঠপর্যায়ে প্রত্যাশিত ফলাফল দৃশ্যমান নয়। গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ কিংবা খামারিদের সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলেই তাদের দাবি।
এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রকল্পের বয়স প্রায় সাত বছর। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর দৃশ্যমান অর্জন খুঁজতে গেলে অনেক জায়গায় হতাশ হতে হয়। কোথাও কোথাও প্রকল্পটি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। এখন শেষ সময়ে এসে দেখা যাচ্ছে, প্রকল্পের সবচেয়ে সফল অংশ হয়তো নিয়োগ কার্যক্রম।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পে নিয়োগ পাওয়া আত্মীয়দের মধ্যে রয়েছেন-
- শ্যালক সাদমান সাকিব জিহান (ল্যাব টেকনিশিয়ান)
- বোনের ভাশুরের ছেলে মো. মোস্তাকিম আলম (মাঠ সহকারী)
- ভাতিজি জামাই আব্দুল গনী (মাঠ সহকারী)
- ভাতিজা মো. আরুফ সরকার (মাঠ সহকারী)
- চাচাতো ভাই মো. নজরুল ইসলাম (মাঠ সহকারী)
- বোনের ছেলে মো. ফয়সাল আলম (হ্যাচারি টেকনিশিয়ান)
- বোনের ননদের ছেলে মো. রবিউল ইসলাম (ইলেকট্রিশিয়ান)
- বোনের ছেলে কাজী ফয়সাল রাব্বী (ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট)
- নিকট আত্মীয় লাভলী খাতুন
- মামাতো ভাইয়ের স্ত্রী মোস্তারিমা বেগম
- চাচাতো ভাই মো. মানিক (পোল্ট্রি ওয়ার্কার)
- নাতনি সোহান (পোল্ট্রি ওয়ার্কার)
- খালাতো ভাই মো. আ. ওয়াজ্জাক (সিকিউরিটি গার্ড)
- স্ত্রীর বোনের দেবর মো. মেহেদী হাসান (সিকিউরিটি গার্ড)
- ভাগিনার বন্ধু মো. সিরাজ আলী (পরিচ্ছন্নতাকর্মী)
এদের অধিকাংশের বাড়ি রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায়। তারা বিভিন্ন অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
আরও অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের কেউ কেউ নিজ নিজ এলাকায় যাওয়ার সময় সেই সফরকে প্রকল্পের সরকারি কার্যক্রম হিসেবে দেখিয়ে ট্যুর বিল উত্তোলন করেছেন।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ড. মো. সাজেদুল করিম সরকার বাংলা অ্যাফেয়ার্সকে বলেন, ১৬ জন আত্মীয় নিয়োগের তথ্য সঠিক নয়।
তার দাবি, প্রকল্পের শুরুতে দুই-একজন নিয়োগ পেয়েছিলেন। তবে তাদের নিয়োগ আমি দিইনি। নিয়োগ হয়েছে আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান জনসান কনসালটিং এজেন্সির মাধ্যমে। সেখানে আমার কোনো ভূমিকা ছিল না।
তবে অভিযোগে উল্লিখিত ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে জানতে চাওয়া হলে তাদের মধ্যে কারা তার আত্মীয় নন- এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি তিনি।
অন্যদিকে টুঙ্গিপাড়ায় মাজার জিয়ারত এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নিবন্ধ প্রকাশের বিষয়ে তিনি বলেন, তখন আমি পরিস্থিতির শিকার ছিলাম। বিষয়টি তখনকার প্রেক্ষাপটে সঠিক ছিলো।
যদিও প্রকল্পটি মোট ছয়টি জেলায় বাস্তবায়নের কথা ছিল, সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ- বাস্তবে এর বড় অংশই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল। মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের কার্যক্রম, ব্যয় এবং বাস্তব অর্জনের চিত্র নিয়ে থাকছে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব।




































