ঢাকা ০৯:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি সাশ্রয়ী নগরায়ন পরিকল্পনার আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৭:২৯:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
  • / 27

জ্বালানি সংকট এবং পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নগরায়ন ও উন্নয়ন কৌশলের পরিবর্তন আনার কোন বিকল্প নেই। নগর এলাকায় গণপরিবহন ব্যবস্থার ঘাটতি ও ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থা, আবাসন পরিকল্পনায় প্রাকৃতিক ব্যবস্থা এবং সবুজ-খাল-জলাশয় ধ্বংস, বিল্ডিং ডিজাইন ও স্থাপত্যে আলো-বাতাসের প্রবেশের সুযোগ বন্ধ করে দিয়ে এসিনির্ভর ও কাঁচঘেরা ভবন নির্মাণ আমাদের জ্বালানি চাহিদা বহুলাংশে বাডিয়ে দিয়েছে।

গ্রামীণ ও আঞ্চলিক উন্নয়নকে এমনভাবে পরিচালনা করা, যাতে জ্বালানি ব্যবহার কমিয়ে টেকসই, দক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা।

আজ শুক্রবার রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সম্মেলন কক্ষে “জ্বালানি সংকট এবং পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নগরায়ন ও উন্নয়ন ভাবনা” শীর্ষক ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)এর আয়োজনে সংলাপে বক্তারা একথা বলেন।

আইপিডি সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান।

এছাড়াও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) -এর সভাপতি ড. আরিফুল ইসলাম, বাংলাদেশ ট্রাফিক ও ট্রান্সপোর্ট ফোরামের সভাপতি সাজেদুল হক, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর শিক্ষক ও আইপিডির রিসার্চ ফেলো কে এম আসিফ ইকবাল, আইপিডি রিসার্চ ফেলো ড. ফরহাদুর রেজা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ‍্যাপক ড. শাম্মী আক্তার সেতু, পরিকল্পনাবিদ আবু নঈম সোহাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মাদ উল্লাহ, টেন মিনিট স্কুলের ফারহান সাকিব, গবেষক এহসান রেজা অনিম, ক্লিন প্রকল্পের ক‍্যাম্পেইন অফিসার মো. নোমান।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পরিকল্পনাবিদ সাজিদ ইকবাল, ব্যারিস্টার শাহরিয়ার ইয়াসিন খান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও আইপিডির রিসার্চ এসিসটেন্ট কাজী তাসনিয়া তাবাস্সুম, জিনিয়াস জান্নাত, উম্মি হানি ইয়াসমিন প্রীতি, সমর্পিতা ঘোষ, প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ সজীব, ইকতিদার চৌধুরী, পরিকল্পনাবিদ মুস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ ।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, আমাদের দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি অনুমোদন ও বাস্তবায়নের পাশাপাশি গ্রীন বিল্ডিং কোড প্রণয়ন করতে হবে।

ভবন, অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পের এনার্জি ডিমান্ড ও ইম্প্যাক্ট এসেসমেন্ট করা। ভবনের উচ্চতা ও ঘনত্বের ভারসাম্য নিশ্চিত করতে অপ্রয়োজনীয় উচ্চ ভবনের পরিবর্তে মাঝারি উচ্চতার ঘনবসতিপূর্ণ উন্নয়ন উৎসাহিত করতে হবে। সৌরবিদ্যুত সম্প্রসারণে সকল ধরনের ট্যাক্স বাতিল করতে হবে।

জ্বালানি পরিকল্পনার সাথে নগর পরিকল্পনা ও ইমারত নির্মাণ কোড ও বিধিমালার সমন্বয় করতে হবে। দেশের কৃষি, জরুরি খাদ্য পরিবহন ব্যবস্থা, গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, ফার্মাসিউটিক্যালস, সেচ ব্যবস্থাসহ জ্বালানি অগ্রাধিকার তৈরি করা প্রয়োজন। টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হলে নগর, আঞ্চলিক ও গ্রামীণ পরিকল্পনার সঙ্গে জ্বালানি বিষয়কে সমন্বিত করতে হবে।

মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানির চাহিদা ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় এনার্জি ডিমান্ড ম্যাপিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকায় জ্বালানির চাহিদা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি, যা একটি বৈষম্য তৈরি করছে। এই বৈষম্য কমাতে পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ বণ্টন ও ব্যবস্থাপনা করতে হবে। উন্নয়ন বাজেটের মতো বিদ্যুৎ বরাদ্দেও বৈষম্য রয়েছে, যা দেশের উন্নয়নকে এককেন্দ্রিক করে তুলছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে তথ্যনির্ভর পরিকল্পনা ও নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন , নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সোলারসহ বিকল্প জ্বালানির উৎসে অর্থায়ন বাড়াতে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড ও উন্নয়ন অংশীদারদের সহযোগিতা কাজে লাগানো যেতে পারে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে কর-সুবিধা ও ভর্তুকি প্রদান এবং গ্রামীণ পর্যায়ে মাইক্রোফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে সৌর প্রযুক্তির বিস্তার ঘটানো প্রয়োজন।

গণপরিবহনে গুরুত্ব দিতে ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে বাস সার্ভিসে গুরুত্ব দেয়া, সাইকেল ও পদচারীবান্ধব সড়ক তৈরি করলে জ্বালানির চাপ কমবে। পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে রেলপথ ও নৌপথেও গুরুত্ব দিতে হবে। ঢাকাভিত্তিক এককেন্দ্রিক নগরায়ন থেকে বের হয়ে বহুকেন্দ্রিক (পলিসেন্ট্রিক) নগরায়ন দেশের উন্নয়নকে আরও স্থায়িত্বশীল করবে।

ড. আরিফুল ইসলাম বলেন, গ্রামে জ্বালানি ঘাটতির কারণে শহরমুখী প্রবণতা বাড়ছে, যা বিকেন্দ্রীকরণ ও টেকসই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। তিনি উন্নত গণপরিবহন, গ্রিন বিল্ডিং, ট্রানজিট-অরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট এবং জ্বালানি দক্ষতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। দেশের স্থানিক পরিকল্পনা বিল অনুমোদন হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দেশের জ্বালানি চাহিদা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

সাজেদুল হক বলেন, আমাদের নগর উন্নয়নে এলোমেলো ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তনির্ভর পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে। তিনি গণপরিবহনভিত্তিক যাতায়াত ব্যবস্থা, সমন্বিত বাস রুট পরিচালনা, ছায়াযুক্ত ফুটপাত ও পৃথক সাইকেল লেন নির্মাণের ওপর জোর দেন। পাশাপাশি সামাজিক আচরণে পরিবর্তন, রিকশাকে আধুনিক ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় এবং বিদ্যুৎচালিত ও হাইব্রিড যানবাহনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে টেকসই নগর তৈরি করবার আহ্বান জানান।

কে এম আসিফ ইকবাল বলেন, আমাদের গ্রামে এখন বিদ্যুৎ কেবল মাঝে মাঝে আসে। বিগত সরকার সৌর বিদ্যুৎ সম্প্রসারণের নীতি নিয়েছিল। অথচ গোষ্ঠী স্বার্থে বসিয়েছিল সৌর বিদ্যুৎ উপকরণের উপর চড়া কর। সেটা ছিল বড় প্রহসন। বর্তমান সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি অনুমোদন এর আহবান জানান তিনি।

