ঢাকা ০৯:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সন্ত্রাসীর আস্তানায় সাব-রেজিস্ট্রারের ‘ভিআইপি’ সেবা

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
  • সর্বশেষ আপডেট ১১:৪৫:৫১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
  • / 77

সন্ত্রাসীর আস্তানায় সাব-রেজিস্ট্রারের ‘ভিআইপি’ সেবা

চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিনের গোপন আস্তানায় গিয়ে ৭৪টি জমির বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন সীতাকুণ্ডের সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব। হত্যা মামলার আসামি ও পুলিশের তালিকাভুক্ত এই সন্ত্রাসীকে বিশেষ ‘ভিআইপি’ সেবা দিয়ে দুই দফায় এসব দলিল নিবন্ধন করা হয়। এর মধ্যে গত ১৭ সেপ্টেম্বর এক দিনেই ৬৫টি এবং ১ অক্টোবর আরও নয়টি দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়েছে।

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সাব-রেজিস্ট্রারের ভূমিকা নিয়ে প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে আইন মন্ত্রণালয়ে মৌখিক অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রায়হান হাবীবের বদলির আদেশও সাত দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল।

গত ২৬ অক্টোবর রায়হান হাবীবসহ দেশের ৮৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে একযোগে বদলি করা হয়। তবে ইয়াসিনের নামে ৬৫টি দলিল নিবন্ধনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর তাঁর বদলির আদেশ স্থগিত করা হয়। এর মধ্যেই ১ অক্টোবর আরও নয়টি দলিল নিবন্ধনের তথ্য সামনে এসেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইয়াসিন জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকার নিয়ন্ত্রণকারী একটি সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান। র‌্যাবের (বর্তমানে এসআরবি) উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া হত্যা মামলার প্রধান আসামি তিনি। হত্যা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ তাঁর বিরুদ্ধে ২০টির বেশি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় পলাতক থাকলেও জমি বিক্রির দলিল নিবন্ধনে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন তিনি।

আস্তানায় গিয়ে নিবন্ধন ৭৪ দলিল

সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ইয়াসিনের দখলে থাকা ২৭৫ শতক জমি বিক্রির জন্য কমিশনের মাধ্যমে দলিল নিবন্ধনের আবেদন করেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন। আবেদনে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষ অসুস্থ থাকায় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে উপস্থিত হতে পারবেন না বলে উল্লেখ করা হয়।

এরপর সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীবের নেতৃত্বে একটি কমিশন টিম ইয়াসিনের গোপন আস্তানায় গিয়ে দলিল নিবন্ধনের কাজ সম্পন্ন করে। দুই দফায় সন্ধ্যার পর এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মচারী করিম, সিরাজউদ্দিন, তুষার ও রতনও যুক্ত ছিলেন।

বাংলাদেশের রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ৩৮ ধারা অনুযায়ী, শারীরিক অক্ষমতা, কারাবাস, গুরুতর অসুস্থতা কিংবা বৈধ কোনো কারণে কোনো ব্যক্তি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে উপস্থিত হতে না পারলে কমিশনের মাধ্যমে দলিল নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত আবেদন, অনুমোদন এবং কমিশনারের উপস্থিতিতে দলিল সম্পাদনসহ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান বলেন, কমিশনের মাধ্যমে একসঙ্গে তিনটির বেশি দলিল নিবন্ধনের সুযোগ নেই। অথচ এক দিনে ৬৫টি দলিল নিবন্ধনের ঘটনা ঘটেছে। কীভাবে এতগুলো দলিল নিবন্ধনের অনুমতি দেওয়া হলো এবং কোন প্রক্রিয়ায় তা সম্পন্ন হয়েছে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

দলিলের মূল্য ২ কোটি ৮৭ লাখ, বাজারমূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি

নিবন্ধন করা ৭৪টি দলিলে জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এসব জমির বর্তমান বাজারমূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি। সে হিসাবে দলিলে দেখানো মূল্য ও বাজারমূল্যের মধ্যে ব্যবধান প্রায় ৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, কয়েক বছর আগেও ঝুট মিলের শ্রমিক হিসেবে কাজ করা ইয়াসিন কীভাবে জঙ্গল সলিমপুরের বিপুল পরিমাণ জমির মালিক হলেন? তাঁর বিরুদ্ধে এতগুলো মামলা থাকা সত্ত্বেও জমির মালিকানা ও বিক্রির প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। আলীনগর এলাকায় ইয়াসিন ও তাঁর বাহিনীর আধিপত্য ছিল দীর্ঘদিনের।

গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্য যৌথ অভিযান চালিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নেন। পরে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পৃথক নিরাপত্তাচৌকি স্থাপন করা হয়। বর্তমানে সেখানে সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা চলছে।

