অধিকার রক্ষায় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি জরুরি
- সর্বশেষ আপডেট ০৬:৩৩:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
- / 10
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ ছাড়া মানুষের মৌলিক অধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা ও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন সংকটের অন্যতম কারণ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ঘাটতি। এ সংকট মোকাবিলায় সরকার, নাগরিক সমাজ এবং বেসরকারি অংশীজনদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘স্বাধীনতা: ডিজিটাল গণতন্ত্রের জন্য মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকার। তবে বর্তমান বিশ্বে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে মানুষ নিজের মেধা ও চিন্তার চর্চার পরিবর্তে ক্রমেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, সরকার বৃহৎ পরিসরে কাজ করে বলে ব্যবস্থার বিভিন্ন দুর্বলতা থাকতেই পারে। এসব দুর্বলতা চিহ্নিত করা বেসরকারি সংস্থার জন্য তুলনামূলক সহজ হলেও শুধু ত্রুটি ধরিয়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। বরং সমাজের সব পর্যায়ের অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ এগিয়ে নিতে হবে।
স্বপন আরও বলেন, ব্যক্তি ও রাষ্ট্র; উভয়েরই নিজস্ব স্বার্থ ও অগ্রাধিকার রয়েছে। ক্ষমতা, অর্থনৈতিক অবস্থান ও সামাজিক প্রভাবের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের আচরণও বদলে যায়। তাই সবার জন্য ন্যূনতম অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রয়োজন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সামনে স্বাধীনতার অর্জন ও সীমাবদ্ধতার নতুন বাস্তবতা তুলে ধরেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই অভিজ্ঞতা থেকেই দেশকে নতুন পথে এগিয়ে নিতে হবে। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীলভাবে নিশ্চিত করাও জরুরি।
তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, তা বোঝার অন্যতম মাপকাঠি হলো সেখানে নাগরিকদের স্বাধীনতা ও অধিকার কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকারের ভুল-ত্রুটি শুধু তুলে ধরার পরিবর্তে নাগরিক সমাজ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের উদ্যোগের সঙ্গে সমন্বয় করে রাষ্ট্র ও সমাজের কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির তথ্য
সেমিনারে উপস্থাপিত মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের যৌথ গবেষণায় বলা হয়, ২০২৪-২০২৫ সময়ে ৪৯৬ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সময়ে সাংবাদিকদের ওপর ২৭৪টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১২৬ জন সাংবাদিক আহত হয়েছেন এবং প্রায় ১৫০ জন চাকরি হারিয়েছেন।
গবেষণায় আরও বলা হয়, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে (সিএসএ) বাংলাদেশে মোট ৭৩৬টি মামলা করা হয়। এসব মামলার মধ্যে ১৩৫টি ছিল সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে।
সিআইভিআইসিইউএসের ২০২২-২০২৩ সালের প্রতিবেদন তুলে ধরে বক্তারা বলেন, একসময় বাংলাদেশের নাগরিক স্বাধীনতার সূচক অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছিল। তবে ২০২৪ সালের আগস্টের পর জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী সংস্কারমূলক পদক্ষেপের পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ
পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ বলেন, বর্তমানে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন না থাকলেও গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে বিভাজন তৈরি হচ্ছে। গত ১৫-১৬ বছরে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নে ৬৫ জন সাংবাদিক নিহত এবং এক হাজারের বেশি সাংবাদিক আহত হয়েছেন।
তিনি বলেন, এখন রাষ্ট্রীয় বাধা না থাকলেও শিল্পগোষ্ঠী ও প্রভাবশালী মহলের হাতে গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বড় শিল্পগোষ্ঠীর একের পর এক গণমাধ্যম কেনার ফলে ‘মিডিয়া অলিগার্কি’ তৈরি হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ফারুক ওয়াসিফের মতে, সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ যদি অল্প কয়েকজন ধনী ব্যবসায়ী বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের তথ্য অধিকার ও স্বাধীন সাংবাদিকতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেপুটি হেড অব ডেলিগেশন এবং পলিটিক্যাল, ইকোনমিক, ট্রেড, প্রেস অ্যান্ড ইনফরমেশন সেকশনের প্রধান বাইবা জারিনা বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও নাগরিক অংশগ্রহণ একটি উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক সমাজের মৌলিক ভিত্তি। বর্তমান সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ডিজিটাল অংশগ্রহণ পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
বিশেষ করে তরুণ, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের সহায়তার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সেবা রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। কোনো সাংবাদিক বা মানবাধিকারকর্মী হুমকির মুখে পড়লে কোথায় যাবেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন এবং কী ধরনের সহায়তা পাবেন; তা স্পষ্ট থাকা দরকার। এ ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ‘রেফারেল পাথওয়ে’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাইবা জারিনা আরও বলেন, একটি রেফারেল ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য, সহজলভ্য ও গোপনীয় হতে হবে। সরকার, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগেই ঝুঁকিতে থাকা সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
নিরাপদ ডিজিটাল পরিসরের তাগিদ
স্বাগত বক্তব্যে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস বলেন, ডিজিটাল গণতন্ত্র শুধু মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষ প্রযুক্তি কতটা নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে পারছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, শুধু প্ল্যাটফর্ম, নীতিমালা বা কর্মপরিকল্পনা থাকলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। অভিযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত সাড়া এবং সময়োপযোগী আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, শুধু আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। অপতথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার ও ডিজিটাল হয়রানি বাড়ছে। তাই নাগরিকদের সচেতন করার পাশাপাশি তরুণদের পরিবর্তনের অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিকদের অধিকার নয়; মানবাধিকারকর্মী ও সাধারণ নাগরিকেরও সমান অধিকার রয়েছে। বিশেষ করে তৃণমূলের সাংবাদিক এবং অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কথা বলা ব্যক্তিদের নিরাপদে মতপ্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
সেমিনারে ‘স্বাধীনতা’ প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ইয়ুথ অ্যান্ড সোশ্যাল কোহিশন লিড ওয়াসিউর রহমান তন্ময়। তিনি বলেন, আইন পাস ও নীতিগত পরিবর্তন হলেও মানুষের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি পুরোপুরি ফিরে আসেনি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধরে রাখার পাশাপাশি অপতথ্য ও ভুলতথ্য মোকাবিলা এবং নারীদের নিরাপদ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানা বলেন, সাংবাদিকরা হুমকির মুখে পড়লেও অনেক সময় অন্যরা তাদের পাশে দাঁড়ান না। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৃহত্তর সামাজিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
একাত্তর টেলিভিশনের প্রধান প্রতিবেদক শাহনাজ শারমিন বলেন, সাংবাদিকরা সবসময় ক্ষমতা ও বিরোধী পক্ষের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকেন। সরকারে থাকা অবস্থায় সাংবাদিকদের শত্রু এবং বিরোধী দলে থাকলে বন্ধু হিসেবে দেখা; এমন প্রবণতা রয়েছে। অথচ সাংবাদিকদের ওপর কোনো ঘটনা ঘটলে তাদের পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে অন্য পেশার মানুষ খুব কমই কথা বলেন। বরং অনেক সময় কোনো ঘটনা ঘটলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সব দায় গণমাধ্যমের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।





























