ঢাকা ০৫:৫২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
দুর্নীতির অনুসন্ধান

রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে সাংবাদিক জি এম রফিকের ওপর হামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সর্বশেষ আপডেট ০৯:১৬:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 37

রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে সাংবাদিক জি এম রফিকের ওপর হামলা

ঢাকার তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে অনিয়ম, দুর্নীতি, দালালনির্ভরতা, সরকারি রেকর্ডের নিরাপত্তা এবং নিয়োগপত্রবিহীন ব্যক্তিদের দৌরাত্ম্য নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিক মো. রফিকুল ইসলাম গাজী (জি এম রফিক) হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।

অভিযোগপত্র, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যক্রম সম্পর্কে সংগৃহীত তথ্য পর্যালোচনায় রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রমে কথিত দালালনির্ভর একটি নেটওয়ার্কের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এর সঙ্গে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী, দলিল লেখক, ওমেদার, নকলনবিশ এবং নিয়োগপত্রবিহীন ব্যক্তির যোগাযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রশাসনিক তদন্ত প্রয়োজন।

তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের ২ নম্বর গেটসংলগ্ন একটি চায়ের দোকানে প্রতিবেদকের সঙ্গে ‘রহিম’ ছদ্মনামের এক ব্যক্তির কথা হয়। বাড্ডা থেকে আসা ‘মফিজ’ নামের এক ব্যক্তি জমি রেজিস্ট্রি করতে এসেছেন জানালে রহিম নিজেকে সাব-রেজিস্ট্রারের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচয় দেন। জমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ, এমনকি কাগজপত্রে সমস্যা থাকা কাজও সমাধান করে দেওয়ার দাবি করেন তিনি।

নিজে নিজে কাজ করতে গেলে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলেও ওই ব্যক্তি জানান। অভিযোগ রয়েছে, রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে এ ধরনের প্রায় অর্ধশত দালাল সক্রিয় রয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে এক শ্রেণির দলিল লেখক, ওমেদার ও নকলনবিশের যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদকের পরিচয় গোপন রেখে ‘সোহেল’ নামের আরেক ব্যক্তির কাছে দেড় কোটি টাকা মূল্যের জমির সাব-কবলা দলিল রেজিস্ট্রির খরচ জানতে চাওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সরকারি ট্রেজারি চালানের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন। এমনকি অতিরিক্ত অর্থ না দিলে সাব-রেজিস্ট্রার দলিলে স্বাক্ষর করবেন না বলেও দাবি করা হয়।

তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সদর রেকর্ড রুম নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি নির্ধারিত ফি তুলনামূলক কম হলেও পুরোনো দলিলের ভলিউম তল্লাশি, নকল সংগ্রহ কিংবা রেকর্ড যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিকভাবে কয়েক হাজার টাকা থেকে আরও বেশি অর্থ নেওয়া হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, অফিসের নিজস্ব জনবলের বাইরে ৩০ থেকে ৪০ জন ব্যক্তি কোনো নিয়োগপত্র ছাড়াই বালাম বা ভলিউম তল্লাশির কাজ করছেন। তাঁদের প্রত্যেকের সঙ্গে কয়েকজন করে সহকারী থাকার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে মোহর আলী, মনির হোসেন, ইরফান, মিলন, বেল্লাল, শান্ত, ফাহিম ও রিয়াদসহ কয়েকজনের নাম এসেছে। তবে তাঁদের নিয়োগের বৈধতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

জনসাধারণের প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত থাকার কথা থাকলেও নিয়োগপত্রবিহীন ব্যক্তিদের রেকর্ড রুমে কাজ করার অভিযোগে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ বালাম বই ও দলিলের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের আশঙ্কা, এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশের সুযোগে বালাম বইয়ের পাতা পরিবর্তন, পাতা কেটে নতুন পাতা সংযোজন কিংবা তথ্য পরিবর্তনের মতো অপরাধ ঘটতে পারে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে রেকর্ড রুমের নথি, প্রবেশ রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্টদের নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

এদিকে মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগের কথা সামনে এসেছে। অভিযোগে সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল কাদিরকে ঘিরে ঘুষ লেনদেন এবং নিয়োগপত্রবিহীন ব্যক্তিদের মাধ্যমে অফিসের কার্যক্রম পরিচালনার দাবি করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড রুমের চাবি ও সেখানে কিছু ব্যক্তির নিয়মিত প্রবেশ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। রেকর্ড রুমে গুরুত্বপূর্ণ নথির গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অভিযোগকারীরা।

অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, কথিত নিয়োগপত্রবিহীন কয়েকজন ব্যক্তিকে দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক নকল লেখার কাজ করানো হচ্ছে। বিষয়টি সত্য হলে সরকারি দপ্তরে জনবল নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টনের নিয়ম নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কথিত ‘টার্গেট’ পূরণের জন্য সরকারি ফি ও নির্ধারিত খরচের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হলে তা কার কাছে যাচ্ছে এবং এর সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না। বিষয়টি নিশ্চিত করতে আর্থিক নথি, দলিলের হিসাব, ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্টদের সম্পদের বিবরণ যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীন তদন্ত ছাড়া সত্য বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহকেও ঘিরে গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ে দেওয়া লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদায়ন পেয়েছিলেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সাভার, টঙ্গী, গাজীপুর, রূপগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে দায়িত্ব পালনের সময় অনিয়মের মাধ্যমে তিনি বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন। তাঁর বর্তমান পদায়ন, দায়িত্ব পালনের ধরন এবং সম্পদের উৎস নিয়েও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে প্রভাব ধরে রাখার অভিযোগও করা হয়েছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

এমন অভিযোগের মধ্যেই গত ৯ সেপ্টেম্বর তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক জি এম রফিক হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে রফিকুল ইসলাম গাজী জানান, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় তিনি রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে একাধিক ব্যক্তি তাঁকে ঘিরে উত্তেজিত আচরণ করেন এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অভিযোগে মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ওমেদার আওলাদ ওরফে ব্লেট আওলাদ, সদর রেজিস্ট্রি অফিসের রাসেল ওরফে পটুরাসেল, লম্বু রাসেল ওরফে ইয়াবা রাসেল, তেজগাঁও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার শফীর ব্যক্তিগত চালক কামাল ওরফে মাতাল কামাল, ট্যাবলেট হামিদ, পল্লবী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ব্লেট রাজিবসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের পাশাপাশি রেজিস্ট্রি কমপ্লেক্সের ‘মাতাল সংগঠন’ নামে পরিচিত একটি গোষ্ঠীর সদস্যদের বিরুদ্ধেও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানা গেলে তা প্রকাশ করা প্রয়োজন।

সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) ১০ সেপ্টেম্বর লিখিত প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনটি হামলার নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেছে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে স্বাধীনভাবে কাজের পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে।

ঢাকায় কর্মরত খুলনা বিভাগের সাংবাদিকদের সংগঠন খুলনা বিভাগীয় সাংবাদিক ফোরামও ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনটি হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছে। হামলায় কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর ইন্ধন বা সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকলে তাঁদেরও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

সাংবাদিক জিএম রফিকের ওপর হামলার ঘটনায় বিবৃতি
সাংবাদিক জিএম রফিকের ওপর হামলার ঘটনায় বিবৃতি

সাংবাদিক নেতারা আগামী রোববারের মধ্যে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকও জি এম রফিকের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি করেছেন।

রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স ও বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের ধরন বিবেচনায় এখন নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে নিয়োগপত্র ছাড়া কারা সরকারি রেকর্ড রুমে প্রবেশ করছেন, তাঁদের সেখানে কাজের অনুমতি কে দিয়েছে, বালাম বই ও গুরুত্বপূর্ণ দলিলের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে এবং সরকারি ফি-এর বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ সত্য কি না; এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ সত্য হলে সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কথিত ‘টার্গেট’ ব্যবস্থার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি আছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আয় ও সম্পদের সঙ্গে তাঁদের জীবনযাত্রার সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখার দাবি রয়েছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় কারা জড়িত এবং এর পেছনে কারও নির্দেশ বা ইন্ধন ছিল কি না, সেটিও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

রেজিস্ট্রেশন খাত সাধারণ মানুষের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবার একটি অংশ। তাই দালালনির্ভরতা, হয়রানি, দুর্নীতি কিংবা সরকারি নথির নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। একইভাবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কারও বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকেও চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

তবে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিক হামলার শিকার হলে সেই ঘটনাও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। কারণ সাংবাদিকের স্বাধীন অনুসন্ধানের পথ বাধাগ্রস্ত হলে সরকারি সেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এই পোস্টটি আপনার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

