ঢাকা ১১:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্যামিলি কার্ডে জালিয়াতি রুখবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ০২:৪৪:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
  • / 76

ফ্যামিলি কার্ডে জালিয়াতি ধরতে এআই ব্যবহারের পরিকল্পনা

দেশের প্রান্তিক, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে একটি সমন্বিত এবং আধুনিক ডিজিটাল নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু করার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এই জনকল্যাণমুখী কর্মসূচিতে যাতে কোনো ধরনের জালিয়াতি, অনাহূত অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতি না ঘটতে পারে, সে জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা মেশিন লার্নিং ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় অসঙ্গতি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা হয়েছে। সম্প্রতি সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের তৈরি করা ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা ২০২৬’-এর খসড়া প্রতিবেদনে এই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নীতিমালার খসড়ায় বলা হয়, বর্তমান সরকারের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬-এ একটি বৈষম্যহীন, সাম্যবাদী ও মানবিক ‘সামাজিক কল্যাণ রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার সুদৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। এই বিশেষ রূপকল্পের মূল দর্শনই হলো— ‘কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়, বরং পরিবারই হবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের মূল একক’। এই দর্শনের আলোকেই নতুন সরকার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ২১ দিনের মাথায় এই যুগান্তকারী কর্মসূচির পরীক্ষামূলক (পাইলট) কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে। বর্তমানে দেশব্যাপী অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে এর পরিধি সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয় আইনি ও কারিগরি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ডের আবেদনকারীদের তথ্যের শতভাগ সঠিকতা নিশ্চিত করতে এবং যেকোনো ধরনের জালিয়াতি ও অনিয়ম গোড়াতেই প্রতিরোধ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা মেশিন লার্নিং প্রযুক্তিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হবে। আবেদনকারীদের দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ভূমি মন্ত্রণালয়, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিবন্ধক এবং দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারের (সেন্ট্রাল ডেটাবেজ) সাথে অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) সংযোগের একটি সুনির্দিষ্ট কারিগরি রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। গতিশীল সামাজিক নিবন্ধনে (ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি) সংরক্ষিত নাগরিক তথ্যে কোনো ধরনের চালবাজি বা অসঙ্গতি প্রতিরোধে সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি যুক্ত করতে পারবে।

পরিবারের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর ভূমিকা বৃদ্ধি, বৈষম্য হ্রাস ও তাঁদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সংশ্লিষ্ট পরিবারের মাতা অথবা উপযুক্ত জ্যেষ্ঠ নারী সদস্যের নামে ইস্যু করা হবে। কোনো কারণে কার্ডধারী নারী সদস্য মৃত্যুবরণ করলে উপজেলা কমিটির সিদ্ধান্ত ও সুপারিশক্রমে তা উক্ত পরিবারের অন্য কোনো উপযুক্ত প্রাপ্তবয়স্ক নারী সদস্যের নামে স্থানান্তর করা যাবে। তবে পরিবারে যদি কোনো উপযুক্ত প্রাপ্তবয়স্ক নারী সদস্য না-ই থাকেন, কেবল সেই বিশেষ পরিস্থিতিতে জেলা কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদন সাপেক্ষে পরিবারের প্রধান পুরুষের নামে কার্ড ইস্যু বা স্থানান্তর করা যাবে। এছাড়া পার্বত্য অঞ্চল বা সমতলের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর (যেমন— গারো, খাসিয়া ইত্যাদি) প্রথাগত মাতৃতান্ত্রিক পারিবারিক কাঠামো ও উত্তরাধিকারের বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে কার্ড বিতরণে বিশেষ সূচক নির্ধারণ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও প্রকৃত অভাবী পরিবারগুলোকে সঠিকভাবে শনাক্তকরণের লক্ষ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইকরণের পাশাপাশি সম্পূর্ণ পদ্ধতিগত ও বৈজ্ঞানিক ‘প্রক্সি মিন্স টেস্ট’ (পিএমটি) পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। এই পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারী পরিবারের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, আয়ের উৎস এবং জীবনযাত্রার মান সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে দারিদ্র্যের আপেক্ষিক মাত্রা নির্ধারণ করা হবে। প্রতিটি পরিবারকে একটি নির্দিষ্ট পিএমটি স্কোর প্রদান করে মোট পাঁচটি ভাগে (কোয়াইন্টাইল) বিন্যাস করা হবে।

