ক্রিকেটার নাঈমকে পিটিয়ে থানায় নিল পুলিশ, ৩ জন প্রত্যাহার
- সর্বশেষ আপডেট ১০:৫৪:৫৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
- / 92
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অফস্পিনার নাঈম হাসানকে চলন্ত অটোরিকশা থেকে জোরপূর্বক নামিয়ে রাস্তার ওপর বেধড়ক মারধর করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। গতকাল শুক্রবার রাতে চট্টগ্রাম মহানগরীর লালখান বাজার এলাকায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও নিন্দনীয় ঘটনাটি ঘটে। এখানেই শেষ নয়, মারধরের পর তাঁকে খুলশী থানায় ধরে নিয়ে গিয়েও ওসির কক্ষে চরম হেনস্তা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন নাঈম নিজে। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে খুলশী থানার এক উপপরিদর্শকসহ (এসআই) তিন পুলিশ সদস্যকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে।
ক্রিকেটার নাঈম হাসান রাতে গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, ঢাকায় ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের (ডিপিএল) খেলা শেষ করে শুক্রবার রাত ৯টা ৪০ মিনিটের ফ্লাইটে তাঁর চট্টগ্রামে আসার কথা ছিল। তবে ফ্লাইট বিলম্বিত হওয়ায় রাত ১০টা ২০ মিনিটে তিনি চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। সেখান থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে তিনি নিজের বাসার উদ্দেশে রওনা হন। অটোরিকশাটি এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামার পর লালখান বাজার এলাকায় পৌঁছালে আকস্মিক পুলিশের এক সদস্য গাড়িটি থামানোর সংকেত দেন।
জাতীয় দলের এই ক্রিকেটার বলেন, ‘গাড়ি থামানোর সাথে সাথেই কয়েকজন ব্যক্তি ডিবি পুলিশ পরিচয়ে চালকের কাছ থেকে অটোরিকশার সমস্ত কাগজপত্র কেড়ে নেন। এরপর আমাকে জোর করে গাড়ি থেকে নামিয়ে গলায় ধাক্কা দিয়ে পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। সেই সময় আমি নিজেকে বাংলাদেশ জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দিই এবং আমার অফিশিয়াল পরিচয়পত্রও (আইডি কার্ড) দেখাই। কিন্তু তা সত্ত্বেও ঘটনাস্থলে থাকা খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম তাঁর হাতে থাকা লাঠি দিয়ে আমার কোমরে সজোরে আঘাত করতে থাকেন। একই সাথে পুলিশের ওই এসআইয়ের সঙ্গে থাকা সাদা পোশাকের এক ব্যক্তি (পুলিশের সোর্স সোহেল) তাঁর হাতে থাকা পাইপ দিয়ে আমাকে এলোপাতাড়ি পেটাতে শুরু করেন।’
মারধরের সময় রাস্তায় প্রচুর সাধারণ মানুষ জড়ো হয়ে যায় উল্লেখ করে নাঈম বলেন, ‘ঘটনাস্থলে প্রায় ১০০ থেকে ২০০ মানুষ জড়ো হয়ে আমি যে একজন ক্রিকেটার, সেই পরিচয় দিলেও পুলিশ সদস্যরা মারধর থামায়নি। উল্টো তারা অত্যন্ত উগ্র ভাষায় বলছিল—তুই একজন আসামি, চুপ থাক, একটা কথাও বলবি না।’ মারধরের একপর্যায়ে পুলিশের গাড়ি থাকা সত্ত্বেও সেখানে না তুলে, একটি সাধারণ অটোরিকশায় করে তাঁকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরে এসআই শফিকুল তাঁকে থানায় নিয়ে যান এবং ওসির কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। ওসির কক্ষেও হেনস্তার শিকার হয়েছেন দাবি করে নাঈম বলেন, ‘আমি যখন ওসিকে ঘটনার বিস্তারিত বলছিলাম, তখন ওসি বারবার ধমকের সুরে বলছিলেন চোখ নিচু করে কথা বলতে। এর মধ্যেই ওপর মহল থেকে একটি ফোন পেয়ে ওসির সুর শান্ত হয়।’ নাঈম জানান, অটোরিকশা থেকে নামানোর পরই তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। থানায় ফোনটি ফেরত পাওয়ার পর তিনি দ্রুত বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালকে ফোন করেন। তামিম ইকবাল বিসিবির সদস্য ইসরাফিল খসরুকে জানালে তাঁরা তৎক্ষণাৎ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।
নিন্দনীয় এই ঘটনার কারণ জানতে চাইলে নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমীরুল ইসলাম জানান, ওই অটোরিকশাটিতে করে সোনার চোরাচালান আসবে—এমন একটি গোপন তথ্য পুলিশের কাছে ছিল। তবে সেই তথ্য কতটুকু সঠিক ছিল তা যাচাই করা হচ্ছে। একই সাথে তল্লাশি বা অভিযান চালানোর আগে নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি স্বীকার করেন যে, আপাতদৃষ্টিতে পুলিশের এই অভিযানে নিয়মকানুনের বড় ধরনের ভুলত্রুটি ও গাফিলতি ছিল এবং জড়িত ব্যক্তিদের কঠোর বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনা হবে।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, ছুটিতে ঢাকায় থাকা খুলশী থানার এসআই মনিরুল ইসলাম মূলত একটি গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে এসআই শফিকুল ইসলামকে তথ্য দিয়েছিলেন যে, একটি নির্দিষ্ট অটোরিকশায় সোনার চোরাচালান আসছে। সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই শফিকুল লালখান বাজারে এই হঠকারী অভিযানে যান।
জাতীয় দলের ক্রিকেটারের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলার খবর পেয়ে মধ্যরাতে থানায় ছুটে যান নাঈমের বাবা মাহবুবুল আলম, আত্মীয়-স্বজন এবং শত শত ক্ষুব্ধ ক্রিকেটপ্রেমী। নাঈমের বাবা অভিযোগ করেন, থানায় আসার পর ডিউটি অফিসার তাঁর সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেছেন। উপস্থিত জনতা জড়িত পুলিশ সদস্যদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। খুলশী থানার ওসি আরিফুর রহমান জানান, অভিযানের বিষয়ে এসআই শফিকুল তাঁকে আগে থেকে কিছুই জানাননি। থানায় আনার পর নাঈমের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তাঁরা দুঃখ প্রকাশ করেন এবং সসম্মানে চলে যেতে বলেন। কিন্তু নাঈম ও তাঁর পরিবার জড়িতদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত থানা থেকে নড়বেন না বলে জানান।
পরবর্তীতে আজ শনিবার সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে খুলশী থানায় মারধর ও অপহরণ চেষ্টার অভিযোগ এনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন। মামলায় এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল এবং পুলিশের সোর্স সোহেলকে সরাসরি নামীয় আসামি করা হয়েছে। এদিকে ঘটনাটি খতিয়ে দেখে তাৎক্ষণিকভাবে এসআই শফিকুল ও কনস্টেবল রাসেলসহ অভিযানে থাকা তিনজনকে ক্লোজড করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে থানা প্রশাসন।

































