ঢাকা ০২:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রামিসা হত্যায় আসামিদের আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ

নিউজ ডেস্ক
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:৫৫:১৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
  • / 18

আসামিদের জেল আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ৮ বছর বয়সী শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে নিম্ন আদালতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত দুই প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের জেল আপিল শুনানির জন্য আনুষ্ঠানিক অনুমোদন বা গ্রহণ করেছেন হাইকোর্ট। আজ রোববার (১৪ জুন) বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ জারি করেন।

আদালতে আজ রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই শুনানিতে অংশ নেন সরকারের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। এর আগে গত বৃহস্পতিবার কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দণ্ডপ্রাপ্ত এই দুই আসামি নিম্ন আদালতের ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে এই জেল আপিল দায়ের করেছিলেন।

আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী, গত ৯ জুন রাজধানীর পল্লবীর এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ড (ডেথ রেফারেন্স) অনুমোদনের যাবতীয় নথি হাইকোর্টে এসে পৌঁছায়। ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন দুই আসামির ফাঁসির চূড়ান্ত রায়ে স্বাক্ষর করার পরই এই ডেথ রেফারেন্সের নথিগুলো উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়েছিল। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইন অনুযায়ী, বিচারিক কোনো আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে তা কার্যকর করার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে, যা আইনি পরিভাষায় ‘ডেথ রেফারেন্স’ মামলা হিসেবে পরিচিত।

স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার এই লোমহর্ষক মামলায় গত ৭ জুন (রোববার) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত আসামি সোহেল ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্নার উপস্থিতিতে এই ফাঁসির রায় ঘোষণা করেন। আদালত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(২) ধারার অধীনে আসামিদের এই সর্বোচ্চ সাজা প্রদান করেন। ফাঁসির পাশাপাশি প্রধান আসামি সোহেলকে ৫ লাখ টাকা এবং সহযোগী আসামি স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা আর্থিক জরিমানা বা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়, যা আইন অনুযায়ী ভিকটিম রামিসার প্রকৃত আইনগত উত্তরাধিকারীরা পাবেন। আসামিরা এই ক্ষতিপূরণের অর্থ দিতে ব্যর্থ হলে তাদের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে সেই অর্থ শিশু রামিসার পরিবারকে দেওয়ার জন্য কালেক্টরেটকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

মামলার বিবরণী ও এজাহার থেকে জানা যায়, গত ১৯ মে সকালে পল্লবী এলাকায় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নিজ ঘর থেকে বের হয়। সেই সময় প্রতিবেশী সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার কৌশলে মিষ্টি কথায় ফুসলিয়ে রামিসাকে নিজেদের ফ্ল্যাটে ডেকে নেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার মা তাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করেন এবং একপর্যায়ে সোহেলের বন্ধ দরজার সামনে মেয়ের জুতা দেখতে পান। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের ডেকে এনে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতেই সোহেলের শোয়ার ঘরের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত মরদেহ এবং একটি বড় বালতির ভেতরে কাটা মাথা দেখতে পান স্বজনেরা।

পরবর্তীতে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বপ্নাকে তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের হেফাজতে নেয়। অন্যদিকে মূল খুনি সোহেল রানা পালিয়ে গেলেও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। এই ঘটনায় ভিকটিমের বাবা বাদী হয়ে ২০ মে পল্লবী থানায় একটি হত্যা ও লাশ গুমের মামলা দায়ের করেন।

মামলা দায়েরের পর অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তদন্তে নামে পুলিশ। ঘটনার মাত্র ৪ দিনের মাথায় গত ২৪ মে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান আদালতে ১৮ জনকে সাক্ষী করে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দেন। এরপর গত ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয় এবং ২ জুন মাত্র একদিনের মধ্যে ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের জবানবন্দি ও জেরা সম্পন্ন করেন আদালত। ৩ জুন ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের পরীক্ষা করা হলে তারা নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে। পরবর্তীতে ৪ জুন রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায়ের জন্য ৭ জুন দিন ধার্য করেন এবং ওই দিনই এই ঐতিহাসিক ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় নিম্ন আদালতে এই মামলার বিচার সম্পন্ন হওয়াকে দেশের বিচারিক প্রক্রিয়ায় এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে দেখছেন আইনবিদেরা।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

