ভূমি বিরোধ ও সহিংসতার শিকার ৭২ শতাংশ নারী
- সর্বশেষ আপডেট ০৫:৪৮:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬
- / 73
দেশের ৭২ শতাংশ নারী ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ বা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে ৫৬ শতাংশ নারী সরাসরি শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক নির্যাতনের মুখোমুখি হন। নির্যাতনের শিকার নারীদের ৮৯ শতাংশ চরম মানসিক নিপীড়ন, ৭৮ শতাংশ অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং ৩০ শতাংশ শারীরিক নিরাপত্তার হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন।
ভূমিসংক্রান্ত বিরোধে ভুক্তভোগী নারীদের মাত্র ২০ শতাংশ আদালতে মামলা করতে পারেন। বাকি ৮০ শতাংশ ব্যয় ও আইনি জটিলতার কারণে বিচারিক প্রক্রিয়ায় যেতে পারেন না।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাজধানীর সিরডাপের এটিএম শামসুল হক মিলনায়তনে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) আয়োজিত ‘গ্রামীণ বাংলাদেশে ভূমির অধিকার ও নারীর প্রতি সহিংসতা’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
এএলআরডির উদ্যোগে হাওর, পার্বত্য এলাকা, চরাঞ্চল ও উপকূলীয়—দেশের চার ভিন্ন ভৌগোলিক ও পরিবেশগত অঞ্চলে পরিচালিত গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার ফলাফল নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিআরডি) গবেষণা সমন্বয়কারী মোহাম্মদ ওমর ফারুক।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বক্তব্য দেন চাকমা সার্কেল চিফের উপদেষ্টা রানী য়েন য়েন, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান, কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা এবং নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরিন পারভীন হকসহ অনেকে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, পুরুষতান্ত্রিক ভূমি ব্যবস্থা এবং পরচা ও ভূমি রেকর্ডে পুরুষের একক আধিপত্যের কারণে নারীরা ধীরে ধীরে ভূ-সম্পত্তি ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। গ্রামীণ ও পাহাড়ি এলাকায় ভূমিকে কেন্দ্র করে নারীর ওপর নানা ধরনের সহিংসতা বাড়ছে।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, প্রশাসনিক জটিলতা ও পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর কারণে নারীদের ভূমির অধিকার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে শুধু আইনি প্রতিকার যথেষ্ট নয়; খাসজমি বন্দোবস্ত পুনরায় চালু, নারী কৃষকদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শ ছিল সমতা, সাম্য ও মানবিক মর্যাদা। দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমাতে সরকার সর্বজনীন জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষার দিকে এগোচ্ছে। ভূমির মালিকানা নির্ধারণে দলিল, দাখিলা ও দখলের বিষয়গুলো সহজভাবে চিহ্নিত করা গেলে সমস্যা সমাধানে অগ্রগতি সম্ভব।
তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। নারীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তাদের জীবনচক্রের প্রতিটি পর্যায় বিবেচনায় নিয়ে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রকৃত অধিকারভোগীদের ভিত্তিতে তালিকা তৈরি এবং নারীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও সরকারের অগ্রাধিকার বলে জানান তিনি।
রানী য়েন য়েন বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে আদিবাসীদের ভূমি থেকে উচ্ছেদের অন্যতম কৌশল হিসেবে নারীদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এর পেছনে ভূমির ওপর আদিবাসীদের সামষ্টিক অধিকার হরণের প্রবণতা কাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রান্তিক আদিবাসী নারীদের বিয়ের মাধ্যমে ধর্মান্তকরণও ভূমি দখলের নতুন কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, সমাজ ও উত্তরাধিকার আইনেও নারীরা বৈষম্যের শিকার। রাষ্ট্র পুরোপুরি নারী-বান্ধব না হলে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন কঠিন। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করেন।
নিরূপা দেওয়ান বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের ভূমির অধিকার ক্রমাগত খর্ব হচ্ছে। ভূমি নিয়ে নারীর ওপর সহিংসতার ঘটনায় মামলা হলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না।
এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা জানান, কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ ৫৮ শতাংশের বেশি হলেও কৃষক হিসেবে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। তিনি সব নারী কৃষকের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালু এবং স্থগিত খাসজমি বন্দোবস্ত পুনরায় শুরু করে প্রকৃত ভূমিহীন নারীদের মধ্যে জমি বিতরণের দাবি জানান।
নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরিন পারভীন হক বলেন, নারী সংস্কার কমিশনের ৩০০টির বেশি সুপারিশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ভূমি বন্দোবস্তের অগ্রাধিকার তালিকায় ‘সক্ষম পুত্র সন্তান’ রাখার বৈষম্যমূলক শর্ত বাতিলেরও দাবি জানান তিনি।
সেমিনারে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ভূমিহীন ও আদিবাসী নারী নেত্রীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তারা ভুয়া মামলা, জমি দখল, উচ্ছেদ ও নিরাপত্তাহীনতার বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেন।
মুক্ত আলোচনা পর্বে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন সংশোধন, ভূমি কমিশনে আদিবাসী নারীর প্রতিনিধিত্ব, তহসিল অফিসগুলো নারী-বান্ধব করা, নামজারি প্রক্রিয়া সহজ করা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নারীর ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা এবং ভূমি বিরোধের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানানো হয়।
সমাপনী বক্তব্যে এএলআরডির চেয়ারম্যান ও ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, তৃণমূলের নারীদের ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই শুধু তাদের নিজেদের নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। সেমিনারে উঠে আসা সুপারিশগুলো ভবিষ্যতে নীতি প্রণয়ন ও অ্যাডভোকেসিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
