খাজনা পরিশোধ নিয়েও প্রশ্ন

দলিল নিবন্ধনের আগে গত ২৪ আগস্ট ইয়াসিন এসব জমির খাজনা পরিশোধ করেন। এতে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ফজলে রাব্বি বলেন, ইয়াসিনের নামে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি থাকলে মালিকানার অধিকার অনুযায়ী তিনি খাজনা দিতে পারেন। তবে জমির দলিল হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ভূমি অফিসের কোনো ভূমিকা নেই।

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মচারী সিরাজউদ্দিন ইয়াসিনের আস্তানায় গিয়ে দলিল নিবন্ধনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ভাটিয়ারি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার ভেতরে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। জায়গাটি তাঁর কাছে আস্তানা বলে মনে হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট অবস্থান সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে পারেননি।

যা বলছেন সাব-রেজিস্ট্রার ও জেলা প্রশাসক

সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব ২৮ অক্টোবর জানিয়েছিলেন, সীতাকুণ্ড ভূমি অফিসের কাগজপত্র অনুযায়ী জমিগুলো ইয়াসিনের নামে নামজারি করা ছিল এবং তিনি খাজনাও পরিশোধ করেছেন। আইনজীবী নাজিম উদ্দিন প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করায় সেগুলো যাচাই করে দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

জঙ্গল সলিমপুরের জমি নিয়ে প্রশাসনের তৎপরতার মধ্যেও কীভাবে দলিল নিবন্ধন করা হলো, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাঁদের কাজ কাগজপত্র যাচাই করা। জমি নিয়ে বিশেষ কোনো নির্দেশনা না থাকায় আইন অনুযায়ী দলিলগুলো নিবন্ধন করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ২৮ অক্টোবর বিষয়টি জানার পর তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। সীতাকুণ্ডের ইউএনও সাব-রেজিস্ট্রারকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ইয়াসিন নিজে উপস্থিত না হলেও কাগজপত্রের ভিত্তিতে দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ইয়াসিন হত্যা মামলার আসামি এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত। এমন একজন ব্যক্তির বিষয়ে সাব-রেজিস্ট্রার কেন অবগত ছিলেন না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।

অন্যদিকে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, ইয়াসিন জেলা পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী। তাঁর বিরুদ্ধে ২০টির বেশি মামলা রয়েছে। এমন একজন ব্যক্তির জমি নিবন্ধনের বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়নি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

সন্ত্রাসীর আস্তানায় সাব-রেজিস্ট্রারের ‘ভিআইপি’ সেবা

সর্বশেষ আপডেট ১১:৪৫:৫১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিনের গোপন আস্তানায় গিয়ে ৭৪টি জমির বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন সীতাকুণ্ডের সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব। হত্যা মামলার আসামি ও পুলিশের তালিকাভুক্ত এই সন্ত্রাসীকে বিশেষ ‘ভিআইপি’ সেবা দিয়ে দুই দফায় এসব দলিল নিবন্ধন করা হয়। এর মধ্যে গত ১৭ সেপ্টেম্বর এক দিনেই ৬৫টি এবং ১ অক্টোবর আরও নয়টি দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়েছে।

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সাব-রেজিস্ট্রারের ভূমিকা নিয়ে প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে আইন মন্ত্রণালয়ে মৌখিক অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রায়হান হাবীবের বদলির আদেশও সাত দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল।

গত ২৬ অক্টোবর রায়হান হাবীবসহ দেশের ৮৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে একযোগে বদলি করা হয়। তবে ইয়াসিনের নামে ৬৫টি দলিল নিবন্ধনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর তাঁর বদলির আদেশ স্থগিত করা হয়। এর মধ্যেই ১ অক্টোবর আরও নয়টি দলিল নিবন্ধনের তথ্য সামনে এসেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইয়াসিন জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকার নিয়ন্ত্রণকারী একটি সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান। র‌্যাবের (বর্তমানে এসআরবি) উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া হত্যা মামলার প্রধান আসামি তিনি। হত্যা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ তাঁর বিরুদ্ধে ২০টির বেশি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় পলাতক থাকলেও জমি বিক্রির দলিল নিবন্ধনে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন তিনি।

আস্তানায় গিয়ে নিবন্ধন ৭৪ দলিল

সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ইয়াসিনের দখলে থাকা ২৭৫ শতক জমি বিক্রির জন্য কমিশনের মাধ্যমে দলিল নিবন্ধনের আবেদন করেন চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন। আবেদনে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষ অসুস্থ থাকায় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে উপস্থিত হতে পারবেন না বলে উল্লেখ করা হয়।