ড. ফরহাদুর রেজা বলেন, বিশ্বব্যাপী ভবনের টেকসই ডিজাইনের মাধ্যমেই জ্বালানির ৪০–৫০% সাশ্রয় করা সম্ভব হয়, তাই গ্রিন বিল্ডিং ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যবসায়ীদের চাপে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার এফএআর (ফার) মান বাড়ানোর ফলে আরও উঁচু ভবন নির্মাণের কারণে জ্বালানির চাহিদা আরও বেড়ে যাবে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে আমাদের নগরের অনেক এলাকায় বহুতল ভবন এর বদলে মাঝারি উচ্চতার ভবন নির্মাণ কৌশলের দিকে যেতে হবে, যা তুলনামূলক জ্বালানি সাশ্রয়ী।

ব্লক-ভিত্তিক উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রিত মিশ্র ভূমি ব্যবহার এবং ব্লু-গ্রিন ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মাধ্যমে টেকসই নগর পরিকল্পনার ওপর জোর দেন তিনি। এছাড়া স্মার্ট গ্রিড ও বিকল্প জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

অধ‍্যাপক ড. শাম্মী আক্তার সেতু বলেন, কার্যকর ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার মাধ্যমে শিল্প, পরিবহন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অন্তর্ভুক্ত করে জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকে টেকসই করা সম্ভব। নাগরিক সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট এর পরিচালক গাউস পিয়ারী ভবনে প্রাকৃতিক আলো বাতাস নিশ্চিত করা এবং ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এর মাধ্যমে জ্বালানিনির্ভরতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন। অবকাঠামো উন্নয়ন, গণপরিবহন সম্প্রসারণ, সাইকেল লেন ও নেটওয়ার্ক উন্নয়নের মাধ্যমে টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশের সমন্বিত টেকসই জ্বালানি নীতি এবং দেশের সুষম নগরায়ন ও উন্নয়নে কয়েকটি প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়।

১. পরিকল্পনার মূল দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে বর্তমান গাড়িনির্ভর ও বেশি জ্বালানি ব্যবহারকারী শহর থেকে সরে এসে কম জ্বালানি ব্যবহারকারী, স্বল্প দূরত্বভিত্তিক শহর গড়ে তোলা। শহরকে এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে যাতে মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত কম হয়। গণপরিবহনকেন্দ্রিক উন্নয়ন ও ঘনবসতিপূর্ণ সংক্ষিপ্ত শহর মডেলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

২. বহুকেন্দ্রিক উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে এসব কেন্দ্রে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। যাতায়াতের চাহিদা কমাতে বাসস্থান, কর্মসংস্থান ও প্রয়োজনীয় সেবা কাছাকাছি রাখতে হবে।

নীল-সবুজ অবকাঠামো বাড়াতে গাছপালা, খাল-বিল ও জলাধার সংরক্ষণ ও বৃদ্ধি করতে হবে। এতে শহরের তাপমাত্রা কমবে, ফলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার কমে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে।

৩. গণপরিবহনকে জ্বালানি নীতির অংশ করতে মেট্রোরেলসহ গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। সংযোগকারী বাস ও হাঁটার পথের সাথে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। অযান্ত্রিক পরিবহন অগ্রাধিকার হাঁটা ও সাইকেল চালানোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ফুটপাত ও সাইকেল চলাচলের পথকে জ্বালানি অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

৪. বিকেন্দ্রীভূত জ্বালানি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ছাদে সৌর বিদ্যুৎ স্থাপন বাড়াতে হবে। এলাকাভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ ও ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ জাল গড়ে তুলতে হবে। বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের উপর নির্ভরতা কমবে। স্মার্ট জ্বালানি অবকাঠামো গড়তে সড়কবাতিতে সাশ্রয়ী বাতি ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। চাহিদাভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে ।

৪. আবাসন নকশায় পরিবর্তন এর মাধ্যমে প্রাকৃতিক উপায়ে শীতলীকরণ নিশ্চিত করা দরকার। প্রাকৃতিক বাতাস চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। এতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের প্রয়োজন কমবে। কম জ্বালানি ব্যবহারকারী নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করতে হবে।

