যৌন নিপীড়ন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে: নোয়াব
- সর্বশেষ আপডেট ০৭:০০:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬
- / 112
সংবাদমাধ্যমে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে যৌন হয়রানি প্রতিকার নীতিমালা ( সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট রেসপন্স প্রোটোকল) প্রকাশনা অনুষ্ঠানে কথা বলছেন অতিথিরা।
যৌন নিপীড়ন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। প্রোটোকল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রতিটি নিউজরুমে এ নিয়ে আলোচনা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন, সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াব সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী। এজন্য গণমাধ্যমে যৌন হয়রানি প্রতিকার নীতিমালা সংবিধানের আলোকে পড়ে শোনানোর আহ্বান জানান তিনি।
বুধবার (২৫ মার্চ) সকাল ১১টায় রাজধানীর একটি হোটেলে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন বাংলাদেশ প্রণীত বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে যৌন হয়রানি প্রতিকার নীতিমালা ( সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট রেসপন্স প্রোটোকল) প্রকাশনা অনুষ্ঠানে একথা বলেন সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াব সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী।
এফসিডিও-এর সহায়তায় বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন পরিচালিত ’স্ট্রেনথেনিং উইমেন জার্নালিস্টস নেটওয়ার্ক টু ট্যাকল সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায় এটি প্রণয়ন করা হয়।
মতিউর রহমান চৌধুরী জেলা পর্যায়েও উদ্যোগ বিস্তারের আহ্বান জানান এবং উল্লেখ করেন, পুরুষ সাংবাদিকরাও হয়রানির শিকার হন। এক্ষেত্রে সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। তাই সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে কাজ করারও আহ্বান জানান তিনি।
মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, গণমাধ্যমে নারী সাংবাদিকরা কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির কথা প্রকাশ করে চান না। টেলিভিশনে নারী কর্মীরা রাতেও অফিসে-বাইরে উভয় জায়গায় কাজ করেন। তাদের ক্ষেত্রে যৌন হয়রানি নির্মূল বা সুরক্ষা আগে জরুরি। টেলিভিশন, সংবাদপত্র প্রত্যেকটা নিউজরুমে দলের উর্ধ্বে উঠে সাংবাদিকদের আওয়াজ তুলতে হবে। যদিও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। তাদের কাজের সুরক্ষা দিতে না পারলে এক পর্যায়ে অন্য পরিস্থিতি তৈরি হবে।
বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. আল মামুন স্বাগত বক্তব্যে বলেন, সংবাদমাধ্যমে নারী সাংবাদিকের সংখ্যা ১০ শতাংশের কম। নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া এই ভারসাম্য আনা সম্ভব নয়। প্রোটোকলটি মালিকপক্ষ ও ব্যবস্থাপনার জন্য দায়বদ্ধতার কাঠামো হিসেবে কাজ করবে।
অনুষ্ঠানে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও সিনিয়র সাংবাদিকরা বলেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকারে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। কেবল নীতিমালা নয়, কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন দৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা ও অঙ্গীকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, প্রোটোকলটি পুরো সিস্টেমের জন্য প্রযোজ্য। জেন্ডার- ফ্রেন্ডলি মিডিয়া হাউসকে স্বীকৃতি দিলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
চ্যানেল আই-এর প্রধান বার্তা সম্পাদক মীর মাসরুর জামান রনি বলেন, এটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, তবে এইচআর নীতিতে অন্তর্ভুক্তি জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে নিপীড়ক থেকে যায়, ভুক্তভোগী চাকরি হারান এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে।
বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সংগঠন ওকাব সভাপতি নজরুল ইসলাম মিঠু বলেন, দেশে আইন থাকলেও তা বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। এই ধরনের গাইডলাইন কার্যকর চর্চার মধ্যেই পরিবর্তন আসবে।
ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কমিউনিকেশনস অ্যানালিস্ট শারারত ইসলাম বলেন, এটি সহজ ও কার্যকর দলিল। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়ন জরুরি মূল চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নেই। বড় গণমাধ্যমগুলো এগিয়ে এলে অন্যরাও উৎসাহিত হবে।
বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের হয়ে প্রোটকলটি প্রস্তুত করেছেন সুলাইমান নিলয়, তিনি ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে বলেন, বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যেই প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়বদ্ধতা রয়েছে । উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এ ক্ষেত্রে কার্যকর। এই নীতিমালা নতুন বাধ্যবাধকতা তৈরি না করে বিদ্যমান দায়িত্ব পালনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
উইমেন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের (ডব্লিউজেএনবি) কো-অর্ডিনেটর এবং অনুষ্ঠানের সঞ্চালক আঙ্গুর নাহার মন্টি বলেন, লোকলজ্জার কারণে যৌন হয়রানির ঘটনা প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। সহকর্মীরা নিরাপদ বোধ না করলে তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। এই নীতিমালা নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরির প্রাথমিক ভিত্তি। নারী-পুরুষ উভয় গণমাধ্যমকর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালাটি উপস্থাপন করেন বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের সিনিয়র মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট অফিসার আরাফাত সিদ্দিক। তিনি জানান, প্রোটোকলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি, সচেতনতা বৃদ্ধি, শাস্তির বিধান স্পষ্টকরণ এবং কার্যকর সুরক্ষা নেটওয়ার্ক গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি প্রকাশিতব্য একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে গড়ে ১৫ শতাংশ গণমাধ্যমকর্মী কর্মক্ষেত্রে সরাসরি যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। তিনি আরো বলেন, সিটি, সেন্ট জর্জ’স ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন এবং বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের অংশীদারিত্বে ডব্লিউএএন-আইএফআরএ ওমেন ইন নিউজ পরিচালিত ২০২৫ সালের যৌথ জরিপে ২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ৩৩৯ জন (১০০ নারী, ১৯০ পুরুষ এবং জেন্ডার জানা যায়নি ৪৯) গণমাধ্যমকর্মী অংশ নেয়। এই অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মৌখিক হয়রানির শিকার ৫১ শতাংশ নারী, ৮ শতাংশ পুরুষ, জেন্ডার জানা যায়নি ১৮ শতাংশ। শারীরিক নির্যাতনের শিকার ২১ শতাংশ নারী, ৪ শতাংশ পুরুষ, জেন্ডার জানা যায়নি ১০ শতাংশ। অনলাইন হয়রানির শিকার ৪৩ শতাংশ নারী, ১৪ শতাংশ পুরুষ, জেন্ডার জানা যায়নি ২৭ শতাংশ। ধর্ষণের শিকার ৭ শতাংশ নারী, ১ শতাংশ পুরুষ, জেন্ডার জানা যায়নি ৮ শতাংশ।
প্রতিবেদনের আরো জানা যায়, মৌখিক হয়রানির অভিযোগের ক্ষেত্রে ৪৩ শতাংশ নারী ও ৬০ শতাংশ পুরুষের অভিযোগে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নেওয়া হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা সতর্কবার্তায় সীমিত ছিল।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা সম্মিলিতভাবে সংবাদমাধ্যমে প্রোটোকলটি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন প্রথম আলো অনলাইন ইংরেজি সংস্করণ সম্পাদক আয়েশা কবীর, দ্যা ফিনান্সিয়ালের বিশেষ সংবাদদাতা মুনিমা সুলতানা, ডেইলি অবজারভারের বিশেষ সংবাদদাতা শাহনাজ বেগম, নাদিরা কিরণ, প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার নাজনীন আখতার, ইন্টারনিউজের কান্ট্রি প্রতিনিধি শামীম আরা শিউলি, বৈশাখি টেলিভিশনের হেড অফ নিউজ জিয়াউল কবীর সুমন এবং বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক সমিতির সভাপতি নাসিমা আক্তার সোমা।
উপস্থিত ছিলেন ইআরএফ প্রেসিডেন্ট দৌলত আক্তার মালা, ইনস্টিটিউট অফ সাইকোলজি অ্যান্ড হেলথ (আইপিএইচ) পরিচালক সাইকোলজিস্ট নাজমুল হোসেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. মিনহাজ উদ্দিন, ডিজিটাল রাইটসের মিরাজ আহমেদ চৌধুরী, গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের সম্পাদক তানভীর সোহেল, চ্যানেল ওয়ানের আমিন আল রশীদ, বাংলাদেশ প্রতিদিনের উপসম্পাদক রাজু আহমেদ, দীপ্ত টিভির হেড অফ নিউজ এস এম আকাশ, বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট রাশেদুল হাসানসহ আরও অনেকে।



