  • অতি দরিদ্র (প্রথম ভাগ): এই ভাগে থাকা পরিবারগুলো ১০০ ভাগ আবশ্যিকভাবে এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হবে।
  • দরিদ্র (দ্বিতীয় ভাগ): এই ভাগে থাকা পরিবারগুলো পরীক্ষামূলক (পাইলট) ও প্রথম পর্যায়ে অগ্রাধিকার পাবে।
  • ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত (তৃতীয় ভাগ): এদের বাজেট সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
  • নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত (চতুর্থ ভাগ): এই পরিবারগুলো আপাতত এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না।
  • সচ্ছল বা উচ্চবিত্ত (পঞ্চম ভাগ): এই ভাগের পরিবারগুলোকে সরাসরি বর্জন বা তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।

এই স্কোরিং পদ্ধতি ও তথ্য সংগ্রহের মূল ফরমটি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বা উপযুক্ত কারিগরি কর্তৃপক্ষ প্রণয়ন করবে। ‘ইউনিক আইডি’ এবং সরাসরি সুবিধা হস্তান্তর (জিটুপি) পদ্ধতির মাধ্যমে কোনো ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের হস্তক্ষেপ ছাড়াই সরাসরি প্রকৃত উপকারভোগীর ডিজিটাল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বা মোবাইলে রাষ্ট্রীয় সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হবে।

কর্মসূচির স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং প্রকৃত হকের পাওনাদারের নিকট সুবিধা পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি কঠোর বর্জন নীতিমালা বা ‘নেগেটিভ লিস্ট’ তৈরি করা হয়েছে। খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী যেসব পরিবার সুবিধা পাবে না:

  • সরকার কর্তৃক নির্ধারিত পিএমটি স্কোরের ঊর্ধ্বসীমার চেয়ে অতিরিক্ত স্কোরপ্রাপ্ত কোনো পরিবার এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবেন না।
  • পরিবারের মনোনীত নারী প্রধান যদি সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় কর্মরত থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রাপ্ত হন কিংবা এমপিওভুক্ত শিক্ষক বা কর্মচারী হন।
  • মনোনীত নারী প্রধান যদি নিয়মিত সরকারি পেনশন বা অনুরূপ কোনো অবসর সুবিধা গ্রহণ করেন (তবে প্রতিবন্ধী সন্তান হিসেবে বিশেষ পেনশন সুবিধা গ্রহণকারীরা এই নিয়মের বাইরে বা ছাড় পাবেন)।
  • সংশ্লিষ্ট পরিবারের কোনো সদস্যের নামে যদি জাতীয় সঞ্চয়পত্রে ৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ থাকে।
  • বিআরটিএ নিবন্ধিত কোনো চার চাকার মোটরযান, যেমন— কার, জিপ বা মাইক্রোবাস থাকে।
  • পরিবারের কোনো সদস্যের নামে হালনাগাদ বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে লাইসেন্স বা ব্যবসা থাকে এবং পরিবারের কোনো সদস্য নিয়মিত করদাতা (টিন নম্বরধারী) হন।
  • ভূমির মালিকানার ক্ষেত্রে, পরিবারের বসতভিটাসহ আবাদি জমির মোট পরিমাণ ০.৫০ একর বা তার বেশি হলে অথবা কোনো অকৃষি বা বাণিজ্যিক জমির বাজারমূল্য ৫ লাখ টাকার অধিক হলে।

