সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা, দুই শিশুকে নিয়ে দিশেহারা স্ত্রী
- সর্বশেষ আপডেট ০১:৩৫:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
- / 46
‘বাচ্চাদের ভাত খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। আমার আসতে একটু দেরি হবে, একটা নিউজ নিয়ে ব্যস্ত আছি।’ বৃহস্পতিবার রাতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় স্ত্রী আনন্দিতা সাংমাকে এ কথাই বলেছিলেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। কিন্তু সেই রাতে আর বাড়ি ফেরা হয়নি তাঁর। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ হারান তিনি। স্বামীকে হারিয়ে চার বছর বয়সী মেয়ে ও দেড় বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন আনন্দিতা।
বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে দুর্গাপুর পৌরসভার তেলনজিয়া এলাকায় একটি দোকানের সামনে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। ৪৪ বছর বয়সী লুৎফুজ্জামান বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ানকে স্ত্রীর কোলে দিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর গ্রামের একটি দোকানের সামনে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
স্বামীর মরদেহের পাশে ছেলেকে কোলে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আনন্দিতা সাংমা। তিনি বলেন, ‘এভাবে একজন মানুষকে কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলি করে মেরে ফেলবে, তা আমি কখনো ভাবতে পারিনি। বাচ্চাদের যখন ভাত খাওয়াচ্ছিলাম, তখন গুলির শব্দ পেয়ে প্রথমে ভেবেছিলাম, কেউ হয়তো পটকা ফুটাচ্ছে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মানুষ বলাবলি করল, তাঁকে মেরে ফেলেছে।’
স্বামী হত্যার বিচার দাবি করে আনন্দিতা বলেন, ‘আমি তো আমার স্বামীকে আর ফিরে পাব না। তবে যারা আমার স্বামীকে মেরেছে, আমার অবুঝ দুটি শিশুকে পিতৃহারা করেছে, পুলিশ তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনুক। তাদের কঠিন শাস্তি হোক, এটাই আমি চাই।’
লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলা টেলিভিশনের নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন তিনি। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে লেখালেখির পাশাপাশি ভিডিও প্রকাশ করতেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের শুনই গ্রামে। তিনি মহব্বত আলী ফকিরের ছেলে। দুর্গাপুরের তেলনজিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে তেলনজিয়ার একটি চায়ের দোকানে চা পান করেন লুৎফুজ্জামান। পরে বিরিশিরি উতরাইল বাজারের উদ্দেশে রওনা হন। তবে নিজের মুঠোফোন দোকানে ফেলে যাওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে আবার ফিরে আসেন তিনি। ফোন নিয়ে দোকান থেকে বের হওয়ার সময় সেখানে দুই যুবক এসে দোকানদারের কাছে সিগারেট চান। এরপর তাঁরা লুৎফুজ্জামানকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি ছোড়েন।
গুলির শব্দ শুনে স্থানীয় লোকজন ছুটে এলে দুই যুবক পালিয়ে যান। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় লুৎফুজ্জামানকে উদ্ধার করে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
দোকানি রবিন রাংসা জানান, চা পান শেষে মুঠোফোন ফেলে যাওয়ায় লুৎফুজ্জামান আবার দোকানে ফিরে আসেন। তিনি ফোন নিয়ে বের হওয়ার সময় দুই যুবক সিগারেট চান। এরপরই গুলি করা হয়। তিনি পরপর চারটি গুলির শব্দ শুনেছেন। ভয়ে তিনি বাড়িতে চলে যান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। তাঁদের একজনের পরনে লুঙ্গি, অন্যজনের পরনে প্যান্ট ছিল। গুলি চালানোর পর স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে তাঁরা পালিয়ে যান।
লুৎফুজ্জামানের শ্বশুরবাড়ির লোকজন জানান, ঘটনার কিছুক্ষণ আগে তাঁরা বাড়ির বারান্দায় বসে গল্প করছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে দোকানের কাছে গিয়ে লুৎফুজ্জামানকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। তাঁর মাথা, গলা ও বুক থেকে রক্ত ঝরছিল।
প্রায় ছয় বছর আগে তেলনজিয়া গ্রামের শিলা সাংমা ও প্রয়াত ফিলিপ রাংসার মেয়ে আনন্দিতা সাংমাকে বিয়ে করেন লুৎফুজ্জামান। তাঁদের সংসারে চার বছর বয়সী মেয়ে প্রান্থি ও দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ান রয়েছে।
এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় আহত হয়েছিলেন লুৎফুজ্জামান আলিফ। তাঁকে কুপিয়ে জখম করা হয়েছিল। ওই সময় তাঁর সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাঁকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মাহফুজা খাতুন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলাম, দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ খান এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাদাতসহ পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর জেলার সব থানাকে সতর্ক করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিকভাবে হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে। ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির খোসা ও একটি অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য লুৎফুজ্জামানের মরদেহ নেত্রকোনা জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।





