দুর্নীতির অনুসন্ধান

রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে সাংবাদিক জি এম রফিকের ওপর হামলা

সর্বশেষ আপডেট ০৯:১৬:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঢাকার তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে অনিয়ম, দুর্নীতি, দালালনির্ভরতা, সরকারি রেকর্ডের নিরাপত্তা এবং নিয়োগপত্রবিহীন ব্যক্তিদের দৌরাত্ম্য নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিক মো. রফিকুল ইসলাম গাজী (জি এম রফিক) হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।

অভিযোগপত্র, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যক্রম সম্পর্কে সংগৃহীত তথ্য পর্যালোচনায় রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রমে কথিত দালালনির্ভর একটি নেটওয়ার্কের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এর সঙ্গে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী, দলিল লেখক, ওমেদার, নকলনবিশ এবং নিয়োগপত্রবিহীন ব্যক্তির যোগাযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রশাসনিক তদন্ত প্রয়োজন।

তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের ২ নম্বর গেটসংলগ্ন একটি চায়ের দোকানে প্রতিবেদকের সঙ্গে ‘রহিম’ ছদ্মনামের এক ব্যক্তির কথা হয়। বাড্ডা থেকে আসা ‘মফিজ’ নামের এক ব্যক্তি জমি রেজিস্ট্রি করতে এসেছেন জানালে রহিম নিজেকে সাব-রেজিস্ট্রারের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচয় দেন। জমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ, এমনকি কাগজপত্রে সমস্যা থাকা কাজও সমাধান করে দেওয়ার দাবি করেন তিনি।

নিজে নিজে কাজ করতে গেলে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলেও ওই ব্যক্তি জানান। অভিযোগ রয়েছে, রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে এ ধরনের প্রায় অর্ধশত দালাল সক্রিয় রয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে এক শ্রেণির দলিল লেখক, ওমেদার ও নকলনবিশের যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদকের পরিচয় গোপন রেখে ‘সোহেল’ নামের আরেক ব্যক্তির কাছে দেড় কোটি টাকা মূল্যের জমির সাব-কবলা দলিল রেজিস্ট্রির খরচ জানতে চাওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সরকারি ট্রেজারি চালানের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন। এমনকি অতিরিক্ত অর্থ না দিলে সাব-রেজিস্ট্রার দলিলে স্বাক্ষর করবেন না বলেও দাবি করা হয়।

তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সদর রেকর্ড রুম নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি নির্ধারিত ফি তুলনামূলক কম হলেও পুরোনো দলিলের ভলিউম তল্লাশি, নকল সংগ্রহ কিংবা রেকর্ড যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিকভাবে কয়েক হাজার টাকা থেকে আরও বেশি অর্থ নেওয়া হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, অফিসের নিজস্ব জনবলের বাইরে ৩০ থেকে ৪০ জন ব্যক্তি কোনো নিয়োগপত্র ছাড়াই বালাম বা ভলিউম তল্লাশির কাজ করছেন। তাঁদের প্রত্যেকের সঙ্গে কয়েকজন করে সহকারী থাকার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে মোহর আলী, মনির হোসেন, ইরফান, মিলন, বেল্লাল, শান্ত, ফাহিম ও রিয়াদসহ কয়েকজনের নাম এসেছে। তবে তাঁদের নিয়োগের বৈধতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

জনসাধারণের প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত থাকার কথা থাকলেও নিয়োগপত্রবিহীন ব্যক্তিদের রেকর্ড রুমে কাজ করার অভিযোগে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ বালাম বই ও দলিলের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের আশঙ্কা, এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশের সুযোগে বালাম বইয়ের পাতা পরিবর্তন, পাতা কেটে নতুন পাতা সংযোজন কিংবা তথ্য পরিবর্তনের মতো অপরাধ ঘটতে পারে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে রেকর্ড রুমের নথি, প্রবেশ রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্টদের নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

এদিকে মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগের কথা সামনে এসেছে। অভিযোগে সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল কাদিরকে ঘিরে ঘুষ লেনদেন এবং নিয়োগপত্রবিহীন ব্যক্তিদের মাধ্যমে অফিসের কার্যক্রম পরিচালনার দাবি করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড রুমের চাবি ও সেখানে কিছু ব্যক্তির নিয়মিত প্রবেশ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। রেকর্ড রুমে গুরুত্বপূর্ণ নথির গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অভিযোগকারীরা।

অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, কথিত নিয়োগপত্রবিহীন কয়েকজন ব্যক্তিকে দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক নকল লেখার কাজ করানো হচ্ছে। বিষয়টি সত্য হলে সরকারি দপ্তরে জনবল নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টনের নিয়ম নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কথিত ‘টার্গেট’ পূরণের জন্য সরকারি ফি ও নির্ধারিত খরচের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হলে তা কার কাছে যাচ্ছে এবং এর সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না। বিষয়টি নিশ্চিত করতে আর্থিক নথি, দলিলের হিসাব, ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্টদের সম্পদের বিবরণ যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীন তদন্ত ছাড়া সত্য বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহকেও ঘিরে গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ে দেওয়া লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদায়ন পেয়েছিলেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সাভার, টঙ্গী, গাজীপুর, রূপগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে দায়িত্ব পালনের সময় অনিয়মের মাধ্যমে তিনি বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন। তাঁর বর্তমান পদায়ন, দায়িত্ব পালনের ধরন এবং সম্পদের উৎস নিয়েও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে প্রভাব ধরে রাখার অভিযোগও করা হয়েছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

এমন অভিযোগের মধ্যেই গত ৯ সেপ্টেম্বর তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক জি এম রফিক হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে রফিকুল ইসলাম গাজী জানান, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় তিনি রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে একাধিক ব্যক্তি তাঁকে ঘিরে উত্তেজিত আচরণ করেন এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অভিযোগে মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ওমেদার আওলাদ ওরফে ব্লেট আওলাদ, সদর রেজিস্ট্রি অফিসের রাসেল ওরফে পটুরাসেল, লম্বু রাসেল ওরফে ইয়াবা রাসেল, তেজগাঁও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার শফীর ব্যক্তিগত চালক কামাল ওরফে মাতাল কামাল, ট্যাবলেট হামিদ, পল্লবী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ব্লেট রাজিবসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের পাশাপাশি রেজিস্ট্রি কমপ্লেক্সের ‘মাতাল সংগঠন’ নামে পরিচিত একটি গোষ্ঠীর সদস্যদের বিরুদ্ধেও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানা গেলে তা প্রকাশ করা প্রয়োজন।

সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) ১০ সেপ্টেম্বর লিখিত প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনটি হামলার নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেছে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে স্বাধীনভাবে কাজের পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে।

ঢাকায় কর্মরত খুলনা বিভাগের সাংবাদিকদের সংগঠন খুলনা বিভাগীয় সাংবাদিক ফোরামও ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনটি হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছে। হামলায় কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর ইন্ধন বা সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকলে তাঁদেরও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

সাংবাদিক জিএম রফিকের ওপর হামলার ঘটনায় বিবৃতি
সাংবাদিক জিএম রফিকের ওপর হামলার ঘটনায় বিবৃতি

সাংবাদিক নেতারা আগামী রোববারের মধ্যে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকও জি এম রফিকের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি করেছেন।

রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স ও বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের ধরন বিবেচনায় এখন নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে নিয়োগপত্র ছাড়া কারা সরকারি রেকর্ড রুমে প্রবেশ করছেন, তাঁদের সেখানে কাজের অনুমতি কে দিয়েছে, বালাম বই ও গুরুত্বপূর্ণ দলিলের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে এবং সরকারি ফি-এর বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ সত্য কি না; এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ সত্য হলে সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কথিত ‘টার্গেট’ ব্যবস্থার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি আছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আয় ও সম্পদের সঙ্গে তাঁদের জীবনযাত্রার সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখার দাবি রয়েছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় কারা জড়িত এবং এর পেছনে কারও নির্দেশ বা ইন্ধন ছিল কি না, সেটিও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

রেজিস্ট্রেশন খাত সাধারণ মানুষের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবার একটি অংশ। তাই দালালনির্ভরতা, হয়রানি, দুর্নীতি কিংবা সরকারি নথির নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। একইভাবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কারও বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকেও চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

তবে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিক হামলার শিকার হলে সেই ঘটনাও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। কারণ সাংবাদিকের স্বাধীন অনুসন্ধানের পথ বাধাগ্রস্ত হলে সরকারি সেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।