সুবিধাভোগী পরিবারের মনোনীত নারী প্রধান ব্যতীত অন্য সদস্যরা প্রচলিত নিয়মে অন্যান্য সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা (যেমন— বীর মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ইত্যাদি) আগের মতোই গ্রহণ করতে পারবেন। তবে মনোনীত নারী প্রধান নিজে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন টিসিবি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি) কর্মসূচি বা অন্য কোনো নিয়মিত সরকারি নগদ সুবিধা পেয়ে থাকলে, তাকে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা গ্রহণের পূর্বে বিদ্যমান সুবিধাটি সমর্পণ করতে হবে। অন্যথায় কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার যাচাইয়ের মাধ্যমে তার পূর্বতন সুবিধাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বা স্থগিত করা হবে।

নীতিমালা অনুযায়ী, কার্ড বিতরণের পর নিয়মিত বিরতিতে বা বার্ষিক সরাসরি যাচাইকরণ (লাইভ ভেরিফিকেশন) ও তথ্য পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। এতে যদি কোনো উপকারভোগী পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার কাঙ্ক্ষিত মানোন্নয়ন ঘটে এবং তারা নির্ধারিত পিএমটি স্কোরের সীমা অতিক্রম করে, তবে উক্ত পরিবারটি এই কর্মসূচি হতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘উত্তীর্ণ’ (গ্রাজুয়েট) হবে এবং সেই শূন্য আসনে নতুন যোগ্য দরিদ্র পরিবার প্রতিস্থাপন করা যাবে। এই লক্ষ্যে তথ্যপ্রযুক্তি এবং ভৌগোলিক অবস্থান (জিও-লোকেশন) ভিত্তিক পদ্ধতিতে দেশব্যাপী একটি বিশেষ সমন্বিত পরিবার জরিপ পরিচালনা করা হবে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদমাধ্যমকে জানান, বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা বলয়কে আরও আধুনিক, পরিবার-কেন্দ্রিক এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছ করার লক্ষ্যেই এই সময়োপযোগী ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করা হয়েছে এবং দ্রুতই এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

ফ্যামিলি কার্ডে জালিয়াতি রুখবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

সর্বশেষ আপডেট ০২:৪৪:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

দেশের প্রান্তিক, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে একটি সমন্বিত এবং আধুনিক ডিজিটাল নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু করার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এই জনকল্যাণমুখী কর্মসূচিতে যাতে কোনো ধরনের জালিয়াতি, অনাহূত অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতি না ঘটতে পারে, সে জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা মেশিন লার্নিং ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় অসঙ্গতি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা হয়েছে। সম্প্রতি সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের তৈরি করা ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা ২০২৬’-এর খসড়া প্রতিবেদনে এই আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নীতিমালার খসড়ায় বলা হয়, বর্তমান সরকারের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬-এ একটি বৈষম্যহীন, সাম্যবাদী ও মানবিক ‘সামাজিক কল্যাণ রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার সুদৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। এই বিশেষ রূপকল্পের মূল দর্শনই হলো— ‘কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়, বরং পরিবারই হবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের মূল একক’। এই দর্শনের আলোকেই নতুন সরকার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ২১ দিনের মাথায় এই যুগান্তকারী কর্মসূচির পরীক্ষামূলক (পাইলট) কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে। বর্তমানে দেশব্যাপী অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে এর পরিধি সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয় আইনি ও কারিগরি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ডের আবেদনকারীদের তথ্যের শতভাগ সঠিকতা নিশ্চিত করতে এবং যেকোনো ধরনের জালিয়াতি ও অনিয়ম গোড়াতেই প্রতিরোধ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা মেশিন লার্নিং প্রযুক্তিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হবে। আবেদনকারীদের দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ভূমি মন্ত্রণালয়, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিবন্ধক এবং দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারের (সেন্ট্রাল ডেটাবেজ) সাথে অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) সংযোগের একটি সুনির্দিষ্ট কারিগরি রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। গতিশীল সামাজিক নিবন্ধনে (ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি) সংরক্ষিত নাগরিক তথ্যে কোনো ধরনের চালবাজি বা অসঙ্গতি প্রতিরোধে সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি যুক্ত করতে পারবে।

