ঢাকা ০৫:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মুক্তিযুদ্ধে পরিবার প্রধানহারা নারীর জীবনসংগ্রাম শেষ হয়নি এখনো

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:১৩:৫১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬
  • / 18

জীবনসংগ্রাম’ শীর্ষক গবেষণাকর্ম

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পরিবার প্রধানহারা নারীর জীবনসংগ্রাম শেষ হয়নি এখনো। তাদেরই একজন মৌলভীবাজারের শহীদজায়া মহোদা রানী দাস। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে স্বামীকে হারিয়ে ছয় সন্তান ১৬, ১৪, ১২, ১০ বছরের ৪ মেয়ে  এবং দুই ছেলের একক অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি বলেছেন, স্বামী পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন । সম্পদ বলতে স্বামীর ভিটেবাড়ি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। স্বামীকে পাকিস্তানি হানাদাররা হত্যার পর ৬ সন্তানসহ আমার ভরন পোষনের দায়িত্ব কেউ নিতে চায় নি। অন্যের বাড়িতে কাজ করে খেয়ে না খেয়ে সন্তানদের বড় করি।

মুক্তিযুদ্ধে উপার্জনক্ষম পরিবারপ্রধানকে হারিয়েছিলেন বিপুলসংখ্যক শহীদজায়া। সংসারজীবনে আকস্মিকভাবে কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হন তারা। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে কীভাবে এই নারীরা সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হন, সন্তান-সন্তনিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন কিংবা করতে ব্যর্থ হন তা অনুধাবনে এই নারীদের জীবনসংগ্রাম নিয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধে পরিবার প্রধানহারা নারীর জীবনসংগ্রাম’ শীর্ষক গবেষণাকর্ম পরিচালনা করেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। এই প্রয়াসের মুখ্য গবেষক ছিলেন জাদুঘরের গবেষণা ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপক ড. রেজিনা বেগম।

শনিবার (৯ মে) মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আয়োজনে মিলনায়তনে গবেষক ড. রেজিনা বেগম গবেষণাকর্মটির প্রাথমিক পর্যায় উপস্থাপন করেন। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, অধ্যাপক মেঘনা গুহঠাকুরতা, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক  আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। সেমিনারে সূচনা বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারা যাকের। সমাপনী বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সরওয়ার আলী। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম।

‘মুক্তিযুদ্ধে পরিবার প্রধানহারা নারীর জীবনসংগ্রাম’ শীর্ষক গবেষণায় ১৩০ শহীদজায়ার জীবন সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন তাদের কেউ একক পরিবারে, কেউ আবার যৌথ পরিবারে বসবাস করতেন। যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের কেউ কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, শিক্ষক, ডাক্তার, মেকানিক, রিকশাচালকও ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কোনো কোনো শহীদ জায়া অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তারা পরিবারের প্রধান স্বামীকে হারিয়ে কেউ শরণার্থী ক্যাম্পে, কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। যুদ্ধের পর চলে তাদের আরেক লড়াই।

গবেষণাপত্রের প্রাথমিক পর্যায় উপস্থাপনে ড. রেজিনা বেগম বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ২৬ জন শহিদ সরাসরি রাজনীতির সাথে স¤পৃক্ত ছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবার সুযোগ পাননি। সরাসরি রাজনীতির সাথে স¤পৃক্ত ৩৯ জন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের অপরাধে শহিদ হন ৪ জন।

একাত্তরে তিনি শহীদজায়াদের আশ্রয়স্থল সম্পর্কে বলেন, ১০ জন শরণার্থী ক্যাম্পে, ৫১ জন নিজ বাড়িতে, ১৮ জন আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে, ১৪ জন শ্বশুর বাড়িতে, ৩৫ জন বাবার বাড়িতে এবং ২ জন স্বামীর কর্মস্থলে আশ্রয় নেন।

তিনি আরো বলেন, তাদের মধ্যে ৫৫ জন নিরক্ষর, ৯ জন অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন, ৩ জন দ্বিতীয়, ৪ জন তৃতীয়, ৫ জন চতুর্থ, ২৮ জন পঞ্চম, ২ জন ষষ্ঠ, ৪ জন সপ্তম, ১১ জন অষ্টম, ২ জন নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। মাধ্যমিক পাশ ৪ জন, গ্রাজুয়েট ১ জন, এম,এ – বি. এড ১ জন ও এম.এ-এম.এড ১ জন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের বয়স ছিল ২০ থেকে ৪০ (২/১জন ২০-এর কম)। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে নির্বাচিত ১৩০ জন শহীদজায়ার মধ্যে ১১৯ জন গৃহিণী, ৩জন ছাত্রী, ৩ জন ব্যবসায়ী, শিক্ষকতা পেশায় ২ জন, ১ জন চাকরীজীবী, ১জন কৃষিকাজে এবং ১জন গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। আর্থিক- সামাজিক এবং মানসিকভাবে এরা সকলেই ছিলেন স্বামীর উপর নির্ভরশীল।

ড.  রেজিনা বেগম বলেছেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর অনেক শহীদজায়া তার স্বামীর বাড়িতে জায়গা পাননি। তার সম্পত্তির উত্তরাধিকার হতে পারেননি। বিপুলসংখ্যক নারী পরিবারের প্রধান বা উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি হন। এই শহীদজায়াদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অর্থ উপার্জনে সম্পৃক্ত ছিলেন না, পাশাপাশি তাদের বয়স এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনায়ও তারা প্রান্তিক গোষ্ঠীর অন্তর্গত ছিলেন।’

সারা যাকের বলেন, ‘আমাদের জীবনে নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধ প্রভাবিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধে অনেক পরিবারে উপার্জনক্ষম প্রধান ব্যক্তিটিই মারা গেছেন। সেই পরিবারের যে জীবনসংগ্রাম, তা উঠে আসছে এই গবেষণাপত্রে।’

শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরীর মতে, সেই সব লড়াকু মায়ের কথা আমরা মনে রাখিনি। গবেষককে ধন্যবাদ, তিনি তাদের সেই অজানা কথা তুলে এনেছেন। এ ধরনের গবেষণা আরো বড় পরিসরে হওয়া জরুরি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে যারা ভুলে যেতে চায়, তাদের বুঝতে হবে মুক্তিযুদ্ধ এ দেশের অস্তিত্ব।

অধ্যাপক মেঘনা গুহঠাকুরতার মতে, এই গবেষণায় শহীদ জায়াদের অনেক অজানা তথ্য উঠে এসেছে। আমি আমার মা বাসন্তী গুহঠাকুরতা, শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, পান্না কায়সারের জীবন সংগ্রাম সামনে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। যে শহীদ জায়াদের কথা, অভিজ্ঞতা, জীবন সংগ্রাম কেউ জানেন না, এই গবেষণা পত্রে তাদের কথা উঠে এসেছে। এই গবেষণা থেকে আরো অনেক গবেষণার দ্বার খুলে যাবে বলে মনে করেন তিনি ।

প্রাক গবেষণাপত্রটিকে সমৃদ্ধ করতে কিছু পরামর্শ দেন অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, এ গবেষণাটি একটি প্রাথমিক ভিত্তি হতে পারে। যেহেতু এটি এখনো বই আকারে প্রকাশ হয়নি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর গবেষণা কর্মটি আরও বড় পরিসরে করলে এটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে।

জাদুঘরের আরেক ট্রাস্টি সারওয়ার আলী বললেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরতে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। এটি প্রাথমিক গবেষণাপত্র। এটিকে সমৃদ্ধ করা গেলে মুক্তিযুদ্ধের একটা অনালোচিত অধ্যায় নতুন চিন্তার খোরাক জোগাবে। মুক্তিযুদ্ধ যে ১৬ ডিসেম্বর শেষ হয়ে যায়নি, বরং যুদ্ধে স্বামীহারা কিংবা পরিবারের প্রধান ব্যক্তিকে হারিয়ে যে অথৈ লড়াই করেছেন আমাদের মায়েরা, তা গবেষণাপত্রে উঠে এসেছে।’

