ঢাকা ১২:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬, ৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সেন্টমার্টিনে পরিবেশ ধ্বংসের উৎসব চলছে

দিদারুল ইসলাম, কক্সবাজার
  • সর্বশেষ আপডেট ১২:১৮:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
  • / 8

সেন্টমার্টিনে পরিবেশ ধ্বংসের উৎসব চলছে

পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে সেন্টমার্টিন দ্বীপে অবকাঠামো নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় ইট-সিমেন্টের বহুতল ভবন, হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি দ্বীপ ঘুরে অন্তত ১০টি নির্মাণাধীন স্থাপনার সন্ধান পাওয়া গেছে, যার বেশিরভাগই বহুতল।

সেন্টমার্টিনের একমাত্র জেটি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে শিলবনিয়া সৈকত। সামুদ্রিক কাছিমের অন্যতম প্রজননস্থল এই সৈকত ঘেঁষে টেকনাফ উপজেলা অফিসার্স সমবায় সমিতি লিমিটেডের নামে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এর পাশে চট্টগ্রামের মজনুর মালিকানাধীন ‘দীপান্বিতা’ রিসোর্ট এবং ঢাকার ইমতিয়াজুল ফরহাদের ‘সান অ্যান্ড স্যান্ড টুইন বিচ রিসোর্ট’ নির্মাণাধীন রয়েছে।

গলাচিপা এলাকাতেও সৈকতের বালিয়াড়ি ও কেয়াবনের ভেতর বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। গত ৮ ও ৯ আগস্ট দ্বীপ পরিদর্শন করে এমন অন্তত ১০টি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণাধীন দেখা গেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৩টি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) একটি সেন্টমার্টিন। এ কারণে দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়; এমন কোনো কর্মকাণ্ডের অনুমতি নেই।

২০২২ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সেন্টমার্টিনে ইট ও সিমেন্ট নেওয়াও নিষিদ্ধ। পরিবেশবান্ধব বাঁশ-কাঠের স্থাপনা ছাড়া অন্য কোনো অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে এসব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে নির্মাণকাজ চলছে।

যেন দেখার কেউ নেই

নির্মাণকাজে যুক্ত শ্রমিকদের ভাষ্য, কোনো কোনো স্থাপনার কাজ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে। তাদের দাবি, এ সময়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। দ্বীপে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয় ও পুলিশ ফাঁড়ি থাকলেও নির্মাণসামগ্রী আনা এবং ভবন নির্মাণ বন্ধ হচ্ছে না।

উত্তর পাড়ায় টিনের সীমানা দিয়ে বড় একটি রিসোর্ট নির্মাণ করছেন ঢাকার বাসিন্দা শামীম হক। সেখানে দায়িত্বে থাকা রানা নামে এক ব্যক্তি বলেন, তারা জমি কিনে স্থাপনা নির্মাণ করছেন। অন্যরা যেভাবে নির্মাণ করেছে, তারাও সেভাবেই কাজ করছেন।

অন্যদিকে সৈকতের বালিয়াড়ি ও কেয়াবনের মধ্যে বহুতল ভবন নির্মাণকারী জহির হোসেনের দাবি, এটি রিসোর্ট নয়, ব্যক্তিগত বাড়ি।

টেকনাফের ইউএনও এস এম অনীক চৌধুরী জানান, উপজেলা অফিসার্স সমবায় সমিতি লিমিটেড নামে কোনো সংগঠনের বিষয়ে তার কার্যালয়ে তথ্য নেই। তিনি বলেন, দ্বীপে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের খবর পেলেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিচালক জমির উদ্দিন জানান, নির্মাণাধীন বিভিন্ন স্থাপনার মালিকের বিরুদ্ধে একাধিক নোটিশ ও মামলা করা হয়েছে। সেন্টমার্টিনে সংস্থাটির একটি কার্যালয় থাকলেও জনবল সংকটের কারণে সেখানে বর্তমানে কোনো কর্মকর্তা নেই। এরপরও কক্সবাজার থেকে কর্মকর্তারা গিয়ে অভিযান ও নজরদারি চালাচ্ছেন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের দাবি, গত এক বছরে সেন্টমার্টিনে অবৈধভাবে নির্মাণাধীন ৩১টি হোটেলের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এ ছাড়া পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ১৫টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রায় তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে পাথর ও সিমেন্ট।

