বাংলাদেশের তিন-চতুর্থাংশ নারী সহিংসতার শিকার: জরিপ
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:৪০:৫১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬
- / 212
বাংলাদেশের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি নারী জীবনের কোনো না কোনো সময় সহিংসতার শিকার হন। তাই কার্যকর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আদালতের পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ের উদ্যোগ, আইনি সহায়তা সেবা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা জোরদার করা জরুরি।
বৃহস্পতিবার ( ১২ মার্চ) বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আয়োজনে বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় জাতিসংঘের নারীর মর্যাদা বিষয়ক কমিশন (সি এস ডব্লিউ) এর ৭০ তম অধিবেশনে অনলাইনে ” জাস্টিস বিওয়ান্ড দ্য কোর্ট রুম স্ট্রাকচারাল ব্যারিয়াস ফ্যাসিং ওমেন এন্ড গার্লস ইন বাংলাদেশ ” শিরোনামে প্যারালাল ইভেন্টে ইউএনপিএ ও বিবিএস এর সাম্প্রতিক জাতীয় জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে ।
অনলাইন অধিবেশন সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এবং আইন বিশ্লেষক ও গবেষক ফউজুল আজিম। বক্তব্য দেন, সাবেক সচিব রেহানা পারভীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক খান, পিএইচডি।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে ফউজুল আজিম বলেন, বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশুদের জন্য ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার এখনও নানা কাঠামোগত বাধার মুখে রয়েছে। ন্যায়বিচার কেবল আদালতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা নারীদের বিচার পাওয়ার সক্ষমতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। যদিও সংবিধান ও আইনি কাঠামো নারীর অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং বিভিন্ন আইনি সংস্কার হয়েছে, তবুও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা, আইনি সচেতনতার অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নারীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে এখনো বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নারী ও কন্যার ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ভূমিকাসমূহের উল্লেখ করে বলা হয়, নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা মোকাবিলা এবং নারীর ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপ-কমিটি বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ২০২৫ সালে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৯৯০টি সরাসরি অভিযোগ গ্রহণ করা হয়, এর মধ্যে ৮৫০টি আইনি পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতির মাধ্যমে ৪৭৩টি মামলার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব হয়েছে।
এসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নারীদের জন্য মোট ৬৩ লাখ ০৪ হাজার ৬০০ টাকা দেনমোহর আদায় করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালে ফৌজদারি ও পারিবারিক বিষয়ে মোট ২৩২টি মামলা পরিচালনা করা হয় এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ভুক্তভোগীদের পক্ষে ৬টি মামলায় রায় প্রদান হয়। নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবিতে ২০২৫ সালে মোট ৪৬৯টি ডেপুটেশন ও স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় বৈষম্যমূলক আইন সংস্কার আন্দোলনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। সংগঠনের এই সক্রিয় ভূমিকার কারণে মামলা দায়েরের পূর্বে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতার বিধান, পারিবারিক সহিংসতা আইন পর্যালোচনা, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে পৃথক আইন প্রণয়নের অনুমোদন এবং ধর্ষণের সংজ্ঞা হালনাগাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ২০২৫ সালে সরকারি উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে।
ফউজুল আজিম আরো বলেন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আশ্রয়কেন্দ্র ‘রোকেয়া সদন’ সহিংসতার শিকার নারীদের অস্থায়ী আশ্রয়, মনোসামাজিক সহায়তা এবং পুনর্বাসনে সহায়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছে। এইসব আইনি সহায়তা, অ্যাডভোকেসি এবং কমিউনিটি উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নারীর ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি ও লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
