দুদক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ
ঋণ জালিয়াতিতে সিদ্ধহস্ত এনআরবি ব্যাংকের পরিচালক কামরুল
- সর্বশেষ আপডেট ১০:০৬:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
- / 143
এনআরবি ব্যাংক পিএলসির স্বতন্ত্র পরিচালক মো. কামরুল ইসলাম চৌধুরীর নিয়োগ এবং ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে তদন্তের আবেদন করেছেন ব্যাংকটির একদল কর্মকর্তা-কর্মচারী। গত ৩ আগস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের কাছেও এ বিষয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়। এতে স্বতন্ত্র পরিচালকের ভূমিকা, করপোরেট সুশাসন এবং ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার দাবি জানানো হয়েছে।
আবেদনকারীরা চিঠিতে উল্লেখ করেন, গত ৮ জানুয়ারি মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৫০৭ কোটি ৫১ লাখ টাকার ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (এমডি ও সিইও) মো. কামরুল ইসলাম চৌধুরী। অভিযোগে যে সময়ের আর্থিক অনিয়মের কথা বলা হয়েছে, তখন তিনি মার্কেন্টাইল ব্যাংকের এমডি ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
গত বছরের মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক আদেশের পর তিনি এনআরবি ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে যোগ দেন।
দুদকের করা মামলাটি দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ধারায় করা হয়েছে।
মামলার আসামিদের মধ্যে আরও রয়েছেন ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওবায়দুল করিম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সালমান ওবায়দুল করিম, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের বর্তমান এমডি মতিউল হাসান, সাবেক ডিএমডি ও শাখা ব্যবস্থাপক গাউস-উল-ওয়ারা মোর্তজা, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রতাপ কুমার দেশমুখ, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ম্যানেজার (অপারেশনস) মো. আলীউল্লাহসহ ব্যাংকের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা।
দুদকের মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্তরা পরস্পরের যোগসাজশে পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই ঋণ অনুমোদন এবং ঋণসংক্রান্ত অনিয়ম করেন। তদন্তে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং আইন লঙ্ঘন করে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট থেকে নেওয়া দুটি বৈদেশিক মুদ্রার মেয়াদি ঋণ দেশীয় ব্যাংকিং ইউনিটের আওতায় এনে স্থানীয় মুদ্রায় নতুন দুটি মেয়াদি ঋণে রূপান্তর করা হয়। পরে একটি শ্রেণিকৃত ঋণের দায় নিষ্পত্তির অজুহাতে নতুন ঋণ সৃষ্টি এবং এর মেয়াদ আরও সাত বছর বাড়ানো হয়। এতে গ্রাহককে অন্যায্য সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ করেছে দুদক।
তবে আবেদনকারীরা চিঠিতে স্পষ্ট করে বলেছেন, কোনো অভিযোগ বা ফৌজদারি মামলা হওয়া অপরাধ প্রমাণের সমতুল্য নয়। মামলার চূড়ান্ত ফলাফল যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
তাদের বক্তব্য, একটি তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আস্থাভিত্তিক দায়িত্ব। ব্যাংকিং জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ পাচার বা বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের মতো গুরুতর অভিযোগে কোনো ব্যক্তি অভিযুক্ত থাকলে তিনি স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত মানদণ্ড পূরণ করছেন কি না, তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে দেওয়া আবেদনে কামরুল ইসলাম চৌধুরীর এনআরবি ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর নিয়োগ তফসিলি ব্যাংকের পরিচালকদের জন্য নির্ধারিত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই এবং পর্যালোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকের সুশাসন ও সুনাম রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাংকের পরিচালনা, নিয়োগ ও নির্বাহী সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত এবং করপোরেট সুশাসন বা নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার অনুরোধ করা হয়েছে।
অন্যদিকে দুদকের চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া চিঠিতে বিচারাধীন মামলার তদন্ত সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে পরিচালনার আহ্বান জানানো হয়েছে। কোনো ধরনের বাহ্যিক প্রভাব বা অনৈতিক হস্তক্ষেপ যাতে তদন্তকে প্রভাবিত করতে না পারে, সে বিষয়েও নজর দেওয়ার অনুরোধ করেছেন আবেদনকারীরা।
চিঠিতে এনআরবি ব্যাংকের সাবেক স্বতন্ত্র পরিচালক এ কে এম মিজানুর রহমান, এফসিএর বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনকারীরা দাবি করেছেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী তিনি আইসিএবির শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং অনৈতিক আচরণ ও ব্যাংকের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের অভিযোগের পর পদত্যাগ করেন। তাদের মতে, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি নিয়ন্ত্রক তত্ত্বাবধানে পুনর্গঠিত ব্যাংকগুলোতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে।
এনআরবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের কাছে দেওয়া চিঠিতে আরও বলা হয়, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে পর্ষদ পুনর্গঠনের পর ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন নিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ হয়নি। বরং আগের ব্যবস্থাপনা কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত কিছু ব্যক্তি আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
চিঠিতে বিশেষভাবে দুই ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। তাদের একজন এনআরবি ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক মো. কামরুল ইসলাম চৌধুরী। আবেদনকারীরা বিষয়গুলো দ্রুত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।


