এরপর সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীবের নেতৃত্বে একটি কমিশন টিম ইয়াসিনের গোপন আস্তানায় গিয়ে দলিল নিবন্ধনের কাজ সম্পন্ন করে। দুই দফায় সন্ধ্যার পর এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মচারী করিম, সিরাজউদ্দিন, তুষার ও রতনও যুক্ত ছিলেন।

বাংলাদেশের রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ৩৮ ধারা অনুযায়ী, শারীরিক অক্ষমতা, কারাবাস, গুরুতর অসুস্থতা কিংবা বৈধ কোনো কারণে কোনো ব্যক্তি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে উপস্থিত হতে না পারলে কমিশনের মাধ্যমে দলিল নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত আবেদন, অনুমোদন এবং কমিশনারের উপস্থিতিতে দলিল সম্পাদনসহ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান বলেন, কমিশনের মাধ্যমে একসঙ্গে তিনটির বেশি দলিল নিবন্ধনের সুযোগ নেই। অথচ এক দিনে ৬৫টি দলিল নিবন্ধনের ঘটনা ঘটেছে। কীভাবে এতগুলো দলিল নিবন্ধনের অনুমতি দেওয়া হলো এবং কোন প্রক্রিয়ায় তা সম্পন্ন হয়েছে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

দলিলের মূল্য ২ কোটি ৮৭ লাখ, বাজারমূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি

নিবন্ধন করা ৭৪টি দলিলে জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এসব জমির বর্তমান বাজারমূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি। সে হিসাবে দলিলে দেখানো মূল্য ও বাজারমূল্যের মধ্যে ব্যবধান প্রায় ৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, কয়েক বছর আগেও ঝুট মিলের শ্রমিক হিসেবে কাজ করা ইয়াসিন কীভাবে জঙ্গল সলিমপুরের বিপুল পরিমাণ জমির মালিক হলেন? তাঁর বিরুদ্ধে এতগুলো মামলা থাকা সত্ত্বেও জমির মালিকানা ও বিক্রির প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। আলীনগর এলাকায় ইয়াসিন ও তাঁর বাহিনীর আধিপত্য ছিল দীর্ঘদিনের।

গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্য যৌথ অভিযান চালিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নেন। পরে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পৃথক নিরাপত্তাচৌকি স্থাপন করা হয়। বর্তমানে সেখানে সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা চলছে।

খাজনা পরিশোধ নিয়েও প্রশ্ন

দলিল নিবন্ধনের আগে গত ২৪ আগস্ট ইয়াসিন এসব জমির খাজনা পরিশোধ করেন। এতে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ফজলে রাব্বি বলেন, ইয়াসিনের নামে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি থাকলে মালিকানার অধিকার অনুযায়ী তিনি খাজনা দিতে পারেন। তবে জমির দলিল হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ভূমি অফিসের কোনো ভূমিকা নেই।

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মচারী সিরাজউদ্দিন ইয়াসিনের আস্তানায় গিয়ে দলিল নিবন্ধনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ভাটিয়ারি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার ভেতরে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। জায়গাটি তাঁর কাছে আস্তানা বলে মনে হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট অবস্থান সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে পারেননি।

যা বলছেন সাব-রেজিস্ট্রার ও জেলা প্রশাসক

সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব ২৮ অক্টোবর জানিয়েছিলেন, সীতাকুণ্ড ভূমি অফিসের কাগজপত্র অনুযায়ী জমিগুলো ইয়াসিনের নামে নামজারি করা ছিল এবং তিনি খাজনাও পরিশোধ করেছেন। আইনজীবী নাজিম উদ্দিন প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করায় সেগুলো যাচাই করে দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

জঙ্গল সলিমপুরের জমি নিয়ে প্রশাসনের তৎপরতার মধ্যেও কীভাবে দলিল নিবন্ধন করা হলো, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাঁদের কাজ কাগজপত্র যাচাই করা। জমি নিয়ে বিশেষ কোনো নির্দেশনা না থাকায় আইন অনুযায়ী দলিলগুলো নিবন্ধন করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ২৮ অক্টোবর বিষয়টি জানার পর তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। সীতাকুণ্ডের ইউএনও সাব-রেজিস্ট্রারকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ইয়াসিন নিজে উপস্থিত না হলেও কাগজপত্রের ভিত্তিতে দলিল নিবন্ধন করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ইয়াসিন হত্যা মামলার আসামি এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত। এমন একজন ব্যক্তির বিষয়ে সাব-রেজিস্ট্রার কেন অবগত ছিলেন না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।

অন্যদিকে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, ইয়াসিন জেলা পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী। তাঁর বিরুদ্ধে ২০টির বেশি মামলা রয়েছে। এমন একজন ব্যক্তির জমি নিবন্ধনের বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়নি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।