৫. ভবনের উচ্চতা ও ঘনত্বের ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় উচ্চ ভবনের পরিবর্তে মাঝারি উচ্চতার ঘনবসতিপূর্ণ উন্নয়ন উৎসাহিত করতে হবে। ছাদে সৌর প্যানেল ও সবুজায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

৬. নগর পরিকল্পনা ও জ্বালানি পরিকল্পনাকে একত্রে বাস্তবায়ন করতে হবে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। শহরের জ্বালানি ব্যবহারের তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। বেশি জ্বালানি ব্যবহারকারী এলাকা শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

খ) আঞ্চলিক ও গ্রামীণ উন্নয়ন পরিকল্পনায় জ্বালানি-সংবেদনশীল নীতি প্রস্তাবনা:

১. বিকেন্দ্রীকৃত জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করা। গ্রামীণ এলাকায় সৌরভিত্তিক মিনি গ্রিড স্থাপন করা, দুর্গম অঞ্চলে গ্রিডবিহীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় জ্বালানি কেন্দ্র গড়ে তোলা। কৃষি, বাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক সৌরভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করা।

২. কৃষিখাতে জ্বালানি রূপান্তর করতে কৃষিখাতে জ্বালানির ব্যবহারকে আধুনিক ও সাশ্রয়ী করা। ডিজেলচালিত সেচ পাম্পকে সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থায় রূপান্তর করা। কৃষিযন্ত্রে বৈদ্যুতিক বা সমন্বিত প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াতে হবে, সার উৎপাদন ও সংরক্ষণে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করা।

৩. গ্রামীণ শিল্প ও কুটিরশিল্পে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। শিল্প ক্লাস্টারভিত্তিক নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহারে ভর্তুকি প্রদান করা। কোল্ড স্টোরেজ, ধানকল ও কাঠ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার জন্য আলাদা বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন করা।

৪. আঞ্চলিক অবকাঠামো উন্নয়নে জ্বালানি সাশ্রয় করতে সব ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পে জ্বালানির ব্যবহার কমানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া। প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে জ্বালানি প্রভাব মূল্যায়ন (এনার্জি ইমপ্যাক্ট এসেসমেন্ট) বাধ্যতামূলক করা। আঞ্চলিক পর্যায়ে উপকেন্দ্র, সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে হবে। গ্রামীণ সড়ক ও বাজার উন্নয়নে জ্বালানি সাশ্রয়ী আলোকসজ্জা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা। শিল্পাঞ্চল স্থাপনের আগে জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা নিশ্চিত করা।

৫. গ্রামীণ অর্থনীতিকে বাজারের সাথে সংযুক্ত করতে দক্ষ ও সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কৃষিপণ্য পরিবহনে জ্বালানি সাশ্রয়ী ও বৈদ্যুতিক যানবাহন চালু করা। আঞ্চলিক লজিস্টিক কেন্দ্র ও শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।রেল ও নৌপথভিত্তিক পণ্য পরিবহন বৃদ্ধি করা।

৬. জ্বালানি ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় সমন্বয়
সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। সমন্বিত আঞ্চলিক জ্বালানি পরিকল্পনা সেল গঠন করা। স্থানীয় সরকার, পল্লী বিদ্যুৎ সংস্থা ও জ্বালানি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা। তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা ও জ্বালানি চাহিদার মানচিত্র তৈরি করা। জ্বালানি নীতিমালা বাস্তবায়নে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

৭. জ্বালানি রূপান্তরে বিনিয়োগ ও অর্থায়ন বৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণ করা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে কর ছাড় ও ভর্তুকি প্রদান করা। গ্রামীণ পর্যায়ে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে সৌর প্রযুক্তির বিস্তার ঘটানো।

৮. সচেতনতা ও সক্ষমতা উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের জন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন জরুরি। কৃষক ও উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা। স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ প্রযুক্তিবিদ তৈরি করা। জ্বালানি সাশ্রয় বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। শিক্ষাক্রমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

