ইসলামিক ফাউন্ডেশনে কুরআন কেলেঙ্কারি
- সর্বশেষ আপডেট ০৩:৪১:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
- / 144
ইসলামিক ফাউন্ডেশনে পবিত্র কোরআনুল কারিম মুদ্রণ ও ধর্মীয় বই কেনাকাটায় বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অডিট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কোরআন ছাপানোর নামে অর্থ আত্মসাৎ, কম দামে বই কিনে বেশি দাম দেখানো এবং কার্যাদেশ ছাড়াই বই ছাপানোর মতো অনিয়ম হয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত মসজিদভিত্তিক প্রকল্পের জন্য ২৩ লাখ ৩১ হাজার কপি পবিত্র কোরআন বাইরের বিভিন্ন প্রেস থেকে ছাপানো হয়। অথচ ফাউন্ডেশনের নিজস্ব প্রেসে কোরআন ছাপানো ও বাঁধাইয়ের বিধান ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফাউন্ডেশনের নিজস্ব প্রেসে প্রতি কপির জন্য ১৯৫ টাকা মূল্য নির্ধারণ করা হলেও বাইরের প্রেস থেকে এর চেয়ে কম দামে কোরআন ছাপানো হয়। এরপর হিসাবের খাতায় বেশি দাম দেখিয়ে পাঁচ বছরে প্রায় ১২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। একই সময়ে প্রায় এক লাখ কপি কোরআন সরবরাহ না করেই প্রায় দুই কোটি টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কম দামে নিম্নমানের কাগজে কুরআন ছাপানোর অভিযোগ ছিল। সে সময় ফাউন্ডেশনের মান যাচাইকারী কর্মকর্তা আব্দুর রশীদ আল মামুন নিম্নমানের কপি সরবরাহের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
কোরআন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ধলেশ্বরী ও দশদিশা প্রিন্টার্সসহ কয়েকটি ছাপাখানার নাম এসেছে। দশদিশা গ্রুপের চেয়ারম্যান আমীন হেলালী বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রেসের চাহিদা অনুযায়ীই তারা কাজ করেছেন এবং যেভাবে সরবরাহ করতে বলা হয়েছে, সেভাবেই টেন্ডারে অংশ নিয়েছেন।
সহজ কুরআন শিক্ষার বইয়েও অনিয়ম
শুধু কুরআন ছাপানোর ক্ষেত্রেই নয়, সহজ কুরআন শিক্ষাসহ কয়েকটি ধর্মীয় বই মুদ্রণ ও কেনাকাটায়ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০১৯ শিক্ষাবর্ষের জন্য সহজ কুরআন শিক্ষাসহ তিনটি বইয়ের প্রায় দেড় কোটি কপি বাইরের প্রেসে ছাপানো হয়। এসব বই প্রকৃত মূল্যের প্রায় অর্ধেক দামে ছাপানো হলেও হিসাবের খাতায় বেশি মূল্য দেখিয়ে প্রায় ২১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
প্রিয়াঙ্কা প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশনের স্বত্বাধিকারী সামছুল হক জানান, দীর্ঘদিন ধরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কাজ বাইরের প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে করানো হচ্ছে। তাদের কাছে মুদ্রণের কাজ দেওয়া হলে তারা তা সম্পন্ন করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষেও সহজ কুরআন শিক্ষাসহ নিম্নমানের পাঠ্যপুস্তক বিতরণ ও অনিয়মের অভিযোগে ধর্ম মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে সেই কমিটির প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি।
হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তি
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অডিট বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মুদ্রণ-বাঁধাই, কেনাকাটা, নিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৫৩১ কোটি টাকার অনিয়মের বিষয়ে অডিট আপত্তি রয়েছে। এসব আপত্তির বড় অংশ এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
বিষয়টিকে অপ্রত্যাশিত ও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সচিব শেখ মুর্শিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, দুর্নীতির সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক, তাকে বিচারের আওতায় আনা উচিত এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সদ্য বিদায়ী মহাপরিচালকও জানান, তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রতিবেদনটি আবার পর্যালোচনা করে প্রয়োজনে অধিকতর তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তদন্তে অসহযোগিতার অভিযোগে প্রেসের সাবেক ব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ এ ধরনের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ধর্মীয় কাজে অর্থের সংকট হলে সাধারণ মানুষ সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। সেই প্রতিষ্ঠানে ঘুষ, দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
দীর্ঘদিন ধরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও তা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি; ধর্ম মন্ত্রণালয়ের আগের এক তদন্ত প্রতিবেদনেও এমন চিত্র উঠে এসেছে।































