ঢাকা ১০:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুই মন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান, আদিবাসীদের ৪ দাবি

সিনিয়র প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৭:৫৩:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
  • / 12

দুই মন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান, আদিবাসীদের ৪ দাবি

বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নেই; সরকারের দুই মন্ত্রীর এমন বক্তব্যকে ‘আপত্তিকর, ইতিহাস ও বাস্তবতাবিবর্জিত’ আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন আদিবাসী ছাত্র, যুব, নারী ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। একই সঙ্গে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ চার দফা দাবি উত্থাপন করেছে তারা।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচটিআরএফ) পক্ষ থেকে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে এসব কথা জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১১ আগস্ট ঢাকার একটি হোটেলে সিএইচটিআরএফ আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সবাই বাংলাদেশি নাগরিক এবং এখানে কোনো ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠী নেই।

একই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটি অপ্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া ২০০৭ সালে জাতিসংঘের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্র এবং আইএলও কনভেনশন-১৬৯ নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্যেরও সমালোচনা করা হয়েছে বিবৃতিতে।

সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশ একটি বহু জাতি, বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির দেশ। বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ৫০টিরও বেশি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা নিয়ে বসবাস করছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রামে আদিবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তবে স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকারের সময়ে তাদের ন্যায্য অধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত হয়নি। ফলে বর্তমানে অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠী অস্তিত্ব, ভূমি ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে সংকটের মুখে রয়েছে।

জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক ঘোষণাপত্র প্রসঙ্গে বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে এ ঘোষণাপত্রের নীতি বাস্তবায়নের নৈতিক দায়িত্ব বহন করে। আদিবাসীদের ভূমি, সংস্কৃতি ও মানবাধিকার রক্ষায় বিভিন্ন দেশের পরবর্তী অবস্থানের উদাহরণও তুলে ধরা হয়।

বক্তব্যে আদিবাসীদের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার নামে তাদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ও জীবনাচরণকে একীভূত করার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংগঠনগুলোর মতে, এমন দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্র গঠনের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিবৃতিতে সরকারকে আদিবাসীদের পরিচয় ও অধিকারকে নিরাপত্তার দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে ন্যায়, সমতা, অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়।

চার দফা দাবি

আদিবাসী ছাত্র, যুব ও নারী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে চারটি দাবি জানানো হয়েছে;

১. বাংলাদেশের আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
২. আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসহ আদিবাসীদের ভূমি, ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৩. আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জ্ঞান সংরক্ষণ, সুরক্ষা, নিয়ন্ত্রণ ও বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৪. ২০০৭ সালের জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিবৃতিতে বিভিন্ন আদিবাসী ছাত্র, যুব, নারী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা স্বাক্ষর করেছেন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিল, ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরাম, বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফোরাম, বম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ম্রো স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ খুমী স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন, বাংলাদেশ হাজং ছাত্র সংগঠন, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন সংগঠন রয়েছে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

দুই মন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাখ্যান, আদিবাসীদের ৪ দাবি

সর্বশেষ আপডেট ০৭:৫৩:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নেই; সরকারের দুই মন্ত্রীর এমন বক্তব্যকে ‘আপত্তিকর, ইতিহাস ও বাস্তবতাবিবর্জিত’ আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন আদিবাসী ছাত্র, যুব, নারী ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। একই সঙ্গে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ চার দফা দাবি উত্থাপন করেছে তারা।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচটিআরএফ) পক্ষ থেকে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে এসব কথা জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১১ আগস্ট ঢাকার একটি হোটেলে সিএইচটিআরএফ আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সবাই বাংলাদেশি নাগরিক এবং এখানে কোনো ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠী নেই।

একই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটি অপ্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া ২০০৭ সালে জাতিসংঘের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্র এবং আইএলও কনভেনশন-১৬৯ নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্যেরও সমালোচনা করা হয়েছে বিবৃতিতে।

সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশ একটি বহু জাতি, বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির দেশ। বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ৫০টিরও বেশি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা নিয়ে বসবাস করছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রামে আদিবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তবে স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকারের সময়ে তাদের ন্যায্য অধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত হয়নি। ফলে বর্তমানে অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠী অস্তিত্ব, ভূমি ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে সংকটের মুখে রয়েছে।

জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক ঘোষণাপত্র প্রসঙ্গে বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে এ ঘোষণাপত্রের নীতি বাস্তবায়নের নৈতিক দায়িত্ব বহন করে। আদিবাসীদের ভূমি, সংস্কৃতি ও মানবাধিকার রক্ষায় বিভিন্ন দেশের পরবর্তী অবস্থানের উদাহরণও তুলে ধরা হয়।

বক্তব্যে আদিবাসীদের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার নামে তাদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ও জীবনাচরণকে একীভূত করার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংগঠনগুলোর মতে, এমন দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্র গঠনের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিবৃতিতে সরকারকে আদিবাসীদের পরিচয় ও অধিকারকে নিরাপত্তার দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে ন্যায়, সমতা, অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়।

চার দফা দাবি

আদিবাসী ছাত্র, যুব ও নারী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে চারটি দাবি জানানো হয়েছে;

১. বাংলাদেশের আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
২. আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসহ আদিবাসীদের ভূমি, ভূখণ্ড ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৩. আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জ্ঞান সংরক্ষণ, সুরক্ষা, নিয়ন্ত্রণ ও বিকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৪. ২০০৭ সালের জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিবৃতিতে বিভিন্ন আদিবাসী ছাত্র, যুব, নারী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা স্বাক্ষর করেছেন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিল, ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরাম, বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফোরাম, বম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ম্রো স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ খুমী স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন, বাংলাদেশ হাজং ছাত্র সংগঠন, হিল উইমেন্স ফেডারেশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন সংগঠন রয়েছে।