জ্বালানি সাশ্রয়ী নগরায়ন পরিকল্পনার আহ্বান

সর্বশেষ আপডেট ০৭:২৯:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

জ্বালানি সংকট এবং পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নগরায়ন ও উন্নয়ন কৌশলের পরিবর্তন আনার কোন বিকল্প নেই। নগর এলাকায় গণপরিবহন ব্যবস্থার ঘাটতি ও ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থা, আবাসন পরিকল্পনায় প্রাকৃতিক ব্যবস্থা এবং সবুজ-খাল-জলাশয় ধ্বংস, বিল্ডিং ডিজাইন ও স্থাপত্যে আলো-বাতাসের প্রবেশের সুযোগ বন্ধ করে দিয়ে এসিনির্ভর ও কাঁচঘেরা ভবন নির্মাণ আমাদের জ্বালানি চাহিদা বহুলাংশে বাডিয়ে দিয়েছে।

গ্রামীণ ও আঞ্চলিক উন্নয়নকে এমনভাবে পরিচালনা করা, যাতে জ্বালানি ব্যবহার কমিয়ে টেকসই, দক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা।

আজ শুক্রবার রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সম্মেলন কক্ষে “জ্বালানি সংকট এবং পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নগরায়ন ও উন্নয়ন ভাবনা” শীর্ষক ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)এর আয়োজনে সংলাপে বক্তারা একথা বলেন।

আইপিডি সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান।

এছাড়াও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) -এর সভাপতি ড. আরিফুল ইসলাম, বাংলাদেশ ট্রাফিক ও ট্রান্সপোর্ট ফোরামের সভাপতি সাজেদুল হক, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর শিক্ষক ও আইপিডির রিসার্চ ফেলো কে এম আসিফ ইকবাল, আইপিডি রিসার্চ ফেলো ড. ফরহাদুর রেজা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ‍্যাপক ড. শাম্মী আক্তার সেতু, পরিকল্পনাবিদ আবু নঈম সোহাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মাদ উল্লাহ, টেন মিনিট স্কুলের ফারহান সাকিব, গবেষক এহসান রেজা অনিম, ক্লিন প্রকল্পের ক‍্যাম্পেইন অফিসার মো. নোমান।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পরিকল্পনাবিদ সাজিদ ইকবাল, ব্যারিস্টার শাহরিয়ার ইয়াসিন খান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও আইপিডির রিসার্চ এসিসটেন্ট কাজী তাসনিয়া তাবাস্সুম, জিনিয়াস জান্নাত, উম্মি হানি ইয়াসমিন প্রীতি, সমর্পিতা ঘোষ, প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ সজীব, ইকতিদার চৌধুরী, পরিকল্পনাবিদ মুস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ ।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, আমাদের দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি অনুমোদন ও বাস্তবায়নের পাশাপাশি গ্রীন বিল্ডিং কোড প্রণয়ন করতে হবে।

ভবন, অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পের এনার্জি ডিমান্ড ও ইম্প্যাক্ট এসেসমেন্ট করা। ভবনের উচ্চতা ও ঘনত্বের ভারসাম্য নিশ্চিত করতে অপ্রয়োজনীয় উচ্চ ভবনের পরিবর্তে মাঝারি উচ্চতার ঘনবসতিপূর্ণ উন্নয়ন উৎসাহিত করতে হবে। সৌরবিদ্যুত সম্প্রসারণে সকল ধরনের ট্যাক্স বাতিল করতে হবে।

জ্বালানি পরিকল্পনার সাথে নগর পরিকল্পনা ও ইমারত নির্মাণ কোড ও বিধিমালার সমন্বয় করতে হবে। দেশের কৃষি, জরুরি খাদ্য পরিবহন ব্যবস্থা, গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, ফার্মাসিউটিক্যালস, সেচ ব্যবস্থাসহ জ্বালানি অগ্রাধিকার তৈরি করা প্রয়োজন। টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হলে নগর, আঞ্চলিক ও গ্রামীণ পরিকল্পনার সঙ্গে জ্বালানি বিষয়কে সমন্বিত করতে হবে।

মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানির চাহিদা ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় এনার্জি ডিমান্ড ম্যাপিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকায় জ্বালানির চাহিদা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি, যা একটি বৈষম্য তৈরি করছে। এই বৈষম্য কমাতে পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ বণ্টন ও ব্যবস্থাপনা করতে হবে। উন্নয়ন বাজেটের মতো বিদ্যুৎ বরাদ্দেও বৈষম্য রয়েছে, যা দেশের উন্নয়নকে এককেন্দ্রিক করে তুলছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে তথ্যনির্ভর পরিকল্পনা ও নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন , নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সোলারসহ বিকল্প জ্বালানির উৎসে অর্থায়ন বাড়াতে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড ও উন্নয়ন অংশীদারদের সহযোগিতা কাজে লাগানো যেতে পারে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে কর-সুবিধা ও ভর্তুকি প্রদান এবং গ্রামীণ পর্যায়ে মাইক্রোফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে সৌর প্রযুক্তির বিস্তার ঘটানো প্রয়োজন।

গণপরিবহনে গুরুত্ব দিতে ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে বাস সার্ভিসে গুরুত্ব দেয়া, সাইকেল ও পদচারীবান্ধব সড়ক তৈরি করলে জ্বালানির চাপ কমবে। পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে রেলপথ ও নৌপথেও গুরুত্ব দিতে হবে। ঢাকাভিত্তিক এককেন্দ্রিক নগরায়ন থেকে বের হয়ে বহুকেন্দ্রিক (পলিসেন্ট্রিক) নগরায়ন দেশের উন্নয়নকে আরও স্থায়িত্বশীল করবে।

ড. আরিফুল ইসলাম বলেন, গ্রামে জ্বালানি ঘাটতির কারণে শহরমুখী প্রবণতা বাড়ছে, যা বিকেন্দ্রীকরণ ও টেকসই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। তিনি উন্নত গণপরিবহন, গ্রিন বিল্ডিং, ট্রানজিট-অরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট এবং জ্বালানি দক্ষতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। দেশের স্থানিক পরিকল্পনা বিল অনুমোদন হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দেশের জ্বালানি চাহিদা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

সাজেদুল হক বলেন, আমাদের নগর উন্নয়নে এলোমেলো ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তনির্ভর পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে। তিনি গণপরিবহনভিত্তিক যাতায়াত ব্যবস্থা, সমন্বিত বাস রুট পরিচালনা, ছায়াযুক্ত ফুটপাত ও পৃথক সাইকেল লেন নির্মাণের ওপর জোর দেন। পাশাপাশি সামাজিক আচরণে পরিবর্তন, রিকশাকে আধুনিক ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় এবং বিদ্যুৎচালিত ও হাইব্রিড যানবাহনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে টেকসই নগর তৈরি করবার আহ্বান জানান।

কে এম আসিফ ইকবাল বলেন, আমাদের গ্রামে এখন বিদ্যুৎ কেবল মাঝে মাঝে আসে। বিগত সরকার সৌর বিদ্যুৎ সম্প্রসারণের নীতি নিয়েছিল। অথচ গোষ্ঠী স্বার্থে বসিয়েছিল সৌর বিদ্যুৎ উপকরণের উপর চড়া কর। সেটা ছিল বড় প্রহসন। বর্তমান সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি অনুমোদন এর আহবান জানান তিনি।

ড. ফরহাদুর রেজা বলেন, বিশ্বব্যাপী ভবনের টেকসই ডিজাইনের মাধ্যমেই জ্বালানির ৪০–৫০% সাশ্রয় করা সম্ভব হয়, তাই গ্রিন বিল্ডিং ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যবসায়ীদের চাপে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার এফএআর (ফার) মান বাড়ানোর ফলে আরও উঁচু ভবন নির্মাণের কারণে জ্বালানির চাহিদা আরও বেড়ে যাবে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে আমাদের নগরের অনেক এলাকায় বহুতল ভবন এর বদলে মাঝারি উচ্চতার ভবন নির্মাণ কৌশলের দিকে যেতে হবে, যা তুলনামূলক জ্বালানি সাশ্রয়ী।

