বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার ৯ প্রতিশ্রুতি
- সর্বশেষ আপডেট ০৪:৫২:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 93
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি দীর্ঘ বিরতির পর তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে, যা শুধু নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ঢাকার একটি হোটেলে ঘোষণা করা এই ইশতেহারে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও কর্মসংস্থান নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন।
ইশতেহারের মূল কাঠামো পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথম ভাগ রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কারকে কেন্দ্র করে, যা আবার গণতন্ত্র ও জাতিগঠন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থান, সাংবিধানিক সংস্কার, সুশাসন এবং স্থানীয় সরকারের কার্যকারিতা সংক্রান্ত পাঁচটি অংশে ভাগ করা হয়েছে। তারেক রহমান বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বিএনপি বিগত সময়ে ঘোষিত ৩১ দফা এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে চায়। এতে ২০২৪ সালের জুলাই–অগাস্টের গণ-অভ্যুত্থান, ‘ফ্যাসিস্ট আমলের মানবতাবিরোধী অপরাধের’ সুবিচার, বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ইতিহাসের নিরপেক্ষ সংরক্ষণের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত।
দ্বিতীয় ভাগ অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক পরিবেশ এবং টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা নিয়ে গঠিত। এতে দেশের প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করার কথা বলা হয়েছে, যা মাসিক আড়াই হাজার টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করবে। কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জন্য ‘কৃষক কার্ড’ ঘোষণা করা হয়েছে, যা সহজ ঋণ, ভর্তুকি, কৃষি বীমা ও বাজারজাতকরণের সুবিধা দেবে। স্বাস্থ্যখাতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তৃতীয় ভাগে শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে, বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় গুরুত্ব, প্রযুক্তি সহায়তা, ‘মিড-ডে মিল’ এবং তরুণদের জন্য স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে সংযুক্তকরণের মাধ্যমে মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ক্রীড়া খাতেও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করা হবে।
পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারের জন্য ১০ হাজার কিলোমিটার নদী–খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ১৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। ব্যাংকিং খাত ও স্বশস্ত্র বাহিনীকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চতুর্থ ভাগে সামাজিক ও ধর্মীয় সংহতি, সাংবাদিকদের সুরক্ষা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত। সকল ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা, গণমাধ্যমের জন্য স্বাধীন রেগুলেটরি বডি গঠন এবং ৩০ দিনের মধ্যে অনলাইন অভিযোগ নিষ্পত্তি এই অংশের মধ্যে উল্লেখ রয়েছে।
পঞ্চম ভাগে ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব বৃদ্ধির পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
ইশতেহারের কেন্দ্রবিন্দুতে নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এগুলো হলো—প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু, কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জন্য ‘কৃষক কার্ড’, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান ও মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ, ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে সম্প্রসারণ, পরিবেশ ও জলবায়ু সংরক্ষণ, ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করা এবং ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়ানো।
তারেক রহমান ইশতেহারে স্পষ্টভাবে বলেছেন, বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই দলের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা—এই নীতিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। ইশতেহার থেকে বোঝা যায়, বিএনপি ক্ষমতায় এলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং দেশের প্রতিটি স্তরে বৈষম্যহীন উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চায়।





