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

মুক্তিযুদ্ধে পরিবার প্রধানহারা নারীর জীবনসংগ্রাম শেষ হয়নি এখনো

সর্বশেষ আপডেট ১১:১৩:৫১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পরিবার প্রধানহারা নারীর জীবনসংগ্রাম শেষ হয়নি এখনো। তাদেরই একজন মৌলভীবাজারের শহীদজায়া মহোদা রানী দাস। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে স্বামীকে হারিয়ে ছয় সন্তান ১৬, ১৪, ১২, ১০ বছরের ৪ মেয়ে  এবং দুই ছেলের একক অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি বলেছেন, স্বামী পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন । সম্পদ বলতে স্বামীর ভিটেবাড়ি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। স্বামীকে পাকিস্তানি হানাদাররা হত্যার পর ৬ সন্তানসহ আমার ভরন পোষনের দায়িত্ব কেউ নিতে চায় নি। অন্যের বাড়িতে কাজ করে খেয়ে না খেয়ে সন্তানদের বড় করি।

মুক্তিযুদ্ধে উপার্জনক্ষম পরিবারপ্রধানকে হারিয়েছিলেন বিপুলসংখ্যক শহীদজায়া। সংসারজীবনে আকস্মিকভাবে কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হন তারা। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে কীভাবে এই নারীরা সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হন, সন্তান-সন্তনিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন কিংবা করতে ব্যর্থ হন তা অনুধাবনে এই নারীদের জীবনসংগ্রাম নিয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধে পরিবার প্রধানহারা নারীর জীবনসংগ্রাম’ শীর্ষক গবেষণাকর্ম পরিচালনা করেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। এই প্রয়াসের মুখ্য গবেষক ছিলেন জাদুঘরের গবেষণা ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপক ড. রেজিনা বেগম।

শনিবার (৯ মে) মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আয়োজনে মিলনায়তনে গবেষক ড. রেজিনা বেগম গবেষণাকর্মটির প্রাথমিক পর্যায় উপস্থাপন করেন। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, অধ্যাপক মেঘনা গুহঠাকুরতা, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক  আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। সেমিনারে সূচনা বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারা যাকের। সমাপনী বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সরওয়ার আলী। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম।

‘মুক্তিযুদ্ধে পরিবার প্রধানহারা নারীর জীবনসংগ্রাম’ শীর্ষক গবেষণায় ১৩০ শহীদজায়ার জীবন সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন তাদের কেউ একক পরিবারে, কেউ আবার যৌথ পরিবারে বসবাস করতেন। যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের কেউ কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, শিক্ষক, ডাক্তার, মেকানিক, রিকশাচালকও ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কোনো কোনো শহীদ জায়া অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তারা পরিবারের প্রধান স্বামীকে হারিয়ে কেউ শরণার্থী ক্যাম্পে, কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। যুদ্ধের পর চলে তাদের আরেক লড়াই।

গবেষণাপত্রের প্রাথমিক পর্যায় উপস্থাপনে ড. রেজিনা বেগম বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ২৬ জন শহিদ সরাসরি রাজনীতির সাথে স¤পৃক্ত ছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবার সুযোগ পাননি। সরাসরি রাজনীতির সাথে স¤পৃক্ত ৩৯ জন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের অপরাধে শহিদ হন ৪ জন।

একাত্তরে তিনি শহীদজায়াদের আশ্রয়স্থল সম্পর্কে বলেন, ১০ জন শরণার্থী ক্যাম্পে, ৫১ জন নিজ বাড়িতে, ১৮ জন আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে, ১৪ জন শ্বশুর বাড়িতে, ৩৫ জন বাবার বাড়িতে এবং ২ জন স্বামীর কর্মস্থলে আশ্রয় নেন।

তিনি আরো বলেন, তাদের মধ্যে ৫৫ জন নিরক্ষর, ৯ জন অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন, ৩ জন দ্বিতীয়, ৪ জন তৃতীয়, ৫ জন চতুর্থ, ২৮ জন পঞ্চম, ২ জন ষষ্ঠ, ৪ জন সপ্তম, ১১ জন অষ্টম, ২ জন নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। মাধ্যমিক পাশ ৪ জন, গ্রাজুয়েট ১ জন, এম,এ – বি. এড ১ জন ও এম.এ-এম.এড ১ জন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের বয়স ছিল ২০ থেকে ৪০ (২/১জন ২০-এর কম)। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে নির্বাচিত ১৩০ জন শহীদজায়ার মধ্যে ১১৯ জন গৃহিণী, ৩জন ছাত্রী, ৩ জন ব্যবসায়ী, শিক্ষকতা পেশায় ২ জন, ১ জন চাকরীজীবী, ১জন কৃষিকাজে এবং ১জন গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। আর্থিক- সামাজিক এবং মানসিকভাবে এরা সকলেই ছিলেন স্বামীর উপর নির্ভরশীল।

ড.  রেজিনা বেগম বলেছেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর অনেক শহীদজায়া তার স্বামীর বাড়িতে জায়গা পাননি। তার সম্পত্তির উত্তরাধিকার হতে পারেননি। বিপুলসংখ্যক নারী পরিবারের প্রধান বা উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি হন। এই শহীদজায়াদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অর্থ উপার্জনে সম্পৃক্ত ছিলেন না, পাশাপাশি তাদের বয়স এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনায়ও তারা প্রান্তিক গোষ্ঠীর অন্তর্গত ছিলেন।’

সারা যাকের বলেন, ‘আমাদের জীবনে নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধ প্রভাবিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধে অনেক পরিবারে উপার্জনক্ষম প্রধান ব্যক্তিটিই মারা গেছেন। সেই পরিবারের যে জীবনসংগ্রাম, তা উঠে আসছে এই গবেষণাপত্রে।’

শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরীর মতে, সেই সব লড়াকু মায়ের কথা আমরা মনে রাখিনি। গবেষককে ধন্যবাদ, তিনি তাদের সেই অজানা কথা তুলে এনেছেন। এ ধরনের গবেষণা আরো বড় পরিসরে হওয়া জরুরি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে যারা ভুলে যেতে চায়, তাদের বুঝতে হবে মুক্তিযুদ্ধ এ দেশের অস্তিত্ব।

অধ্যাপক মেঘনা গুহঠাকুরতার মতে, এই গবেষণায় শহীদ জায়াদের অনেক অজানা তথ্য উঠে এসেছে। আমি আমার মা বাসন্তী গুহঠাকুরতা, শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, পান্না কায়সারের জীবন সংগ্রাম সামনে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। যে শহীদ জায়াদের কথা, অভিজ্ঞতা, জীবন সংগ্রাম কেউ জানেন না, এই গবেষণা পত্রে তাদের কথা উঠে এসেছে। এই গবেষণা থেকে আরো অনেক গবেষণার দ্বার খুলে যাবে বলে মনে করেন তিনি ।

প্রাক গবেষণাপত্রটিকে সমৃদ্ধ করতে কিছু পরামর্শ দেন অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, এ গবেষণাটি একটি প্রাথমিক ভিত্তি হতে পারে। যেহেতু এটি এখনো বই আকারে প্রকাশ হয়নি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর গবেষণা কর্মটি আরও বড় পরিসরে করলে এটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে।

জাদুঘরের আরেক ট্রাস্টি সারওয়ার আলী বললেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরতে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। এটি প্রাথমিক গবেষণাপত্র। এটিকে সমৃদ্ধ করা গেলে মুক্তিযুদ্ধের একটা অনালোচিত অধ্যায় নতুন চিন্তার খোরাক জোগাবে। মুক্তিযুদ্ধ যে ১৬ ডিসেম্বর শেষ হয়ে যায়নি, বরং যুদ্ধে স্বামীহারা কিংবা পরিবারের প্রধান ব্যক্তিকে হারিয়ে যে অথৈ লড়াই করেছেন আমাদের মায়েরা, তা গবেষণাপত্রে উঠে এসেছে।’