পরিবারের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর ভূমিকা বৃদ্ধি, বৈষম্য হ্রাস ও তাঁদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সংশ্লিষ্ট পরিবারের মাতা অথবা উপযুক্ত জ্যেষ্ঠ নারী সদস্যের নামে ইস্যু করা হবে। কোনো কারণে কার্ডধারী নারী সদস্য মৃত্যুবরণ করলে উপজেলা কমিটির সিদ্ধান্ত ও সুপারিশক্রমে তা উক্ত পরিবারের অন্য কোনো উপযুক্ত প্রাপ্তবয়স্ক নারী সদস্যের নামে স্থানান্তর করা যাবে। তবে পরিবারে যদি কোনো উপযুক্ত প্রাপ্তবয়স্ক নারী সদস্য না-ই থাকেন, কেবল সেই বিশেষ পরিস্থিতিতে জেলা কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদন সাপেক্ষে পরিবারের প্রধান পুরুষের নামে কার্ড ইস্যু বা স্থানান্তর করা যাবে। এছাড়া পার্বত্য অঞ্চল বা সমতলের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর (যেমন— গারো, খাসিয়া ইত্যাদি) প্রথাগত মাতৃতান্ত্রিক পারিবারিক কাঠামো ও উত্তরাধিকারের বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে কার্ড বিতরণে বিশেষ সূচক নির্ধারণ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও প্রকৃত অভাবী পরিবারগুলোকে সঠিকভাবে শনাক্তকরণের লক্ষ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইকরণের পাশাপাশি সম্পূর্ণ পদ্ধতিগত ও বৈজ্ঞানিক ‘প্রক্সি মিন্স টেস্ট’ (পিএমটি) পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। এই পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারী পরিবারের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, আয়ের উৎস এবং জীবনযাত্রার মান সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে দারিদ্র্যের আপেক্ষিক মাত্রা নির্ধারণ করা হবে। প্রতিটি পরিবারকে একটি নির্দিষ্ট পিএমটি স্কোর প্রদান করে মোট পাঁচটি ভাগে (কোয়াইন্টাইল) বিন্যাস করা হবে।

  • অতি দরিদ্র (প্রথম ভাগ): এই ভাগে থাকা পরিবারগুলো ১০০ ভাগ আবশ্যিকভাবে এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হবে।
  • দরিদ্র (দ্বিতীয় ভাগ): এই ভাগে থাকা পরিবারগুলো পরীক্ষামূলক (পাইলট) ও প্রথম পর্যায়ে অগ্রাধিকার পাবে।
  • ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত (তৃতীয় ভাগ): এদের বাজেট সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
  • নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত (চতুর্থ ভাগ): এই পরিবারগুলো আপাতত এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না।
  • সচ্ছল বা উচ্চবিত্ত (পঞ্চম ভাগ): এই ভাগের পরিবারগুলোকে সরাসরি বর্জন বা তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।

এই স্কোরিং পদ্ধতি ও তথ্য সংগ্রহের মূল ফরমটি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বা উপযুক্ত কারিগরি কর্তৃপক্ষ প্রণয়ন করবে। ‘ইউনিক আইডি’ এবং সরাসরি সুবিধা হস্তান্তর (জিটুপি) পদ্ধতির মাধ্যমে কোনো ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের হস্তক্ষেপ ছাড়াই সরাসরি প্রকৃত উপকারভোগীর ডিজিটাল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বা মোবাইলে রাষ্ট্রীয় সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হবে।

কর্মসূচির স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং প্রকৃত হকের পাওনাদারের নিকট সুবিধা পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি কঠোর বর্জন নীতিমালা বা ‘নেগেটিভ লিস্ট’ তৈরি করা হয়েছে। খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী যেসব পরিবার সুবিধা পাবে না:

  • সরকার কর্তৃক নির্ধারিত পিএমটি স্কোরের ঊর্ধ্বসীমার চেয়ে অতিরিক্ত স্কোরপ্রাপ্ত কোনো পরিবার এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবেন না।
  • পরিবারের মনোনীত নারী প্রধান যদি সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় কর্মরত থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রাপ্ত হন কিংবা এমপিওভুক্ত শিক্ষক বা কর্মচারী হন।
  • মনোনীত নারী প্রধান যদি নিয়মিত সরকারি পেনশন বা অনুরূপ কোনো অবসর সুবিধা গ্রহণ করেন (তবে প্রতিবন্ধী সন্তান হিসেবে বিশেষ পেনশন সুবিধা গ্রহণকারীরা এই নিয়মের বাইরে বা ছাড় পাবেন)।
  • সংশ্লিষ্ট পরিবারের কোনো সদস্যের নামে যদি জাতীয় সঞ্চয়পত্রে ৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ থাকে।
  • বিআরটিএ নিবন্ধিত কোনো চার চাকার মোটরযান, যেমন— কার, জিপ বা মাইক্রোবাস থাকে।
  • পরিবারের কোনো সদস্যের নামে হালনাগাদ বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে লাইসেন্স বা ব্যবসা থাকে এবং পরিবারের কোনো সদস্য নিয়মিত করদাতা (টিন নম্বরধারী) হন।
  • ভূমির মালিকানার ক্ষেত্রে, পরিবারের বসতভিটাসহ আবাদি জমির মোট পরিমাণ ০.৫০ একর বা তার বেশি হলে অথবা কোনো অকৃষি বা বাণিজ্যিক জমির বাজারমূল্য ৫ লাখ টাকার অধিক হলে।

সুবিধাভোগী পরিবারের মনোনীত নারী প্রধান ব্যতীত অন্য সদস্যরা প্রচলিত নিয়মে অন্যান্য সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা (যেমন— বীর মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ইত্যাদি) আগের মতোই গ্রহণ করতে পারবেন। তবে মনোনীত নারী প্রধান নিজে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন টিসিবি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি) কর্মসূচি বা অন্য কোনো নিয়মিত সরকারি নগদ সুবিধা পেয়ে থাকলে, তাকে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা গ্রহণের পূর্বে বিদ্যমান সুবিধাটি সমর্পণ করতে হবে। অন্যথায় কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার যাচাইয়ের মাধ্যমে তার পূর্বতন সুবিধাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বা স্থগিত করা হবে।

নীতিমালা অনুযায়ী, কার্ড বিতরণের পর নিয়মিত বিরতিতে বা বার্ষিক সরাসরি যাচাইকরণ (লাইভ ভেরিফিকেশন) ও তথ্য পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। এতে যদি কোনো উপকারভোগী পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার কাঙ্ক্ষিত মানোন্নয়ন ঘটে এবং তারা নির্ধারিত পিএমটি স্কোরের সীমা অতিক্রম করে, তবে উক্ত পরিবারটি এই কর্মসূচি হতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘উত্তীর্ণ’ (গ্রাজুয়েট) হবে এবং সেই শূন্য আসনে নতুন যোগ্য দরিদ্র পরিবার প্রতিস্থাপন করা যাবে। এই লক্ষ্যে তথ্যপ্রযুক্তি এবং ভৌগোলিক অবস্থান (জিও-লোকেশন) ভিত্তিক পদ্ধতিতে দেশব্যাপী একটি বিশেষ সমন্বিত পরিবার জরিপ পরিচালনা করা হবে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদমাধ্যমকে জানান, বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা বলয়কে আরও আধুনিক, পরিবার-কেন্দ্রিক এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছ করার লক্ষ্যেই এই সময়োপযোগী ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করা হয়েছে এবং দ্রুতই এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে।