ঢাকা ০৮:৫৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সমতাভিত্তিক সমাজ গড়তে তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান

সিনিয়র প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৭:৪৩:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬
  • / 6

সমতাভিত্তিক সমাজ গড়তে তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান

সমান অধিকারভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় তরুণ প্রজন্মকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেছেন, তরুণদের অভিজ্ঞতা, চিন্তা ও চাহিদা সমন্বিত আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপপরিষদের উদ্যোগে রাজধানীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে প্রস্তাবিত অভিন্ন পারিবারিক আইন নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। মুখ্য আলোচক ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ, আইনবিদ ও গবেষক ফউজুল আজিম। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রেহানা মাসুদা বেগম, লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহা, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সিউতি সবুরসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

মতবিনিময় সভায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ শিক্ষার্থীসহ বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও কর্মকর্তারা অংশ নেন। সভাটি সঞ্চালনা করেন লিগ্যাল এইড অফিসার সিননোমে মারমা।

স্বাগত বক্তব্যে মালেকা বানু বলেন, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে নারীর বঞ্চনার অন্যতম শিকড় হলো সম্পত্তি ও প্রজনন অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করার প্রচেষ্টা। বৈষম্যের এই কাঠামো পরিবর্তনে চিন্তার বিকাশ ও মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কাজ করে আসছে। পারিবারিক আইনের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা কীভাবে নারীদের অধিকার সংকুচিত করেছে, তা অনুধাবন করেই সংগঠনটি নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা বন্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

তরুণদের উদ্দেশে মালেকা বানু বলেন, দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় তরুণদের এসব বিষয় সম্পর্কে জানা, বোঝা ও সচেতন হওয়া জরুরি।

ড. সিউতি সবুর বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতার অনেক ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশে প্রচলিত ধর্মীয় ও পারিবারিক আইন কীভাবে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ, বিশেষ করে নারীদের জীবনে বৈষম্য ও বঞ্চনার তৈরি করে, তা শিক্ষার্থীদের অনুধাবন করা প্রয়োজন।

সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, শিক্ষার্থীরা অভিন্ন পারিবারিক আইন বাস্তবায়নের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের যুক্ত হওয়ার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে সংগঠনকে অবহিত করার আহ্বান জানান।

লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহা বলেন, আশির দশক থেকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ, সুরক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। সমাজের শেকড় থেকে পরিবর্তন আনতে হলে মানুষের চিন্তার পরিবর্তন জরুরি, বিশেষ করে তরুণদের চিন্তার বিকাশ প্রয়োজন। তার মতে, নাগরিক অধিকার হিসেবে অভিন্ন পারিবারিক আইন স্বীকৃতি পেলে নারীর প্রতি সহিংসতা কমাতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মুখ্য আলোচক ফউজুল আজিম অভিন্ন পারিবারিক আইনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি রোমান আইন, ক্যানন আইন ও ব্রিটিশ ভারতের আইনব্যবস্থার সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা করেন। পাশাপাশি অভিন্ন পারিবারিক আইনের যৌক্তিকতা, তাত্ত্বিক ভিত্তি, সম্ভাব্য সুফল, সমালোচনা, বৈশ্বিক বাস্তবতা, সিডও সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান একদিকে সব নাগরিকের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছে, অন্যদিকে প্রত্যেকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করেছে। তাই ধর্মীয় আইন ও অভিন্ন পারিবারিক আইনের প্রয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের বাস্তবতাও আইনে প্রতিফলিত হওয়া দরকার।

মতবিনিময় সভায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তিনটি দলীয় উপস্থাপনা দেন। এতে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান পারিবারিক আইনের প্রচলিত কাঠামো, ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োগের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

মুক্ত আলোচনায় অ্যাডভোকেট দীপ্তি সিকদার বলেন, পারিবারিক ও সামাজিক প্রথা এবং প্রচলিত আইনে অধিকারহীনতা থাকলেও নিজেদের দৈনন্দিন জীবনাচরণে কাঙ্ক্ষিত অধিকার প্রতিষ্ঠার চর্চা করতে হবে।

সিননোমে মারমা বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর কেউ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, আবার কেউ নিজস্ব গোত্রীয় রীতি অনুসরণ করেন। কিন্তু পারিবারিক ও উত্তরাধিকার আইনের ক্ষেত্রে তাদের কেউ হিন্দু, কেউ খ্রিস্টান আইন অনুসরণ করেন। এ বাস্তবতায় বৌদ্ধ ও বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মানুষের পারিবারিক অধিকার নিশ্চিত করতে পৃথক ও কার্যকর আইন প্রণয়নের প্রয়োজন রয়েছে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

সমতাভিত্তিক সমাজ গড়তে তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান

সর্বশেষ আপডেট ০৭:৪৩:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

সমান অধিকারভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় তরুণ প্রজন্মকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেছেন, তরুণদের অভিজ্ঞতা, চিন্তা ও চাহিদা সমন্বিত আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপপরিষদের উদ্যোগে রাজধানীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে প্রস্তাবিত অভিন্ন পারিবারিক আইন নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। মুখ্য আলোচক ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ, আইনবিদ ও গবেষক ফউজুল আজিম। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রেহানা মাসুদা বেগম, লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহা, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সিউতি সবুরসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

মতবিনিময় সভায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ শিক্ষার্থীসহ বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও কর্মকর্তারা অংশ নেন। সভাটি সঞ্চালনা করেন লিগ্যাল এইড অফিসার সিননোমে মারমা।

স্বাগত বক্তব্যে মালেকা বানু বলেন, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে নারীর বঞ্চনার অন্যতম শিকড় হলো সম্পত্তি ও প্রজনন অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করার প্রচেষ্টা। বৈষম্যের এই কাঠামো পরিবর্তনে চিন্তার বিকাশ ও মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কাজ করে আসছে। পারিবারিক আইনের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা কীভাবে নারীদের অধিকার সংকুচিত করেছে, তা অনুধাবন করেই সংগঠনটি নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা বন্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

তরুণদের উদ্দেশে মালেকা বানু বলেন, দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় তরুণদের এসব বিষয় সম্পর্কে জানা, বোঝা ও সচেতন হওয়া জরুরি।

ড. সিউতি সবুর বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতার অনেক ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশে প্রচলিত ধর্মীয় ও পারিবারিক আইন কীভাবে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ, বিশেষ করে নারীদের জীবনে বৈষম্য ও বঞ্চনার তৈরি করে, তা শিক্ষার্থীদের অনুধাবন করা প্রয়োজন।

সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, শিক্ষার্থীরা অভিন্ন পারিবারিক আইন বাস্তবায়নের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের যুক্ত হওয়ার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে সংগঠনকে অবহিত করার আহ্বান জানান।

লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহা বলেন, আশির দশক থেকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ, সুরক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। সমাজের শেকড় থেকে পরিবর্তন আনতে হলে মানুষের চিন্তার পরিবর্তন জরুরি, বিশেষ করে তরুণদের চিন্তার বিকাশ প্রয়োজন। তার মতে, নাগরিক অধিকার হিসেবে অভিন্ন পারিবারিক আইন স্বীকৃতি পেলে নারীর প্রতি সহিংসতা কমাতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মুখ্য আলোচক ফউজুল আজিম অভিন্ন পারিবারিক আইনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি রোমান আইন, ক্যানন আইন ও ব্রিটিশ ভারতের আইনব্যবস্থার সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা করেন। পাশাপাশি অভিন্ন পারিবারিক আইনের যৌক্তিকতা, তাত্ত্বিক ভিত্তি, সম্ভাব্য সুফল, সমালোচনা, বৈশ্বিক বাস্তবতা, সিডও সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান একদিকে সব নাগরিকের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছে, অন্যদিকে প্রত্যেকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করেছে। তাই ধর্মীয় আইন ও অভিন্ন পারিবারিক আইনের প্রয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের বাস্তবতাও আইনে প্রতিফলিত হওয়া দরকার।

মতবিনিময় সভায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তিনটি দলীয় উপস্থাপনা দেন। এতে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান পারিবারিক আইনের প্রচলিত কাঠামো, ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োগের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

মুক্ত আলোচনায় অ্যাডভোকেট দীপ্তি সিকদার বলেন, পারিবারিক ও সামাজিক প্রথা এবং প্রচলিত আইনে অধিকারহীনতা থাকলেও নিজেদের দৈনন্দিন জীবনাচরণে কাঙ্ক্ষিত অধিকার প্রতিষ্ঠার চর্চা করতে হবে।

সিননোমে মারমা বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর কেউ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, আবার কেউ নিজস্ব গোত্রীয় রীতি অনুসরণ করেন। কিন্তু পারিবারিক ও উত্তরাধিকার আইনের ক্ষেত্রে তাদের কেউ হিন্দু, কেউ খ্রিস্টান আইন অনুসরণ করেন। এ বাস্তবতায় বৌদ্ধ ও বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মানুষের পারিবারিক অধিকার নিশ্চিত করতে পৃথক ও কার্যকর আইন প্রণয়নের প্রয়োজন রয়েছে।