ঢাকা ০৪:০১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রাত ২টা ৪০ মিনিটে নিহত প্রীতিলতার ফোন

রংপুরে চার খুনের রহস্যে নতুন মোড়

সিনিয়র প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০১:৩০:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬
  • / 17

রংপুরে চার খুনের রহস্যে নতুন মোড়

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের সঙ্গে সংগৃহীত তথ্যের বেশ কিছু অসংগতি পেয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের সময়রেখা, রহস্যজনক ফোনকল, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং ফরেনসিক আলামত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত আসকের প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনে এসব বিষয় উঠে এসেছে। এর আগে ২৪ ও ২৫ আগস্ট আসকের দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রংপুরে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করে। তারা নিহতদের স্বজন ও প্রতিবেশী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য, পুলিশ, ডিবি, মর্গ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

প্রতিবেদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর মুঠোফোন থেকে রাত ২টা ৪০ মিনিটে তার বোন পূজা চক্রবর্তীর নম্বরে করা একটি কল। পূজার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে বোনের সঙ্গে তার স্বাভাবিক কথা হয়। এরপর রাত ২টা ৪০ মিনিটে প্রীতিলতার নম্বর থেকে তার কাছে একটি কল আসে। তবে তিনি তখন ফোনটি ধরতে পারেননি।

অন্যদিকে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের শেষভাগে অভিযুক্তরা বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিলেন। এ সময় গণপতি চক্রবর্তীর সঙ্গে তাদের বাগ্‌বিতণ্ডা হয় এবং পরে ভোরের দিকে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয়।

এই দুই তথ্যের মধ্যে সময়ের যে অসংগতি দেখা যাচ্ছে, তা গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছে আসক। সংগঠনটির মতে, রাত ২টা ৪০ মিনিটে ফোনটি কে করেছিলেন, তখন মুঠোফোনটির অবস্থান কোথায় ছিল এবং এরপর কখন পরিবারের সদস্যদের ফোন বন্ধ হয়ে যায়; এসব তথ্য কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), মোবাইল লোকেশন ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় পরিচয় গোপন রাখতে চারজনকে একে একে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। হত্যার পর অভিযুক্তরা দীর্ঘ সময় ওই বাসায় অবস্থান করে খাবারও খেয়েছিলেন বলে পুলিশের দাবি।

তবে এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ে স্বাধীন ফরেনসিক পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আসক। সংস্থাটি বলেছে, অভিযুক্তরা যদি দীর্ঘ সময় বাড়িতে অবস্থান করে থাকেন এবং সেখানে খাবার খেয়ে থাকেন, তাহলে ঘরের আসবাব, রান্নাঘর, ব্যবহৃত পাত্র, বাথরুমসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থান থেকে ডিএনএ, আঙুলের ছাপ, ত্বকের কোষ ও চুলের মতো জৈবিক আলামত সংগ্রহ করা হয়েছিল কি না, তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

হত্যাকাণ্ডের রাতে বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনার কথা বলেছে আসক। পুলিশের পক্ষ থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা এড়াতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও, ঠিক কখন, কীভাবে এবং কার মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, তা প্রযুক্তিগতভাবে নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

তথ্য সংগ্রহের সময় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেন আসকের প্রতিনিধিরা। সিদ্ধার্থের বাবা তার ছেলেকে আটকের সময় পোশাক পরিবর্তন এবং ঘটনার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অপর অভিযুক্ত সীমান্তের পরিবারের সদস্যরাও প্রতিনিধিদলের কাছে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে না পারলেও মর্গের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন আসক প্রতিনিধিরা। তাদের কাছ থেকে মরদেহে পচনের লক্ষণ ও আঘাতের তথ্য পাওয়া গেলেও যৌন নির্যাতনের দৃশ্যমান কোনো আলামত তারা দেখেননি বলে জানিয়েছেন। তবে এসব চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা না করে ময়নাতদন্ত এবং সিআইডির ল্যাবরেটরি পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ, আঘাতের ধরন ও নির্যাতনের বিষয় নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে আসক।

রংপুর ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং বিভ্রান্তি এড়াতে সব ধরনের আলামত যাচাই করা হচ্ছে।

তবে আসকের মতে, হত্যাকাণ্ড নিয়ে মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া নানা প্রশ্ন ও সংশয় দূর করতে হলে অনুমাননির্ভর তদন্তের পরিবর্তে প্রতিটি সূত্রকে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিনির্ভর পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনটি।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

রাত ২টা ৪০ মিনিটে নিহত প্রীতিলতার ফোন

রংপুরে চার খুনের রহস্যে নতুন মোড়

সর্বশেষ আপডেট ০১:৩০:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের সঙ্গে সংগৃহীত তথ্যের বেশ কিছু অসংগতি পেয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের সময়রেখা, রহস্যজনক ফোনকল, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং ফরেনসিক আলামত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত আসকের প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনে এসব বিষয় উঠে এসেছে। এর আগে ২৪ ও ২৫ আগস্ট আসকের দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল রংপুরে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করে। তারা নিহতদের স্বজন ও প্রতিবেশী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য, পুলিশ, ডিবি, মর্গ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

প্রতিবেদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর মুঠোফোন থেকে রাত ২টা ৪০ মিনিটে তার বোন পূজা চক্রবর্তীর নম্বরে করা একটি কল। পূজার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে বোনের সঙ্গে তার স্বাভাবিক কথা হয়। এরপর রাত ২টা ৪০ মিনিটে প্রীতিলতার নম্বর থেকে তার কাছে একটি কল আসে। তবে তিনি তখন ফোনটি ধরতে পারেননি।

অন্যদিকে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের শেষভাগে অভিযুক্তরা বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিলেন। এ সময় গণপতি চক্রবর্তীর সঙ্গে তাদের বাগ্‌বিতণ্ডা হয় এবং পরে ভোরের দিকে পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয়।

এই দুই তথ্যের মধ্যে সময়ের যে অসংগতি দেখা যাচ্ছে, তা গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছে আসক। সংগঠনটির মতে, রাত ২টা ৪০ মিনিটে ফোনটি কে করেছিলেন, তখন মুঠোফোনটির অবস্থান কোথায় ছিল এবং এরপর কখন পরিবারের সদস্যদের ফোন বন্ধ হয়ে যায়; এসব তথ্য কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), মোবাইল লোকেশন ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় পরিচয় গোপন রাখতে চারজনকে একে একে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। হত্যার পর অভিযুক্তরা দীর্ঘ সময় ওই বাসায় অবস্থান করে খাবারও খেয়েছিলেন বলে পুলিশের দাবি।

তবে এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ে স্বাধীন ফরেনসিক পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আসক। সংস্থাটি বলেছে, অভিযুক্তরা যদি দীর্ঘ সময় বাড়িতে অবস্থান করে থাকেন এবং সেখানে খাবার খেয়ে থাকেন, তাহলে ঘরের আসবাব, রান্নাঘর, ব্যবহৃত পাত্র, বাথরুমসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থান থেকে ডিএনএ, আঙুলের ছাপ, ত্বকের কোষ ও চুলের মতো জৈবিক আলামত সংগ্রহ করা হয়েছিল কি না, তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

হত্যাকাণ্ডের রাতে বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনার কথা বলেছে আসক। পুলিশের পক্ষ থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা এড়াতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও, ঠিক কখন, কীভাবে এবং কার মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, তা প্রযুক্তিগতভাবে নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

তথ্য সংগ্রহের সময় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেন আসকের প্রতিনিধিরা। সিদ্ধার্থের বাবা তার ছেলেকে আটকের সময় পোশাক পরিবর্তন এবং ঘটনার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অপর অভিযুক্ত সীমান্তের পরিবারের সদস্যরাও প্রতিনিধিদলের কাছে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে না পারলেও মর্গের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন আসক প্রতিনিধিরা। তাদের কাছ থেকে মরদেহে পচনের লক্ষণ ও আঘাতের তথ্য পাওয়া গেলেও যৌন নির্যাতনের দৃশ্যমান কোনো আলামত তারা দেখেননি বলে জানিয়েছেন। তবে এসব চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা না করে ময়নাতদন্ত এবং সিআইডির ল্যাবরেটরি পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ, আঘাতের ধরন ও নির্যাতনের বিষয় নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে আসক।

রংপুর ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং বিভ্রান্তি এড়াতে সব ধরনের আলামত যাচাই করা হচ্ছে।

তবে আসকের মতে, হত্যাকাণ্ড নিয়ে মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া নানা প্রশ্ন ও সংশয় দূর করতে হলে অনুমাননির্ভর তদন্তের পরিবর্তে প্রতিটি সূত্রকে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিনির্ভর পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনটি।