মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতি সমঝোতা, জয়ী তেহরান?
- সর্বশেষ আপডেট ১১:৪১:১৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
- / 12
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী ভয়াবহ সামরিক আগ্রাসন শুরু হওয়ার দীর্ঘ ১০৬ দিন পর অবশেষে তেহরান ও ওয়াশিংটন চলমান যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটাতে একটি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা কাঠামোয় পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উচ্চপর্যায়ের সমঝোতা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী সংঘাতেরই সমাপ্তি ঘটায়নি; বরং এই দীর্ঘ যুদ্ধে প্রকৃত বিজয়ী এবং পরাজিত পক্ষ কে—সেই মৌলিক প্রশ্নটিকেও নতুন করে বিশ্ব দরবারে সামনে নিয়ে এসেছে।
চলতি ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর এই যৌথ সামরিক আগ্রাসন শুরু হয়েছিল। আক্রমণের অন্যতম প্রধান ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল ইরানের মূল ক্ষমতার কাঠামোকে সম্পূর্ণ দুর্বল করে দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিজেদের অনুকূলে পরিবর্তন করা। এই উদ্দেশ্য সফল করতে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব, সামরিক ও নিরাপত্তা অবকাঠামো এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল তেহরানের ওপর এমন এক চরম সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা, যাতে দেশটি রাজনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ে অথবা যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সব কঠিন শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়।
তবে যুদ্ধের সামগ্রিক ঘটনাপ্রবাহ মার্কিন পরিকল্পনাকারীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী একেবারেই এগোয়নি। ইরান এই পুরো সময়ে শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং তারা মধ্যপ্রাচ্যের অঞ্চলজুড়ে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটিকে নিখুঁত লক্ষ্যবস্তু করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালিতে’ বাণিজ্যিক নৌচলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি ও তেলের বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দেয়, যা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রত্যক্ষ সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি মস্ত বড় কৌশলগত ভুল অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত, ওয়াশিংটন ভুলভাবে ধারণা করেছিল যে আক্রমণের মুখে ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া খুবই সীমিত থাকবে। দ্বিতীয়ত, তারা বিশ্বাস করেছিল যে প্রাথমিক ও প্রচণ্ড সামরিক চাপের মুখে পড়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে দেখা গেছে, ইরান অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তার সামরিক কমান্ড কাঠামো পুনর্গঠন করেছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংহতি কঠোরভাবে বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় যে, যুদ্ধ শেষে দুই পক্ষ যে নতুন সমঝোতায় উপনীত হয়েছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলোর কোনোটিই আদতে পূরণ হয়নি। ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা আগের মতোই বহাল রয়েছে, দেশটির দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সামরিক সক্ষমতাও অক্ষুণ্ণ আছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রভাবও সমানভাবে অব্যাহত রয়েছে। অন্য দিকে, পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে এখন এমন একটি নতুন বাস্তবতা মেনে নিতে হয়েছে, যেখানে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সমীকরণের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অংশ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হতে হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার দিক থেকেও এই ঐতিহাসিক সমঝোতাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বের অধিকাংশ স্বাধীন দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ এই যুদ্ধের অবসান ও শান্তি প্রক্রিয়াকে সাধুবাদ জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব সম্প্রদায়ের এই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া মূলত এটিই ইঙ্গিত করে যে—পশ্চিম এশিয়ার সামগ্রিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও বাণিজ্য রক্ষা করতে ইরানের ভূমিকাকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, আধুনিক সামরিক ও কৌশলগত বিশ্লেষণে যেকোনো যুদ্ধের সাফল্য বা ব্যর্থতা শুধু প্রতিপক্ষের বস্তুগত বা সামরিক ক্ষয়ক্ষতির ভিত্তিতে পরিমাপ করা হয় না; বরং যুদ্ধের মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমেই তা মূল্যায়ন করা হয়। সেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিচার করলে আজ এই বড় প্রশ্নটি থেকেই যায়—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কি ইরানের মাটিতে তাদের ঘোষিত লক্ষ্য আদৌ অর্জন করতে পেরেছে? নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান বাস্তব পরিস্থিতি অন্তত মার্কিন প্রশাসনের সেই দাবিকে বিন্দুমাত্র সমর্থন করে না।



































