তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন
বিশ্বকাপ বয়কটের সিদ্ধান্ত একাই নেন আসিফ নজরুল
- সর্বশেষ আপডেট ০৬:০৭:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 27
নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত এককভাবে নিয়েছিলেন তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। দীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রকাশিত তিন সদস্যের কমিটির প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) তদন্ত কমিটির ২২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের অংশগ্রহণ নিয়ে সিদ্ধান্তটি কোনো সম্মিলিত আলোচনা বা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরামর্শের ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি। তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল নিজেই সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন।
ভারতে বাংলাদেশের গ্রুপ পর্বের চারটি ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে তিনটি কলকাতায় এবং একটি মুম্বাইয়ে। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে ম্যাচগুলোর ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধ করেছিল। তবে আইসিসি সেই অনুরোধ নাকচ করলে সরকার বাংলাদেশ দলকে ভারতে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেয় বিসিবিও।
পরবর্তীতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী আমিনুল হক বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে কমিটি তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় অন্য কারও মতামত নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা। এমনকি ক্রিকেটারদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানিয়ে দেন।
তদন্ত কমিটির সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর বলেন, প্রতিবেদনে যে এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি তৎকালীন ক্রীড়ার দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল।
তদন্ত কমিটি মনে করে, এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোনো একজন ব্যক্তির ইচ্ছার ভিত্তিতে নেওয়া উচিত নয়। দেশের ক্রিকেট, ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ এবং কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর প্রত্যাশার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে পরবর্তী সময়ে আসিফ নজরুলের বক্তব্যেও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
গত ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রীয় মাঠ উন্নয়নে বিসিবির দুই কোটি টাকা অনুদান দেওয়ার অনুষ্ঠানে আসিফ নজরুল বলেছিলেন, বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত বিসিবি ও ক্রিকেটাররা নিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, ক্রিকেটার ও বোর্ড দেশের ক্রিকেট, খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের মর্যাদার কথা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অথচ এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, ২২ জানুয়ারি আসিফ নজরুল নিজেই জানিয়েছিলেন, নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকার ক্রিকেট দলকে ভারতে পাঠাচ্ছে না। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে তার বক্তব্যের অবস্থান পরিবর্তন হয় এবং সিদ্ধান্তের দায় বিসিবি ও ক্রিকেটারদের ওপর দেওয়া হয়।
তদন্ত কমিটি বলছে, এ ঘটনা বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়, কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
একই সঙ্গে খেলোয়াড়দের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি। প্রশাসনিক বা কূটনৈতিক কোনো সিদ্ধান্তের কারণে যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্রিকেটাররা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বড় আসরে খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল কি না, তা নিয়ে মতভিন্নতা থাকলেও তদন্ত কমিটির মতে, ভবিষ্যতে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক করা প্রয়োজন।


