বিপন্ন জীববৈচিত্র্য

নির্মাণকাজের কারণে সেন্টমার্টিনের বালিয়াড়ি ও কেয়াবন ধ্বংস হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে সামুদ্রিক কাছিমসহ বিভিন্ন প্রাণীর ওপর। স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের মতে, কচ্ছপের ডিম পাড়ার উপযোগী পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। সৈকতে ঘোরাফেরা করা কুকুরও কচ্ছপের ডিম নষ্ট করছে।

এ ছাড়া সৈকতের বালুচর দিয়ে ইজিবাইক ও মোটরসাইকেল চলাচলের কারণে শামুক, ঝিনুক, লাল কাঁকড়াসহ বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিবেশকর্মী আব্দুল আজিজ বলেন, সাধারণত ডিসেম্বর থেকে সামুদ্রিক কাছিম সৈকতে ডিম পাড়তে আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কচ্ছপের উপস্থিতি কমে যাওয়া উদ্বেগের বিষয়।

পর্যটনেও বিধিনিষেধ

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত সীমিত করেছে। নভেম্বর মাসে পর্যটকরা দ্বীপে যেতে পারলেও রাতযাপনের অনুমতি নেই। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক দ্বীপে গিয়ে রাত কাটাতে পারবেন। আর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য দ্বীপে যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে পর্যটক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ না হলে দ্বীপের পরিবেশ রক্ষা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।

সেন্টমার্টিন রক্ষায় মহাপরিকল্পনা

অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও অবকাঠামো নির্মাণের চাপে সেন্টমার্টিনের অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় সরকার একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে।

খসড়া পরিকল্পনায় সেন্টমার্টিনকে চারটি জোনে ভাগ করার প্রস্তাব রয়েছে। ‘জেনারেল ইউজ জোনে’ পর্যটন ও সাধারণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ থাকবে। ‘ম্যানেজড রিসোর্স জোন’ হবে সামুদ্রিক কাছিমের প্রজনন এলাকা। সেখানে দিনে পর্যটকরা যেতে পারলেও রাতযাপনের অনুমতি থাকবে না।

‘সাসটেইনেবল ইউজ জোনে’ বুশল্যান্ড, লেগুন ও ম্যানগ্রোভ বন থাকবে। স্থানীয়রা নির্ধারিত নিয়মে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করতে পারবেন। পর্যটকরাও দিনে প্রবেশ করতে পারবেন, তবে রাতযাপন করা যাবে না। আর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য ‘রেস্ট্রিক্টেড জোনে’ কোনো ধরনের প্রবেশের অনুমতি থাকবে না।

মহাপরিকল্পনায় বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, পর্যটন নিয়ন্ত্রণ, সামুদ্রিক সম্পদ ও স্থানীয় জীবিকা সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেনারেটরের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সুপারিশ রয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম সম্প্রতি সেন্টমার্টিন পরিদর্শন করে বলেছেন, দ্বীপের পরিবেশ-প্রতিবেশ ও অস্তিত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান মুজিবুল হক বলেন, দ্বীপে যত্রতত্র প্লাস্টিক ও হোটেল-রেস্তোরাঁর বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো কেয়াবন উজাড় করে হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণ। অথচ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১৯৯৯ সালে সেন্টমার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছিল।

২০২০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায়ও সতর্ক করা হয়েছিল, সেন্টমার্টিনে বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ২০৪৫ সালের মধ্যে দ্বীপটি পুরোপুরি প্রবালশূন্য হয়ে পড়তে পারে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