ব্লক-ভিত্তিক উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রিত মিশ্র ভূমি ব্যবহার এবং ব্লু-গ্রিন ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মাধ্যমে টেকসই নগর পরিকল্পনার ওপর জোর দেন তিনি। এছাড়া স্মার্ট গ্রিড ও বিকল্প জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

অধ‍্যাপক ড. শাম্মী আক্তার সেতু বলেন, কার্যকর ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার মাধ্যমে শিল্প, পরিবহন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অন্তর্ভুক্ত করে জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকে টেকসই করা সম্ভব। নাগরিক সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট এর পরিচালক গাউস পিয়ারী ভবনে প্রাকৃতিক আলো বাতাস নিশ্চিত করা এবং ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এর মাধ্যমে জ্বালানিনির্ভরতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন। অবকাঠামো উন্নয়ন, গণপরিবহন সম্প্রসারণ, সাইকেল লেন ও নেটওয়ার্ক উন্নয়নের মাধ্যমে টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশের সমন্বিত টেকসই জ্বালানি নীতি এবং দেশের সুষম নগরায়ন ও উন্নয়নে কয়েকটি প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়।

১. পরিকল্পনার মূল দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে বর্তমান গাড়িনির্ভর ও বেশি জ্বালানি ব্যবহারকারী শহর থেকে সরে এসে কম জ্বালানি ব্যবহারকারী, স্বল্প দূরত্বভিত্তিক শহর গড়ে তোলা। শহরকে এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে যাতে মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত কম হয়। গণপরিবহনকেন্দ্রিক উন্নয়ন ও ঘনবসতিপূর্ণ সংক্ষিপ্ত শহর মডেলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

২. বহুকেন্দ্রিক উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে এসব কেন্দ্রে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। যাতায়াতের চাহিদা কমাতে বাসস্থান, কর্মসংস্থান ও প্রয়োজনীয় সেবা কাছাকাছি রাখতে হবে।

নীল-সবুজ অবকাঠামো বাড়াতে গাছপালা, খাল-বিল ও জলাধার সংরক্ষণ ও বৃদ্ধি করতে হবে। এতে শহরের তাপমাত্রা কমবে, ফলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার কমে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে।

৩. গণপরিবহনকে জ্বালানি নীতির অংশ করতে মেট্রোরেলসহ গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। সংযোগকারী বাস ও হাঁটার পথের সাথে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। অযান্ত্রিক পরিবহন অগ্রাধিকার হাঁটা ও সাইকেল চালানোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ফুটপাত ও সাইকেল চলাচলের পথকে জ্বালানি অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

৪. বিকেন্দ্রীভূত জ্বালানি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ছাদে সৌর বিদ্যুৎ স্থাপন বাড়াতে হবে। এলাকাভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ ও ক্ষুদ্র বিদ্যুৎ জাল গড়ে তুলতে হবে। বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের উপর নির্ভরতা কমবে। স্মার্ট জ্বালানি অবকাঠামো গড়তে সড়কবাতিতে সাশ্রয়ী বাতি ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। চাহিদাভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে ।

৪. আবাসন নকশায় পরিবর্তন এর মাধ্যমে প্রাকৃতিক উপায়ে শীতলীকরণ নিশ্চিত করা দরকার। প্রাকৃতিক বাতাস চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। এতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের প্রয়োজন কমবে। কম জ্বালানি ব্যবহারকারী নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করতে হবে।

৫. ভবনের উচ্চতা ও ঘনত্বের ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় উচ্চ ভবনের পরিবর্তে মাঝারি উচ্চতার ঘনবসতিপূর্ণ উন্নয়ন উৎসাহিত করতে হবে। ছাদে সৌর প্যানেল ও সবুজায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

৬. নগর পরিকল্পনা ও জ্বালানি পরিকল্পনাকে একত্রে বাস্তবায়ন করতে হবে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। শহরের জ্বালানি ব্যবহারের তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। বেশি জ্বালানি ব্যবহারকারী এলাকা শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

খ) আঞ্চলিক ও গ্রামীণ উন্নয়ন পরিকল্পনায় জ্বালানি-সংবেদনশীল নীতি প্রস্তাবনা:

১. বিকেন্দ্রীকৃত জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করা। গ্রামীণ এলাকায় সৌরভিত্তিক মিনি গ্রিড স্থাপন করা, দুর্গম অঞ্চলে গ্রিডবিহীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় জ্বালানি কেন্দ্র গড়ে তোলা। কৃষি, বাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক সৌরভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করা।

২. কৃষিখাতে জ্বালানি রূপান্তর করতে কৃষিখাতে জ্বালানির ব্যবহারকে আধুনিক ও সাশ্রয়ী করা। ডিজেলচালিত সেচ পাম্পকে সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থায় রূপান্তর করা। কৃষিযন্ত্রে বৈদ্যুতিক বা সমন্বিত প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াতে হবে, সার উৎপাদন ও সংরক্ষণে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করা।

৩. গ্রামীণ শিল্প ও কুটিরশিল্পে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। শিল্প ক্লাস্টারভিত্তিক নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহারে ভর্তুকি প্রদান করা। কোল্ড স্টোরেজ, ধানকল ও কাঠ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার জন্য আলাদা বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন করা।

৪. আঞ্চলিক অবকাঠামো উন্নয়নে জ্বালানি সাশ্রয় করতে সব ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পে জ্বালানির ব্যবহার কমানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া। প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে জ্বালানি প্রভাব মূল্যায়ন (এনার্জি ইমপ্যাক্ট এসেসমেন্ট) বাধ্যতামূলক করা। আঞ্চলিক পর্যায়ে উপকেন্দ্র, সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে হবে। গ্রামীণ সড়ক ও বাজার উন্নয়নে জ্বালানি সাশ্রয়ী আলোকসজ্জা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা। শিল্পাঞ্চল স্থাপনের আগে জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা নিশ্চিত করা।

৫. গ্রামীণ অর্থনীতিকে বাজারের সাথে সংযুক্ত করতে দক্ষ ও সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কৃষিপণ্য পরিবহনে জ্বালানি সাশ্রয়ী ও বৈদ্যুতিক যানবাহন চালু করা। আঞ্চলিক লজিস্টিক কেন্দ্র ও শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।রেল ও নৌপথভিত্তিক পণ্য পরিবহন বৃদ্ধি করা।

৬. জ্বালানি ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় সমন্বয়
সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। সমন্বিত আঞ্চলিক জ্বালানি পরিকল্পনা সেল গঠন করা। স্থানীয় সরকার, পল্লী বিদ্যুৎ সংস্থা ও জ্বালানি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা। তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা ও জ্বালানি চাহিদার মানচিত্র তৈরি করা। জ্বালানি নীতিমালা বাস্তবায়নে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

৭. জ্বালানি রূপান্তরে বিনিয়োগ ও অর্থায়ন বৃদ্ধি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণ করা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে কর ছাড় ও ভর্তুকি প্রদান করা। গ্রামীণ পর্যায়ে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে সৌর প্রযুক্তির বিস্তার ঘটানো।

৮. সচেতনতা ও সক্ষমতা উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের জন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন জরুরি। কৃষক ও উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা। স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ প্রযুক্তিবিদ তৈরি করা। জ্বালানি সাশ্রয় বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। শিক্ষাক্রমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা।