রণেশ দাশগুপ্ত-বদিউর রহমানের জন্মবার্ষিকী উদযাপন উদীচীর
- সর্বশেষ আপডেট ০৬:৩৩:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬
- / 131
গান, আবৃত্তি ও স্মৃতিচারণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রণেশ দাশগুপ্ত-এর ১১৪ তম এবং উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সদ্য প্রয়াত সভাপতি অধ্যাপক বদিউর রহমান-এর ৭৯তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করলো বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।
আজ বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাজধানীর পুরানা পল্টনের কমরেড মনিসিংহ-ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্টের ৬ষ্ঠ তলায় “জন্মবার্ষিকীর আয়োজন” শীর্ষক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই রণেশ দাশগুপ্ত ও বদিউর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের নেতৃবৃন্দ। এরপর সম্মেলক কণ্ঠে “কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো” গানটি পরিবেশন করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সঙ্গীত বিভাগের শিল্পীরা। এরপর উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম-এর সভাপতিত্বে শুরু হয় আলোচনা পর্ব।
এ পর্বের শুরুতে বদিউর রহমান-এর জীবনী পাঠ করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য কংকন নাগ। রণেশ দাশগুপ্ত-এর জীবনী পাঠ করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য শেখ আনিসুর রহমান।
বদিউর রহমান-এর জীবনীতে বলা হয়, “বদিউর রহমান ছিলেন আদর্শিক লড়াইয়ের একজন আদর্শ সৈনিক। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ, গবেষক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সম্পাদক ও সাংবাদিক। এমন একজন মানুষ, যিনি শৈশবে মানবমুক্তির সংগ্রামের মহান ব্রতে দীক্ষিত হওয়ার পর থেকে আমৃত্যু সেই আদর্শ ও লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন। শত বাধাতেও যিনি সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই থেকে পিছপা হননি”। লিখিত জীবনী পাঠে আরো বলা হয়, “যে শোষণহীন, সাম্যবাদী, ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতামুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে আজীবন আদর্শিক লড়াই চালিয়ে গেছেন অধ্যাপক বদিউর রহমান, সেই সমাজ এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে, এ নিয়ে বিন্দুমাত্র আফসোস ছিল না তাঁর। মহান মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতির প্রতি ছিল তাঁর অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, বাহাত্তরের সংবিধান প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করা গেলে সব ধরনের অরাজকতা, নৈরাজ্য ও দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিহত করা সম্ভব ছিল। আর তাই যখন বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা জাতীয় কমিটি গঠিত হয়, তখন তিনি স্বেচ্ছায় সেখানে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। যখনই কেউ মহান মুক্তিযুদ্ধকে কটাক্ষ করে কথা বলেছে বা ইনিয়েবিনিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালিয়েছে, তখনই প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন অধ্যাপক বদিউর রহমান”।
রণেশ দাশগুপ্ত-এর লিখিত জীবনীতে বলা হয়, “রণেশ দাশগুপ্ত-এর জীবনকে বলা যায় সংগ্রাম বা বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি। যে জীবন কেবলই সংগ্রামের। বলা হয়, মানুষ জীবনের দুটি পিঠই দেখে, কিন্তু রণেশ দাশগুপ্তের জীবন মুদ্রার এক পিঠ। যার সংগ্রাম কখনো শেষ হয়নি। যে সংগ্রামের সূচনা হয়েছিলো শৈশবেই, সে সংগ্রাম ছিল মৃত্যুর আগের দিন অবধি।
কারাগারের জীবন ছিল রণেশ দাশগুপ্তের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। দেশভাগের আগে তো বটেই দেশভাগের পরেও প্রগতিশীল রাজনীতির জন্য জেলে যেতে হয়েছিল রণেশ দাশগুপ্তকে। একসময় জেলখানাই হয়ে উঠলো তার ঘরবাড়ি। একবার জেলে যান তো মুক্তি পান, ফের কদিন বাদে জেলে। অপরাধ একটাই; বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি। রণেশ দাশগুপ্তের যে জীবন বেছে নিয়েছিলেন সে জীবন কেবলই ত্যাগের।
এক মহান আদর্শের পিছনে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার এক চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তিনি। রণেশ দাশগুপ্তের জীবনের দিকে তাকালে আজকের পৃথিবীতে কখনো কখনো অবিশ্বাস্য লাগে। এক জীবন এমন ভাবেও কাটানো সম্ভব। হয়তো রণেশ দাশগুপ্ত বলেই সম্ভব”।
আলোচনা পর্বে আরো আলোচনা করেন সৈয়দ আজিজুল হক মাসুম, উদীচীর সাবেক সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম সিদ্দিক রানা, উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি শিবানী ভট্টাচার্য, কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্য বিমল মজুমদার, কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য আজমীর তারেক চৌধুরী এবং অধ্যাপক বদিউর রহমান-এর বড় সন্তান, সুপা সাদিয়া। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে।
আলোচনা পর্বের শুরুতে অমিত রঞ্জন দে বলেন, “একজন তুখোড় সাংবাদিক, বিজ্ঞ সাহিত্যিক, অসামান্য প্রাবন্ধিক হিসেবে রণেশ দাশগুপ্ত তাঁর জীবনকালে সবসময়ই তার আশপাশের মানুষকে শিখিয়ে গেছেন কীভাবে সৎ থেকে, নিজের আদর্শে অটল থেকে সমাজ পরিবর্তনের স্বার্থে ইতিবাচক কাজ করা যায়। আজীবন একটি অসাম্প্রদায়িক মৌলবাদমুক্ত সাম্যবাদী সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে লড়াই-সংগ্রাম করে গেছেন তিনি”।

আজিজুল হক মাসুম বলেন, “রণেশ দাশগুপ্ত নিজের লেখা ও কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বারবারই সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থার গুরুত্ব। ব্যক্তিগত জীবনের সমস্ত সাধ-আহ্লাদকে বিসর্জন দিয়ে তিনি আজীবন সমাজতান্ত্রিক আদর্শের লক্ষ্যে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। ভোগ নয়, ত্যাগের আদর্শকে ধারণ করেছিলেন তিনি। আর বদিউর রহমান সংসার জীবনে থেকেও নিজ আদর্শের প্রতি অবিচল ছিলেন”।
আলোচনা পর্বে অন্য বক্তারা বলেন, “৯০’এর দশকে যখন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে বিপর্যয় নেমে আসে তখনও রণেশ দাশগুপ্ত নিজের লেখনীর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে লড়াইয়ে ময়দানে থাকার অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। ১৯৬৮ সালের ২৯ অক্টোবর শিল্পী-সংগ্রামী সত্যেন সেনসহ বেশ কয়েকজন প্রগতিশীল মুক্ত চিন্তার মানুষকে সাথে নিয়ে রণেশ দাশগুপ্ত প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। যেকোন ধরনের অন্যায়, অত্যাচারের বিরুদ্ধে সবসময়ই সোচ্চার থাকার শিক্ষা দিয়েছেন রণেশ দাশগুপ্ত।
তিনি মনে করতেন, শিল্পীরা যখন সংগঠক হিসেবে আবির্ভূত হন তখন সংগঠনকে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। আর রণেশ দাশগুপ্ত-এর দেখানো পথেই উদীচী সংগঠনকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে আজীবন অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন অধ্যাপক বদিউর রহমান”।
তারা আরো বলেন, “এদেশের মানুষ বারবারই নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছেন। এবং অনেকবার প্রতারিত হয়েছেন। সম্প্রতি ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার সরকারের পতন হলেও যে বৃহত্তর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষ আত্মবলিদান করেছেন, তার অনেক কিছুই পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না”। তাই, অধিকার আদায় করা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদে মানুষকে সবসময়ই সোচ্চার থাকতে হবে বলে মনে করেন তারা।
অনুষ্ঠানে আরো কয়েকটি সমবেত সঙ্গীত পরিবেশন করেন উদীচীর সঙ্গীত বিভাগের শিল্পীরা। তারা পরিবেশন করেন, “হে মহামানব একবার এসো ফিরে”, “ধিতাং ধিতাং বোলে”, “আমরা পূবে-পশ্চিমে” ইত্যাদি গান। এছাড়া, বৃন্দ আবৃত্তি “রানার চলেছে” পরিবেশন করেন উদীচী কেন্দ্রীয় আবৃত্তি বিভাগের বাচিক শিল্পীরা। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য শিখা সেনগুপ্তা।





