সেন্টমার্টিনে পরিবেশ ধ্বংসের উৎসব চলছে

সর্বশেষ আপডেট ১২:১৮:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে সেন্টমার্টিন দ্বীপে অবকাঠামো নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় ইট-সিমেন্টের বহুতল ভবন, হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি দ্বীপ ঘুরে অন্তত ১০টি নির্মাণাধীন স্থাপনার সন্ধান পাওয়া গেছে, যার বেশিরভাগই বহুতল।

সেন্টমার্টিনের একমাত্র জেটি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে শিলবনিয়া সৈকত। সামুদ্রিক কাছিমের অন্যতম প্রজননস্থল এই সৈকত ঘেঁষে টেকনাফ উপজেলা অফিসার্স সমবায় সমিতি লিমিটেডের নামে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এর পাশে চট্টগ্রামের মজনুর মালিকানাধীন ‘দীপান্বিতা’ রিসোর্ট এবং ঢাকার ইমতিয়াজুল ফরহাদের ‘সান অ্যান্ড স্যান্ড টুইন বিচ রিসোর্ট’ নির্মাণাধীন রয়েছে।

গলাচিপা এলাকাতেও সৈকতের বালিয়াড়ি ও কেয়াবনের ভেতর বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। গত ৮ ও ৯ আগস্ট দ্বীপ পরিদর্শন করে এমন অন্তত ১০টি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণাধীন দেখা গেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৩টি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) একটি সেন্টমার্টিন। এ কারণে দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়; এমন কোনো কর্মকাণ্ডের অনুমতি নেই।

২০২২ সালের সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সেন্টমার্টিনে ইট ও সিমেন্ট নেওয়াও নিষিদ্ধ। পরিবেশবান্ধব বাঁশ-কাঠের স্থাপনা ছাড়া অন্য কোনো অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে এসব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে নির্মাণকাজ চলছে।

যেন দেখার কেউ নেই

নির্মাণকাজে যুক্ত শ্রমিকদের ভাষ্য, কোনো কোনো স্থাপনার কাজ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে। তাদের দাবি, এ সময়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। দ্বীপে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয় ও পুলিশ ফাঁড়ি থাকলেও নির্মাণসামগ্রী আনা এবং ভবন নির্মাণ বন্ধ হচ্ছে না।

উত্তর পাড়ায় টিনের সীমানা দিয়ে বড় একটি রিসোর্ট নির্মাণ করছেন ঢাকার বাসিন্দা শামীম হক। সেখানে দায়িত্বে থাকা রানা নামে এক ব্যক্তি বলেন, তারা জমি কিনে স্থাপনা নির্মাণ করছেন। অন্যরা যেভাবে নির্মাণ করেছে, তারাও সেভাবেই কাজ করছেন।

অন্যদিকে সৈকতের বালিয়াড়ি ও কেয়াবনের মধ্যে বহুতল ভবন নির্মাণকারী জহির হোসেনের দাবি, এটি রিসোর্ট নয়, ব্যক্তিগত বাড়ি।

টেকনাফের ইউএনও এস এম অনীক চৌধুরী জানান, উপজেলা অফিসার্স সমবায় সমিতি লিমিটেড নামে কোনো সংগঠনের বিষয়ে তার কার্যালয়ে তথ্য নেই। তিনি বলেন, দ্বীপে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের খবর পেলেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিচালক জমির উদ্দিন জানান, নির্মাণাধীন বিভিন্ন স্থাপনার মালিকের বিরুদ্ধে একাধিক নোটিশ ও মামলা করা হয়েছে। সেন্টমার্টিনে সংস্থাটির একটি কার্যালয় থাকলেও জনবল সংকটের কারণে সেখানে বর্তমানে কোনো কর্মকর্তা নেই। এরপরও কক্সবাজার থেকে কর্মকর্তারা গিয়ে অভিযান ও নজরদারি চালাচ্ছেন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের দাবি, গত এক বছরে সেন্টমার্টিনে অবৈধভাবে নির্মাণাধীন ৩১টি হোটেলের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এ ছাড়া পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ১৫টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রায় তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে পাথর ও সিমেন্ট।

বিপন্ন জীববৈচিত্র্য

নির্মাণকাজের কারণে সেন্টমার্টিনের বালিয়াড়ি ও কেয়াবন ধ্বংস হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে সামুদ্রিক কাছিমসহ বিভিন্ন প্রাণীর ওপর। স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের মতে, কচ্ছপের ডিম পাড়ার উপযোগী পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। সৈকতে ঘোরাফেরা করা কুকুরও কচ্ছপের ডিম নষ্ট করছে।

এ ছাড়া সৈকতের বালুচর দিয়ে ইজিবাইক ও মোটরসাইকেল চলাচলের কারণে শামুক, ঝিনুক, লাল কাঁকড়াসহ বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিবেশকর্মী আব্দুল আজিজ বলেন, সাধারণত ডিসেম্বর থেকে সামুদ্রিক কাছিম সৈকতে ডিম পাড়তে আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কচ্ছপের উপস্থিতি কমে যাওয়া উদ্বেগের বিষয়।

পর্যটনেও বিধিনিষেধ

পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত সীমিত করেছে। নভেম্বর মাসে পর্যটকরা দ্বীপে যেতে পারলেও রাতযাপনের অনুমতি নেই। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক দ্বীপে গিয়ে রাত কাটাতে পারবেন। আর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য দ্বীপে যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে পর্যটক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ না হলে দ্বীপের পরিবেশ রক্ষা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।

সেন্টমার্টিন রক্ষায় মহাপরিকল্পনা

অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও অবকাঠামো নির্মাণের চাপে সেন্টমার্টিনের অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় সরকার একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে।

খসড়া পরিকল্পনায় সেন্টমার্টিনকে চারটি জোনে ভাগ করার প্রস্তাব রয়েছে। ‘জেনারেল ইউজ জোনে’ পর্যটন ও সাধারণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ থাকবে। ‘ম্যানেজড রিসোর্স জোন’ হবে সামুদ্রিক কাছিমের প্রজনন এলাকা। সেখানে দিনে পর্যটকরা যেতে পারলেও রাতযাপনের অনুমতি থাকবে না।

‘সাসটেইনেবল ইউজ জোনে’ বুশল্যান্ড, লেগুন ও ম্যানগ্রোভ বন থাকবে। স্থানীয়রা নির্ধারিত নিয়মে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করতে পারবেন। পর্যটকরাও দিনে প্রবেশ করতে পারবেন, তবে রাতযাপন করা যাবে না। আর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য ‘রেস্ট্রিক্টেড জোনে’ কোনো ধরনের প্রবেশের অনুমতি থাকবে না।

মহাপরিকল্পনায় বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, পর্যটন নিয়ন্ত্রণ, সামুদ্রিক সম্পদ ও স্থানীয় জীবিকা সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেনারেটরের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সুপারিশ রয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম সম্প্রতি সেন্টমার্টিন পরিদর্শন করে বলেছেন, দ্বীপের পরিবেশ-প্রতিবেশ ও অস্তিত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান মুজিবুল হক বলেন, দ্বীপে যত্রতত্র প্লাস্টিক ও হোটেল-রেস্তোরাঁর বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো কেয়াবন উজাড় করে হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণ। অথচ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১৯৯৯ সালে সেন্টমার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছিল।

২০২০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায়ও সতর্ক করা হয়েছিল, সেন্টমার্টিনে বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ২০৪৫ সালের মধ্যে দ্বীপটি পুরোপুরি প্রবালশূন্য হয়ে পড়তে পারে।