সাবেক সচিব রেহানা পারভীন বলেন, বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশুর ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা কাঠামোগত বাধা এখনও বিদ্যমান। যদিও শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আইনি কাঠামোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে, তবুও ন্যায়বিচারে সহজ প্রবেশাধিকার সবসময় নিশ্চিত হয়নি। আনুষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি সালিশ, আইনি সহায়তা ও নাগরিক সমাজের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলোর কার্যকারিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সামাজিক মানসিকতা, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন জরুরি। একই সঙ্গে নারী ও কন্যাশিশুর শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা বাড়ানোর মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুর রাজ্জাক খান বলেন, সহিংসতার শিকার নারীদের ঘটনা সম্মানের ভয়ে, কমিউনিটির চাপে অনেক সময় অপ্রকাশিত থেকে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যম শুধু তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।গণমাধ্যম সহিংসতার ঘটনা তুলে ধরে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারে, ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বরকে সামনে আনতে পারে এবং সমাজে প্রচলিত বৈষম্যমূলক ধারণাগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। গবেষণা ও আলোচনায়ও দেখা গেছে, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গণমাধ্যম জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । তিনি এসময় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির উপর জোর দিয়ে বলেন গণমাধ্যম মানুষের কাছে আইনি অধিকার, আইনি সহায়তা ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য পৌঁছে দিতে পারে, যা নারী ও কন্যার ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথকে সহজ করবে।
তিনি আরো বলেন, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে জেন্ডার-সংবেদনশীলতা অত্যন্ত জরুরি, কারণ অসংবেদনশীল প্রতিবেদন কখনো কখনো ভুক্তভোগীদের আরও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলতে পারে।
মডারেটরের বক্তব্যে ফওজিয়া মোসলেম বলেন, বাংলাদেশের আইন অনুসারে ধর্ষণ হলো ফৌজদারী অপরাধ। কিন্তু আমাদের সমাজে ধর্ষণের ঘটনায় এখনো সালিশের মাধ্যমে আপোষের চেষ্টা করা হয়। সহিংসতার বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার একটি সামাজিক ইস্যূ। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ৮০ দশক থেকে নারীর প্রতি সহিংসতা বিরুদ্ধে বহুমাত্রিক পদ্ধতিতে কাজ করছে। সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে, সমগ্র সমাজ সচেতন হলে পরিবার সচেতন হবে । শক্তিশালী নারী আন্দোলন গড়ে তুলতে, নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সংগঠন কাজ করছে অবিরামভাবে। এই প্রক্রিয়ায় জেন্ডার বান্ধব ন্যায়বিচার প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে পারবো বলে বিশ্বাস করি।
স্বাগত বক্তব্যে সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, এ বছরে জাতিসংঘের নারীর মর্যাদা বিষয়ক কমিশন–এর ৭০তম অধিবেশন (CSW70)-এর মূল প্রতিপাদ্য হলো সকল নারী ও কন্যাশিশুর জন্য ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত ও শক্তিশালী করা। এই প্রেক্ষাপটে সংগঠনের আয়োজিত প্যারালাল ইভেন্ট এই বৈশ্বিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। , ন্যায়বিচার কেবল আদালত বা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিক কাঠামো, বৈষম্যমূলক আইন ও প্রথা এবং ক্ষমতার সম্পর্কের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ দীর্ঘদিন ধরে নারীর মানবাধিকার, জেন্ডারসমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে আসছে এবং মনে করে যে প্রকৃত ন্যায়বিচারের জন্য কাঠামোগত বৈষম্য দূর করা জরুরি। তিনি এসময় আরো বলেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকার, নাগরিক সমাজ, আইনি প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন, পাশাপাশি তৃণমূলভিত্তিক আন্দোলন, নারীবাদী নেতৃত্ব ও বৈশ্বিক সংহতি জোরদার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এসময়বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের প্রেক্ষাপটে সর্বত্র অবিলম্বে ও নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতির আহ্বানও জানান এবং আশা প্রকাশ করা হয় যে এ ধরনের আলোচনা জেন্ডার -সংবেদনশীল ন্যায়বিচার ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে বলে উল্লেখ করে।
মুক্ত আলোচনায় ইন্টারন্যাশনাল উইমেন পিস গ্রুপের প্রতিনিধি, সাংবাদিক,সরকারের প্রতিনিধি, নরডিক কনসালটিং গ্রুপের প্রতিনিধিবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।
উক্ত অনলাইন অধিবেশনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে আলোচনায় ইন্টারন্যাশনাল উইমেন পিস গ্রুপের প্রতিনিধি, সাংবাদিক, নরডিক কনসালটিং গ্রুপের প্রতিনিধিবৃন্দ; বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর কমিটির নেতৃবৃন্দ, সম্পাদকমন্ডলী, কর্মকর্তাগণ এবং সাংবাদিকবৃন্দ যুক্ত ছিলেন।


































