গুম মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর, কেউ ফিরে, কেউ ফিরেন না
- সর্বশেষ আপডেট ১০:৩৬:৪৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
- / 8
আজ ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। ‘গুম’ শুধু একটি শব্দ নয়, এটি ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার নাম। মৃত্যুর পর স্বজনরা অন্তত শেষকৃত্য সম্পন্ন করে শোক পালনের সুযোগ পান। কিন্তু গুমের শিকার ব্যক্তির ক্ষেত্রে সেই সুযোগও অনেক সময় থাকে না। তিনি জীবিত নাকি মৃত, কোথায় আছেন কিংবা তার পরিণতি কী; এসব প্রশ্নের উত্তর না পেয়েই বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয় পরিবারের সদস্যদের।
এবার ‘ভিক্টিমস ফার্স্ট, অ্যাকশন্স নাউ’ প্রতিপাদ্যে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে সাত শতাধিক মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন বলে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাদের কেউ দীর্ঘদিন পর পরিবারের কাছে ফিরেছেন। আবার বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমসহ অনেকে এখনও নিখোঁজ। বছরের পর বছর ধরে এসব পরিবারের সদস্যরা প্রিয়জনের ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের ইতিহাস
বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক গুমের ঘটনা বন্ধ, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর গুম হওয়া ব্যক্তিদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সনদ গ্রহণের প্রস্তাব অনুমোদন করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ।
পরে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পারসন্স অ্যাগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ কার্যকর হয়। এর ধারাবাহিকতায় ৩০ আগস্টকে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে। ২০১১ সাল থেকে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে।
দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো জোরপূর্বক গুমকে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা এবং রাষ্ট্রগুলোর ওপর জবাবদিহির চাপ তৈরি করা।
বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ
বাংলাদেশে গুমের ঘটনা গত দেড় দশকে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। বিশেষ করে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া এবং পরে তাদের আর কোনো সন্ধান না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর গুমের ঘটনাগুলো তদন্তে গঠিত কমিশনের কার্যক্রমের মাধ্যমে বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। গুমের অভিযোগ তদন্তে কমিশন একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিবেদনে গোপন আটককেন্দ্রের অস্তিত্ব, নির্যাতন এবং দীর্ঘদিন আটকে রাখার বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করে। এরপর গুমের ঘটনায় বিচার ও দায়ীদের জবাবদিহির বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়।
গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার শুরু হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, গুম মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। বর্তমান সরকার গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধে পৃথক আইনি কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার দমনে আগের সরকার গুম-অপহরণের পথ বেছে নিয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে ভুক্তভোগীদের গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখা হতো, যেগুলো জনপরিসরে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
তিনি আরও জানান, বিভিন্ন দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যবহার করে সাত শতাধিক মানুষকে গুম করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ও সংসদে উত্থাপিত হয়েছে।
গুমের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, সংসদে বিল
গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
প্রস্তাবিত আইনে গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুমের ফলে কারও মৃত্যু হলে, মরদেহ উদ্ধার হলে কিংবা পাঁচ বছর পরও নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান না মিললে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
গুম কমিশনে প্রায় দুই হাজার অভিযোগ
গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিশনের কাছে ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে এর মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে জোরপূর্বক গুম হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিকে মৃত বলে ধারণা করা হয়েছে।
কমিশনের সদস্যরা মনে করেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তাদের ধারণা, দেশে ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার মানুষ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়ে থাকতে পারেন। কারণ অনেক ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার কমিশনের কাছে অভিযোগ করেননি।
কমিশনের প্রতিবেদনে কয়েকটি আলোচিত গুমের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সালাহউদ্দিন আহমদ, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, জামায়াত নেতা আবদুল্লাহিল আমান আজমি, আইনজীবী মীর আহমাদ বিন কাসেম এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানের ঘটনা রয়েছে।
২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল গাড়িচালকসহ নিখোঁজ হন বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ২০১০ সালের ২৫ জুন ঢাকার কাছ থেকে নিখোঁজ হন বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম। তারও কোনো সন্ধান মেলেনি।
‘আয়নাঘর’-এর ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
গুমের ঘটনায় আলোচনায় আসা ‘আয়নাঘর’ ছিল গোপন বন্দিশালার একটি প্রতীকী নাম। এসব স্থানে ভুক্তভোগীদের চোখ ও হাত বেঁধে নিয়ে যাওয়া, অন্ধকার বা জানালাবিহীন কক্ষে আটকে রাখা এবং নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন ফিরে আসা ব্যক্তিরা।
ভুক্তভোগীদের বর্ণনা অনুযায়ী, অনেক কক্ষে দিনের আলো প্রবেশের সুযোগ ছিল না। সারাক্ষণ আলো জ্বালিয়ে রাখা কিংবা দীর্ঘ সময় অন্ধকারে রাখার কারণে দিন-রাতের হিসাবও বোঝা যেত না। কোথাও আবার এগজস্ট ফ্যানের শব্দের কারণে বাইরের কোনো আওয়াজ শোনা যেত না।
ফিরে আসা কয়েকজন জানিয়েছেন, তাদের নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। কখনো কখনো নির্যাতনকক্ষে নিয়ে যাওয়া হতো। হাতকড়া ও চোখ বাঁধা অবস্থায় অন্য বন্দিদের কান্না ও আর্তনাদও শুনতে পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন তারা।
সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান, যিনি দুই দফা গুমের শিকার হয়েছিলেন, বলেছেন, ‘আয়নাঘর’ একটি রূপক নাম। সেখানে বন্দি ব্যক্তি নিজেকে ছাড়া আর কাউকে দেখতে পেতেন না।
ফিরে আসার অপেক্ষায় স্বজনেরা
গুমের সবচেয়ে বড় শিকার শুধু নিখোঁজ ব্যক্তিই নন, তার পরিবারও। প্রিয়জন জীবিত নাকি মৃত; এই অনিশ্চয়তার মধ্যে বছরের পর বছর কাটাতে হয় তাদের। অনেক পরিবার অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক চাপ ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিন পার করছে।
শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর ৬ আগস্ট গোপন বন্দিশালা থেকে মুক্তি পান দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা তিনজন ; সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, আইনজীবী আহমাদ বিন কাসেম (আরমান) এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমা। তাদের মধ্যে প্রথম দুজন প্রায় আট বছর এবং মাইকেল চাকমা পাঁচ বছরের বেশি সময় গোপন বন্দিশালায় ছিলেন।
তবে এখনও অনেক পরিবার জানে না তাদের নিখোঁজ স্বজন কোথায়। কেউ ফিরে এসেছেন, কেউ আর কখনও ফেরেননি। তাই আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে তাদের একটাই দাবি;নিখোঁজদের সন্ধান, গুমের প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিচার।