রামিসা হত্যায় আসামিদের আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ

সর্বশেষ আপডেট ১১:৫৫:১৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে ৮ বছর বয়সী শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে নিম্ন আদালতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত দুই প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের জেল আপিল শুনানির জন্য আনুষ্ঠানিক অনুমোদন বা গ্রহণ করেছেন হাইকোর্ট। আজ রোববার (১৪ জুন) বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ জারি করেন।

আদালতে আজ রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই শুনানিতে অংশ নেন সরকারের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। এর আগে গত বৃহস্পতিবার কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দণ্ডপ্রাপ্ত এই দুই আসামি নিম্ন আদালতের ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে এই জেল আপিল দায়ের করেছিলেন।

আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী, গত ৯ জুন রাজধানীর পল্লবীর এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ড (ডেথ রেফারেন্স) অনুমোদনের যাবতীয় নথি হাইকোর্টে এসে পৌঁছায়। ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন দুই আসামির ফাঁসির চূড়ান্ত রায়ে স্বাক্ষর করার পরই এই ডেথ রেফারেন্সের নথিগুলো উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়েছিল। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইন অনুযায়ী, বিচারিক কোনো আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় হলে তা কার্যকর করার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে, যা আইনি পরিভাষায় ‘ডেথ রেফারেন্স’ মামলা হিসেবে পরিচিত।

স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার এই লোমহর্ষক মামলায় গত ৭ জুন (রোববার) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত আসামি সোহেল ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্নার উপস্থিতিতে এই ফাঁসির রায় ঘোষণা করেন। আদালত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(২) ধারার অধীনে আসামিদের এই সর্বোচ্চ সাজা প্রদান করেন। ফাঁসির পাশাপাশি প্রধান আসামি সোহেলকে ৫ লাখ টাকা এবং সহযোগী আসামি স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা আর্থিক জরিমানা বা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়, যা আইন অনুযায়ী ভিকটিম রামিসার প্রকৃত আইনগত উত্তরাধিকারীরা পাবেন। আসামিরা এই ক্ষতিপূরণের অর্থ দিতে ব্যর্থ হলে তাদের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে সেই অর্থ শিশু রামিসার পরিবারকে দেওয়ার জন্য কালেক্টরেটকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

মামলার বিবরণী ও এজাহার থেকে জানা যায়, গত ১৯ মে সকালে পল্লবী এলাকায় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নিজ ঘর থেকে বের হয়। সেই সময় প্রতিবেশী সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার কৌশলে মিষ্টি কথায় ফুসলিয়ে রামিসাকে নিজেদের ফ্ল্যাটে ডেকে নেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার মা তাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করেন এবং একপর্যায়ে সোহেলের বন্ধ দরজার সামনে মেয়ের জুতা দেখতে পান। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের ডেকে এনে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতেই সোহেলের শোয়ার ঘরের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত মরদেহ এবং একটি বড় বালতির ভেতরে কাটা মাথা দেখতে পান স্বজনেরা।

পরবর্তীতে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বপ্নাকে তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের হেফাজতে নেয়। অন্যদিকে মূল খুনি সোহেল রানা পালিয়ে গেলেও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। এই ঘটনায় ভিকটিমের বাবা বাদী হয়ে ২০ মে পল্লবী থানায় একটি হত্যা ও লাশ গুমের মামলা দায়ের করেন।

মামলা দায়েরের পর অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তদন্তে নামে পুলিশ। ঘটনার মাত্র ৪ দিনের মাথায় গত ২৪ মে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান আদালতে ১৮ জনকে সাক্ষী করে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দেন। এরপর গত ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয় এবং ২ জুন মাত্র একদিনের মধ্যে ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের জবানবন্দি ও জেরা সম্পন্ন করেন আদালত। ৩ জুন ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের পরীক্ষা করা হলে তারা নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে। পরবর্তীতে ৪ জুন রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায়ের জন্য ৭ জুন দিন ধার্য করেন এবং ওই দিনই এই ঐতিহাসিক ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় নিম্ন আদালতে এই মামলার বিচার সম্পন্ন হওয়াকে দেশের বিচারিক প্রক্রিয়ায় এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে দেখছেন আইনবিদেরা।